Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

কোচবিহার থেকে দক্ষিণেশ্বর, ৮ মাস দণ্ডী কেটে ৭০০ কিমি পথ পেরলেন বিভাস

কল্যাণী হাইওয়ে। নবনির্মিত রাস্তায় গাড়ি ছুটছে তীরের বেগে। দু’পাশে গাছের সারি চোখের পলকে সরে যাচ্ছে পিছনে। হঠাত্ দৃষ্টি আটকায় রাস্তার ধারে এক জায়গায়।

কোচবিহার থেকে দক্ষিণেশ্বর, ৮ মাস দণ্ডী কেটে ৭০০ কিমি পথ পেরলেন বিভাস
  • ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১৫:০২
Prefer us on Google

সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা: কল্যাণী হাইওয়ে। নবনির্মিত রাস্তায় গাড়ি ছুটছে তীরের বেগে। দু’পাশে গাছের সারি চোখের পলকে সরে যাচ্ছে পিছনে। হঠাত্ দৃষ্টি আটকায় রাস্তার ধারে এক জায়গায়। ভরদুপুরে চড়া রোদে পিচ আগুনের মতো গরম। সে উত্তাপ অগ্রাহ্য করে একজন পিচের রাস্তায় শুচ্ছেন। উঠছেন। আবার শুচ্ছেন। এভাবেই এগচ্ছেন রাস্তা দিয়ে। কাছে গিয়ে বোঝা গেল, ‘দণ্ডী’ কাটছেন মানুষটি। একবারও থামছেন না। তাঁর পিছন পিছন আসছে একটি রিকশ। তাতে সামান্য কিছু জিনিসপত্র যেমন, একটি ব্যাগ, কিছু কাপড়চোপড়, দু’চারটি বাসনকোসন রাখা। দেখলেই কৌতূহল হয়।

Advertisement

গাড়ি থেকে নেমে কাছে যাওয়ার পর রাস্তায় শুয়ে চোখ তুলে তাকালেন মানুষটি। হাঁটু গেড়ে বসলেন রাস্তায়। কিসের জন্য দণ্ডী? এই দুপুরে কষ্ট হচ্ছে না? তাঁর গলা অসম্ভব শান্ত। হাতজোড় করে বললেন, ‘আমার নাম বিভাস চক্রবর্তী। বাড়ি কোচবিহারের পুণ্ডিবাড়িতে।’ মানুষটির গলায় কোনও ক্লান্তি নেই। কথা শুনে জানা গেল, আট মাস আগে কোচবিহার থেকে রওনা দিয়েছিলেন। আট মাস ধরে একবারও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পায়ে হাঁটেননি। গোটা পথ দণ্ডী কাটতে কাটতেই এগচ্ছেন। যাবেন দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে, কালী সাক্ষাতে। সে যাত্রাপথ প্রায় শেষ হয়ে এল এবার। ‘বহুদিনের ইচ্ছে জীবনে একবার এভাবেই মায়ের কাছে যাওয়ার। ঠাকুরকে শুধু ভক্তি করলে হয় না। ত্যাগ করতেও জানা চাই। নইলে এ জীবনের কি মানে?’ বললেন বিভাস। তাঁকে দেখে সাধুসন্ত বলে মনে হয়ে না। সংসার ত্যাগের উদ্দেশ্য নেই। বরং বলেন, ‘বাড়িতে স্ত্রী অপেক্ষা করছেন। পরিবার প্রার্থনা করছে মনস্কামনা পূর্ণ করে বাড়ি ফেরার।’ জানালেন, তাঁর স্ত্রী শুরু থেকেই পাশে আছেন। প্রথম ১৫দিন তাঁর সঙ্গেই ছিলেন। বিভাস একপ্রকার জোর করে তাঁকে বাড়ি ফেরত পাঠান।
দীর্ঘ আট মাসের এই দণ্ডীপথ মোটেই সহজ নয়। পথমাঝে শরীর বারবার ভেঙেছে। এমনও হয়েছে যে, ছ-সাতদিন একই জায়গায় শুয়ে থাকতে হয়েছে। নড়াচড়ার ক্ষমতা পর্যন্ত ছিল না। তারপর একটু সুস্থ হয়ে শুরু করেছেন দণ্ডীকাটা। কোনো পরিস্থিতিই তাঁকে হার মানাতে পারেনি। বিশ্বাস করেন, ঠাকুরের আশীর্বাদ রয়েছে মাথার উপর। ফলে কোনো ক্ষতি হবে না। এবার দেরি হয়ে যাচ্ছে, বিভাস কথা শেষ করে হাঁটুগেড়ে বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। ‘আর তো কয়েকটা দিন মাত্র। মায়ের পায়ে পুজো দিয়ে বাড়ি ফিরব। অনেকদিন বাড়ির লোকদের দেখিনি’-এইটুকু বলে শুলেন গরম পিচে। দণ্ডীকাটা শুরু। হাইওয়ে দিয়ে দ্রুতগতির পৃথিবী ছুটে যাচ্ছে নিজের মতো করে। বিভাস চক্রবর্তী কিন্তু চললেন নিজের গতিতেই, সরীসৃপের মতো ধীরে। তাঁর বিশ্বাস পুণ্য, পবিত্র। তাঁর অটল ভক্তি দণ্ডীপথের সব বাধা দূর করে লক্ষ্যের সামনে পৌঁছে দিয়েছে প্রায়। এবার মায়ের পায়ে কপাল ঠেকানো। তারপর এ মানবজীবন ধন্য।  নিজস্ব চিত্র

সম্পর্কিত সংবাদ