অগ্নিভ ভৌমিক, চাপড়া (মহৎপুর): চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পাম্প মেশিন। রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে তাতে মরচে ধরেছে। চাষের কাজে ব্যবহৃত যন্ত্র ‘অযান্ত্রিক’ হয়ে পড়ে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এক সময়ের প্রায় ১২০০বিঘা চাষযোগ্য উর্বর জমি আজ শুধুই ধূ-ধূ মাঠ। চাপড়া এবং কৃষ্ণনগর-২ ব্লকের সীমান্ত এলাকায় খাস ও রায়ত জমির জটিলতায় চাষ বন্ধ রয়েছে। সমস্যায় পড়েছেন চাষিরা।
জমি জটিলতার এই সূত্রপাত জলঙ্গি নদীকে কেন্দ্র করে। বিগত ১০০বছরে এই নদী তার গতিপথের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। কয়েকশো বিঘা জমি চরে পরিণত হয়েছে। জটিলতার জেরে নিজেদের রায়ত জমিতেও চাষ করতে পারছেন না, এমনই অভিযোগ চাপড়া ব্লকের মহৎপুর পঞ্চায়েতের পুখুরিয়া গ্রামের শতাধিক পরিবারের।
নদীয়া জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক(ভূমি ও ভূমি সংস্কার) প্রলয় রায়চৌধুরী বলেন, ‘দুই ব্লকের চাষি ও স্থানীয় প্রশাসনকে নিয়ে বৈঠক করা হয়েছে। চরের খাস জমি ও রায়ত জমি নিয়ে গ্রামবাসীদের একটা সমস্যা রয়েছে। আমরা দ্রুত সমাধানের চেষ্টা করছি।’
একদিকে চাপড়া ব্লকের মহৎপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের মহৎপুর মৌজা। অন্যদিকে, কৃষ্ণনগর-২ ব্লকের চরমহৎপুর মৌজা। গ্রামবাসীদের কথায়, ১০০বছর আগে এই দুই মৌজাকে ভাগ করত জলঙ্গি নদী। নদী পেরিয়ে বংশপরম্পরায় চরমহৎপুর মৌজার রায়ত জমিতে চাষ করতেন মহৎপুরের পুখুরিয়া গ্রামের বাসিন্দারা। সেখানে দুই মৌজার প্রায় শতাধিক কৃষক পরিবারের কাছে ৩০০বিঘা রায়ত জমি রয়েছে। এই জমি পার্শ্ববর্তী হরিণডাঙার দেবীপুর থেকে পুখুরিয়া ফেরিঘাট পর্যন্ত বিস্তৃত। পরবর্তীতে, জলঙ্গির গতিপথের আমূল পরিবর্তন হয়। নদী ক্রমশ চাপড়া ব্লকের মহৎপুর মৌজার দিকে এগিয়ে আসে। তখন প্রায় ৬০০বিঘার বেশি জমি নদীর কবলে চলে যায়। পুখুরিয়ার চাষি আব্দুল রাজেশ মণ্ডল বলেন, ‘২০২১ সাল থেকে চাষ বন্ধ রয়েছে। নদীটি আগে মহৎপুর ও চরমহৎপুর মৌজার মাঝে ছিল। তারপর নদীর চর ভাঙতে ভাঙতে মহৎপুরের দিকে এগিয়ে যায়। চরমহৎপুরের দিকে ৩০০বিঘা রায়ত জমি রয়েছে। মহৎপুরের দিকে নদী সরে যাওয়ায় চরমহৎপুরে ৬০০ বিঘা জমি নদীর চরে পরিণত হয়েছে।
১৯৭৪ সালে মাঠ খসড়ার সময় ওই ৬০০ বিঘার মধ্যে ৩০০বিঘা জমি রায়তি রেকর্ড করে দেওয়া হয়। তারপর ৫০বছরে নদীর আরও কয়েকশো বিঘা চর জেগেছে। সবমিলিয়ে প্রায় ১২০০ বিঘা জমিতে সরকার চাষ আটকে রেখেছে।’ জানা গিয়েছে, এই জমি নিয়ে দুই মৌজার মধ্যে গ্রাম্য বিবাদ রয়েছে। তাই ২০২১ সালে প্রশাসনের তরফে সেই জমিতে চাষাবাদ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেই থেকেই মহৎপুরের আব্দুর রহিম, আসাদুল, কিসমত, লিয়াকতরা আর সেই চাষযোগ্য জমিতে ফসল ফলাননি। তাঁদের কথায়, সরকারি খাস জমিতে তাঁরা চাষ করবেন না। কিন্তু অন্তত তাঁদের রায়ত জমিতে চাষ করতে দেওয়া হোক। গ্রামের বাসিন্দা কাদেরআলি মণ্ডল বলেন, ‘আমার বাপ-ঠাকুরদা এই জমিতে চাষ করেছে। আমিও করেছি। কিন্তু বিগত চার বছর ধরে চাষ করতে পারি না। আমাদের বড় পরিবার। চাষ না করলে চলবে কী করে?’(চলবে)