Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

বেড়ানো শেষে মনখারাপ, কাটবে কীভাবে

মাসখানেক হল শেষ হয়েছে ছুটি কাটানোর মরশুম। গ্রীষ্মের লম্বা ছুটির পালা শেষ করে কচিকাঁচারা ফিরেছে স্কুলে, তাদের বাবা-মাও ফিরেছেন কর্মক্ষেত্রে।

বেড়ানো শেষে মনখারাপ, কাটবে কীভাবে
  • ২৮ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

মাসখানেক হল শেষ হয়েছে ছুটি কাটানোর মরশুম। গ্রীষ্মের লম্বা ছুটির পালা শেষ করে কচিকাঁচারা ফিরেছে স্কুলে, তাদের বাবা-মাও ফিরেছেন কর্মক্ষেত্রে। ছুটিতে বাড়ি থাকার চেয়ে ছোটদের যেন স্কুলে ছোটাছুটিতেই যত মজা। তাই স্কুল খুললে তারা কিছুটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। বাচ্চার গরমের ছুটিতে বাবা-মাও স্বল্প পরিসরে ছুটির আবহ খুঁজে নেন। ক’টা দিন অফিস থেকে ম্যানেজ করে বেড়াতে যান খুদেকে নিয়ে। বেরিয়ে এসে তারপর আবার সেই একঘেয়ে কাজের পরিবেশে ফেরা। ছোটদের মতো তাঁদের কিন্তু মোটেও কর্মক্ষেত্রে ফেরার জন্য মন আঁকুপাকু করে না। উল্টে মনটা খারাপই হয়। কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই... হাহাকার করে ওঠে ভেতরটা। পোশাকি ভাষায় একে বলে ‘ট্র্যাভেল ব্লুজ’। কী করে এই মনখারাপ কাটিয়ে কাজে মন বসাবেন আবার? 

