নিতাই সাহা, সিউড়ি: দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে সিউড়ি জেলা সংশোধনারের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। দেশের স্বাধীনতার লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়া সংগ্রামীদের বন্দি করে রাখার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার এই সংশোধনাগারটি ব্যবহার করত। বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলায় স্বাধীনতা সংগ্রামী বিনয় চৌধুরী সহ মোট ২১জনকে ওই জেলে দীর্ঘসময় বন্দি করে রাখা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে রজতভূষণ দত্ত, হরিপদ বন্দ্যোপাধ্যায় সহ মোট ১২জন সংগ্রামীকে ওই জেল থেকে দ্বীপে পাঠানো হয়েছিল। যদিও তার আগেই রজতভূষণ দত্তের নেতৃত্বে অন্যান্য বন্দিরা একজোট হয়ে ব্রিটিশ সরকারের পতন কামনায় ওই জেলেই দুর্গাপুজো করেছিলেন। লোকমুখে প্রচলিত, এই পুজোই জেলার সদর শহর সিউড়ির প্রথম পুজো।
একাধিক রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হয়েছিল দেশ। এই স্বাধীনতা আন্দোলনে গোটা দেশের পাশাপাশি বীরভূমের ভূমিকাও ছিল অনন্য। গোরা সৈন্যদের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে এই জেলার মাটিতে একাধিক আন্দোলনও সংঘটিত হয়েছিল। ভারতছাড়ো আন্দোলন শুরুর আগেই লাল মাটির জেলা থেকে ব্রিটিশ সরকারকে দেশ ছাড়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে এক নতুন আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল। সালটা ছিল ১৯৩০। সেসময় বীরভূমের মাটিতে তিলতিল করে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠতে শুরু করেছিল। ওই বছরের আগস্ট মাসের শেষ দিকে জাজিগ্রাম থেকে ব্রিটিশ বিরোধী আগস্ট আন্দোলন শুরু হয়। ধীরে ধীরে সেই আন্দোলন জেলার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। একসময় এই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ক্রমেই জোরালো হয়ে ওঠে। স্বভাবতই ব্রিটিশ সরকার যথেষ্ট ভীত হয়ে পড়েছিল। এরপরই ব্রিটিশ সরকারের তরফে বীরভূম ষড়যন্ত্র মামলা রুজু করা হয়। সেই মামলায় মোট ৪২জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে বিনয় চৌধুরী সহ মোট ২১জনকে সিউড়ির ওই জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে কোণঠাসা করতে দীর্ঘ সময় সেখানেই তাঁদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল। এরপর অবশ্য ১২জনকে আন্দামানের সেলুলার জেলে চালান করে দেওয়া হয়েছিল।
জেলার সদর শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে সিউড়ি জেলা সংশোধনাগার। এই সংশোধনাগার একসময় সিউড়ি জেলা কারাগার নামে পরিচিত ছিল। ব্রিটিশ শাসনকালে ১৮১৯সালে ওই কারাগার গড়ে তোলা হয়েছিল। শুরুতে খড়ের ছাউনি ও কাদামাটি দিয়ে দেওয়াল তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকারের তরফেই ওই কারাগারটিকে কংক্রিটের আবরণে গড়ে তোলা হয়। ওই কারাগারই বর্তমানে জেলার সদর শহরে সিউড়ি জেলা সংশোধনাগার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
গবেষক তথা লেখক আদিত্য মুখোপাধ্যায় বলেন, জেলার নানা প্রান্তে স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত বহু স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তারমধ্যে এই কারাগার বা সংশোধনাগার অন্যতম। এই সংশোধনাগারে বন্দি সংগ্রামীরাই ব্রিটিশ বিরোধী ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সুর বেঁধে দিয়েছিলেন।