Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

পরিবেশের বন্ধু

এক ঘণ্টার জন্য ২ টাকা। বছর কুড়ি আগে রেলশহর খড়্গপুরের পাড়ায় পাড়ায় ছোট সাইকেল ভাড়া পাওয়া যেত। এমন ‘ট্রেন্ড’ বোধহয় অন্য জেলাতেও ছিল।

পরিবেশের বন্ধু
  • ৮ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সোহম কর: এক ঘণ্টার জন্য ২ টাকা। বছর কুড়ি আগে রেলশহর খড়্গপুরের পাড়ায় পাড়ায় ছোট সাইকেল ভাড়া পাওয়া যেত। এমন ‘ট্রেন্ড’ বোধহয় অন্য জেলাতেও ছিল। রঙিন সেইসব সাইকেলের পিছনে দু’টো ছোট চাকা লাগানো থাকত। শিক্ষানবিশ আরোহীকে ভারসাম্য জোগায় সেই অতিরিক্ত চাকা। বিএনআর মাঠের সামনেই দোকান। খাতায় নাম লিখে ২টাকা দিলেই মাঠে সাইকেল চালানোর লাইসেন্স নিশ্চিত। ঠিক চালানো নয়, একঘণ্টার স্বপ্নের উড়ান। তারপর রক্তক্ষয়ী সাইকেল শিক্ষা। শিক্ষক পাল্টে পাল্টে যেত। কখনও বাবা, কখনও বন্ধুর মা, কখনও আবার পাড়ার দাদা। এভাবেই হাফ প্যাডেল থেকে লাফিয়ে ওঠা শিখে গেলেই উত্তীর্ণ হওয়া যায় পরের ধাপে। এই ধাপে চলে বাবার কাছে নতুন সাইকেলের বায়না। অধিকারের সেই লড়াই মিটলে, মায়ের কাছে মুখ নামিয়ে চুপি চুপি বলা, ‘সাইকেলে নিয়ে স্কুলে যাব মা?’ বাবাদের উদারতা আর মায়েদের বাড়ি ফেরা না পর্যন্ত টেনশনকে পিছনে ফেলে শুরু হয়ে যেত হাত ছেড়ে চালানো ‘প্র্যাকটিস’। 

Advertisement

এহেন সাইকেল যেন মফস্সলের বাগানে এক ‘অবাধ্য’ রঙিন প্রজাপতি। সে যে কোথায় না কোথায় উড়ে যায়, কেউ তার ঠিকানা জানে না। কিশোরবেলায় সাইকেলের উপকারিতাও অনেক ছিল। পাড়ার রাস্তায় ক্রিকেট খেলার সময়  উইকেট কিপার না পাওয়া গেলে সাইকেল দাঁড় করানো হতো উইকেটের পিছনে। পাঁচিলের ওপারে বল চলে গেলে, সাইকেল বেয়ে অনায়াসেই পাঁচিল টপকানো যেত। তখন কে জানত, শহুরে কংক্রিট বাগানে পুলিসি চোখরাঙানি আর গতির লুকোনো ছুরি অচিরেই বসতে চলেছে সাইকেলের পিঠে। তাই আধুনিক হতে থাকা কলকাতায় সাইকেল বড়ই ‘অপাংক্তেয়’। পুলিস সূত্র বলে, শহরের ৭১টি রাস্তায় সাইকেল চালানো যায় না। আরও স্পষ্ট করে বললে, নির্দিষ্ট সময়ে ওই রাস্তাগুলোয় সাইকেল চালানো যায় না। তবে সাইকেলকে এতটাও সরল ভাবলে হবে না। পরিবেশবান্ধব দু’চাকার এই যান বড্ড রাজনৈতিক। সামজবাদী পার্টির চিহ্নে সে জ্বলজ্বল করে। এই সাইকেল বঙ্গ রাজনীতিতেও উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক। মুক্ত হস্তে সাইকেলদান কর্মসূচি কাদের আমলের? মাঝেমধ্যেই বাজার গরম হয় এই প্রশ্নে। তবে আপাতত এসব প্রশ্ন ‘ফ্যাক্ট চেক’-এর জন্য থাক। এতকিছুর পরেও সাইকেল কিন্তু বাইকের মতো বখাটে নয়। আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি, সাইকেল বাহিনীর আক্রমণ! ওইসব ‘মূলধারার রাজনীতি’ মোটরবাইক করে থাকে। এখন কোনও মন্ত্রীকে সাইকেল চড়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ‘সৎ’ বলা হলে, তা এখন ‘আনপপুলার ওপিনিয়ন’ তকমা পায়। সাইকেল এমনই ‘রাজনৈতিক’। আবার অনেকটা ‘অর্থনৈতিক’। এককালে কারখানার ধোঁয়া ওড়া চিমনির দিকে এগিয়ে যাওয়া শ্রমজীবীদের সাইকেলের কথা মনে পড়ে। সেই সাইকেলগুলোর সামনে ঝোলানো থাকত খাবারের থলে। আর সামনে থাকত ছোট্ট সিট। সেই সিটেই মেয়েকে বসিয়ে স্কুলে ছেড়ে কারখানায় যেতেন শ্রমিক। সে দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে চিত্রগ্রাহকরা এখন চাতকপাখির মতো বসে থাকেন। এই সাইকেলই একসময় শ্রমজীবী মহিলাদের জীবনে বদল এনেছিল। শহরের উপকণ্ঠে গৃহসহায়িকাদের এখনও দেখা যায়, সাইকেল চেপে ফ্ল্যাটবাড়িতে আসতে। গ্রাম-মফস্সলের পড়ুয়াদের স্কুলপথ ধরে হইহই করে যাওয়ার দৃশ্য এখনও ‘ফোটোজেনিক’।   
তারপর আধুনিকতার চাপে সাইকেল আর নিরীহ রইল না। প্রোটিক শেকের বোতল গোঁজা, হেলমেট পরা আরোহীরা শরীরচর্চা শুরু করল তা নিয়ে। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত জিমেও স্থান পেল সাইকেল। প্রবল প্রয়োজনীয় একটি বাহন হয়ে গেল নস্ট্যালজিয়া আর লাক্সারির মিশেল। এই তো সেদিন, অস্তগত সূর্যকে ব্যাকড্রপে রেখে টিমটিম করে এগোচ্ছিল সাইকেল। আচমকা সামনে একখানা দৈত্যাকার দেওয়াল চলে এলো। বুড়ো সাইকেলের সজোরে ব্রেক! এবার ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া উপায় কী! ওই দৈত্য আসলে ২০২০ সালের লকডাউন। থমকে গেল গণপরিবহণের চাকা। এখান থেকেই ঘুরে দাঁড়াল শ্রমজীবী মানুষের সাইকেল। গন্তব্যে পৌঁছতে ভরসা একমাত্র সে-ই। শহরের  ফাঁকা বাইপাসের বুক চিড়ে এগোতে থাকল লিকলিকে দু’চাকার সাইকেল মিছিল। মাঝপথে