Advertisement

কেন বিরতি চাই?
বিষয়টি নিয়ে কথা হচ্ছিল মনোবিদ 
ডঃ নীলাঞ্জনা সান্যালের সঙ্গে। এই মানসিক পরিস্থিতি কীভাবে এবং কেন তৈরি হয় তা সবিস্তার বুঝিয়ে দিলেন তিনি। দেখিয়ে দিলেন এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার উপায়ও। তাঁর কথায়, ‘দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি সবসময়ে মানুষের জন্য ক্লান্তিকর। আমরা মূলত শহরের বাসিন্দা ধরে এই পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোচনা করছি। শহরের পারিপার্শ্বিক অবস্থা যার মধ্যে ধুলোবালি, যানবাহনের নিয়মিত শব্দ, অস্থিরতা, কর্মচঞ্চল পৃথিবীই বাস্তব। এটা মানুষকে নিয়ত ধাক্কা দেয়। কারণ প্রকৃতিগতভাবে মানুষের মন কিন্তু একটু নিরিবিলি, শান্ত, নির্জন পরিবেশ খোঁজে। মানসিক স্থিতিশীলতার জন্য একটা শান্ত অবস্থার প্রয়োজন অবশ্যই আছে। যত শান্ত অবস্থায়, আওয়াজহীন অবস্থায় আমরা সময় কাটাতে পারি, সেটা আমাদের এনার্জির উৎস হয়ে ওঠে। এটা থেকেই পরবর্তীকালে কর্মস্পৃহা তৈরি হতে পারে। কিন্তু নিরন্তর শ্রবণজনিত এই ধাক্কা এবং ক্রমাগত ছুটে চলার প্রবণতা কর্মস্পৃহাকে ক্রমাগত দমন করে। তাই আমাদের ছুটির প্রয়োজন হয়। ছুটি বলতে কাজ থেকে বিরতি নিয়ে বাড়ি বসে থাকা নয়। বাড়িতে বসে থাকলেও সেখানে নানাবিধ কাজ, লোকজন আসা, আওয়াজ চলতেই থাকে। এতেও অস্থিরতা বজায় থাকে। পরিচিত গণ্ডির বাইরে একটু অন্যরকম রুটিনে নিরিবিলিতে দিন কাটাতে পারলে অন্তরের সেই এনার্জিটা আবার ফিরিয়ে আনা যায়। জীবন সম্বন্ধে উৎসাহ ফিরে আসে।’
মন কেন মানে না 
নীলাঞ্জনার মতে, রুটিনমাফিক শৃঙ্খলিত জীবনে ফিরতে হবে ভাবলে ছোটরাও সবসময় চট করে ছুটি শেষ হলেও ফিরতে চায় না। তারা বায়না করে, আর দু’দিন ছুটি কাটিয়ে যাই। তাদের যুক্তিবোধ কম। কিন্তু বড়রা নানারকম দুশ্চিন্তা নিয়ে জীবনযাপন করেন। সেখানে শুধু কাজ এবং কাজ সংক্রান্ত জটিলতা নয়, ভবিষ্যৎ চিন্তা, শারীরিক উপসর্গ ইত্যাদি ভাবনাও থাকে। পাশাপাশি সারা বিশ্বে নানারকম কিছু ঘটে চলেছে, তাও বড়দের মনে কোনও কোনও সময় আঘাত হানে। সেই আঘাত বা উদ্বেলিত অবস্থার বাইরে কিছুক্ষণ যখন ছুটির মধ্যে থাকা যায়, তখন মনে হয় কিছুটা রেহাই পাওয়া গেল। সেখান থেকে ফেরার সময় স্বাভাবিকভাবেই বিষাদগ্রস্ত হয় মন। রোজকার রুটিনে ফেরার ইচ্ছে হয় না। তাছাড়া কর্মস্থল যদি একেবারেই মনমতো না হয়, বা বাড়ির ভিতরের পরিস্থিতি সুখকর না হয়, তাহলে ছুটির সফর থেকে ফেরার চিন্তা মন ভারাক্রান্ত করে তোলে। অনেকেরই মনে হয়, দু’দিন আগেও একটা শান্ত, সুন্দর পরিবেশে ছিলাম। ফিরতেই একরাশ চিন্তা, সব আলগা ভালোলাগা মাথা থেকে সরে গেল।
সমাধানের তিন পথ
এই মানসিক অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসবেন কীভাবে? তিনটি পথে এর মোকাবিলা করার উপায় দেখালেন নীলাঞ্জনা। 
তিনি বললেন, প্রথমত, নিজেকে বোঝাতে হবে সুখ বা দুঃখ কোনওটাই অনন্ত নয়। যতক্ষণ বেরিয়ে এলাম, ততক্ষণ অপেক্ষাকৃত ভালো ছিলাম। এই ভালোলাগাটা চলে গেল যখন তাতে ছেদ পড়ল। নিত্য কাজের চাপ এসে জুড়ল। তখন আমাদের ভাবতে হবে, এই ছেদটাও সাময়িক। আবার একটা সফরে যাব, তার জন্য টাকা জমাব, আর কোথায় গেলে মন ভালো হবে এমন নানা প্ল্যানিং নিজের মধ্যে চলতে থাকলে ট্র্যাভেল ব্লুজ কিছুটা কাটানো যায়। 
দ্বিতীয়ত, নিজেকে আরও একটা কথা বলতে হবে, এই একঘেয়ে জীবনে ফিরেছি বলেই রোজগার করছি। আর আয়ের পথটা আছে বলেই বেড়াতে যেতে পারছি। তাই বেড়ানোর আনন্দের উৎসটাকে আমরা যদি সদর্থকভাবে দেখি, তাহলে মনে হবে আরও কাজ করি, আরও চাপ নিই। ছুটি জমাই। অর্থ জমাই। তারপর আরও একটু দূরে ভালো কোনও জায়গায়, আরও একটু বেশি সময়ের জন্য বেরিয়ে আসব। এই ভাবনা থেকেও বিষাদ কাটবে।
তৃতীয় উপায় হচ্ছে, নিজেকে বোঝানো আমার কর্মক্ষমতা আছে বা আমি কাজের সঙ্গে জুড়ে আছি মানে আমার একটা এনগেজমেন্ট আছে। আমার জীবন কোনও না কোনও সময় কোনও না কোনও কাজে ব্যাপৃত—এই অবস্থাটাও জীবনের আশীর্বাদ। আমার যদি কাজ না থাকত, আমি যদি অবকাশেই সময় কাটাতাম, তাহলে তখন দীর্ঘ অবকাশও ভার হয়ে চেপে বসত। সুতরাং মনটা তৈরি করতে হবে এই ভেবে যে অবকাশ ভোগ করার জন্য কোথাও তার কিছুটা ঘাটতিরও প্রয়োজন আছে। কোথাও তার জন্য বেশি চাপ নেওয়ার প্রয়োজন আছে। আমার জীবনে ব্যস্ততা বা কাজ আছে, এটা মনে রাখলে শান্তি পাওয়া যাবে। এর সঙ্গে সঙ্গে যেখানে যেখানে বেড়াতে গিয়েছি, তার নির্দিষ্ট কিছু স্মৃতি যদি মাঝেমধ্যে রোমন্থন করা যায়, তাহলে সেটাও আমাদের মনের মধ্যে একটা ইতিবাচক অনুভূতি তৈরি করে। অনেকটা হালকা লাগবে তাতেও। এসব সম্বল আঁকড়েই কাজে মন বসাতে হবে আবার।
অন্বেষা দত্ত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