চেন পড়ে গেলে, দাঁড়িয়ে পড়েন বাকি আরোহীরা। এর চেয়ে স্বাভাবিক আর কীই বা হতে পারে? কিন্তু হায়, একটা সময় সব ‘স্বাভাবিক’ হল। চাকা  ঘুরল গণপরিবহণের। কিন্তু স্বপ্নের উড়ান নাছোড়! আরও নাছোড় পেটের জ্বালা। মোটর গাড়ির দৈত্যাকার গতি আর গিলতে আসা কালো ধোঁয়ার সামনে ধুলো পড়া ফুল শার্ট আর সুতির প্যান্টের লোকগুলো এখনও চ্যালেঞ্জ করে পায়ের জোরে। ২০-৩০-৪০ কিংবা তারও বেশি কিলোমিটার পথ প্যাডেল করে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শ্রমজীবী মানুষরা এখনও বাইপাস ধরে এগচ্ছেন। রুবি মোড়ের সামনে দিনকয়েক আগেই এক সাইকেল আরোহী বলছিলেন, ‘সোনারপুরে থাকি। তপসিয়ায় কাজ করতে এসেছিলাম। প্রতিদিন তো কাজ থাকে না। বাস-অটোর যা ভাড়া, আর যা মজুরি পাই, ওতে হয়ে ওঠে না। শরীরে দম আছে, সাইকেল আছে তাই চালিয়ে চলে আসি। শখ করে চালাই না।’ 
এই চালিয়ে আসা নিছক ‘আসা-যাওয়া’ নয়। পদে পদে মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ওই শ্রমজীবী মানুষগুলোই বিকল্প বাতলে দিচ্ছেন গোটা দুনিয়াকে। রাজনীতি-অর্থনীতির চেয়েও সাইকেলের বড় পরিচয় সে পরিবেশবান্ধব। পরিসংখ্যান বলে, এই কলকাতা শহরে গত বছর প্রথম চার মাসে ৩২১২৮টি গাড়ির নতুন রেজিস্ট্রেশন হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটা নজিরবিহীন। পরিবেশবিদরা বলছেন, ভয়ানক। কারণ, গাড়ির টায়ার থেকে ন্যানো-মাইক্রো প্লাস্টিক বাতাসে ছড়ায়। সেই প্লাস্টিক মানব দেহে প্রবেশ করে। কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে গাড়ি থেকেই। জলবায়ু পরিবর্তনের পাল্লায় যখন গোটা পৃথিবীর নাভিশ্বাস উঠছে, ঠিক তখনই আমাদের কলকাতায় নেই ‘সাইকেল লেন’। উঠে যাচ্ছে ট্রাম। পুলিস বলে, শহরে রাস্তার অপ্রতুলতা। রাস্তা আরও ছোট করলে গাড়ি কোথায় যাবে? তর্ক-বিতর্ক চলতেই থাকে। মাঝখান থেকে পরিবেশবান্ধব সাইকেল নিয়ে শ্রমজীবী মানুষগুলো ‘বেঁচে থাকা’র লড়াই করেন। শরীর ঠিক রাখার জন্য শহরের ভোরে অবস্থাপন্ন লোকেরা সুদৃশ্য সাইকেল নিয়ে বের হন। 
সাজানো শহর নিউটাউনে ‘সাইকেল লেন’ হয়েছে। কিন্তু শহরের সমস্ত গলিপথ এসে মেশে যে বড়রাস্তায়, সেখানে ‘সাইকেল লেন’ সোনার পাথর-বাটি। আমাদের দেশে বিদেশের মতো বাসে সাইকেল বেঁধে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা নেই। নরওয়ের রাস্তায় সাইকেল স্টেশন রয়েছে। অ্যাপে দেখা যায়, কোন স্টেশনে কত সাইকেল। সেই সাইকেলে চেপেই গলিপথ ধরে গন্তব্যে যান মানুষ। আমাদের শহরে অটো রয়েছে। বাস-মেট্রো থেকে নেমে অটোয় চেপে গন্তব্যে যেতে হয়। একটা ভালো চাকরি কিংবা ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেলেই পরিবেশ বান্ধব সাইকেলে ধুলো জমে। সিঁড়ির তলায় পড়ে থাকে। সল্টলেকে এখন সাইকেল পার্কিং স্ট্যান্ড হয়েছে। অফিস সময়ে প্রচুর সাইকেল দেখা যায় সেখানে। দেখে প্রশ্ন জাগে, রঙ চটা সাইকেলগুলো কি পারবে বিকল্প হয়ে উঠতে? পরিবেশের বন্ধু হতে ০কি দেবে এই গতির গ্যাঁড়াকল?
 গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
 সহযোগিতায় : বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