নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর: নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদে যে সমস্ত অভিনব মিষ্টির উদ্ভাবন হয়েছিল তারমধ্যে অন্যতম ছানাবড়া। ছানাকে ভালো করে বেটে নিয়ে তা গোলাকার বলের মতো বানিয়ে ফুটন্ত ঘিয়ে ভাজার জন্য ছাড়া হয়। বেশ কিছুক্ষণ ভাজার পর লালচে কালো রং ধারলে সেগুলি কড়াই থেকে তুলে ঘন চিনির রসে ফেলে শক্ত করা হয়। এভাবেই ছানার বড়া বানিয়ে দু’জন মিষ্টির কারিগর বিখ্যাত হয়েছিলেন। সৈদাবাদের পটল সাহা ও গোপেশ্বর সাহা। পটলবাবু অবশ্য পটল ওস্তাদ নামেই খ্যাত ছিলেন। তাঁর হাতের ছানাবড়া খেয়ে সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকী রাজা মহারাজারাও মুগ্ধ হতেন। অবশেষে সেই ছানাবড়ার স্বীকৃতি মিলল। জিআই তকমা পেল বহরমপুরের বিখ্যাত ছানাবড়া।
নবাবি আমলেই এই মিষ্টির উদ্ভব হয়েছিল। কথিত রয়েছে, নবাবি আমলের প্রায় শেষের দিকে মুর্শিদাবাদ শহরে নিমাই মণ্ডল নামে এক ব্যক্তি মিষ্টির দোকান দিয়েছিলেন। সেই দোকানের ছানাবড়া নাকি খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। কথিত রয়েছে, সেই দোকান থেকে ছানাবড়া নিয়মিত নবাব প্রাসাদে সরবরাহ করা হতো। সৈদাবাদের পটল সাহা ও গোপেশ্বর সাহার তৈরি ছানাবড়া স্বাদে অন্য মিষ্টিকে হার মানাত।
কাশিমবাজারের রাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীও ছানাবড়ার খুব সমাদার করতেন। তাঁর হাত ধরেই ছানাবড়ার সুনাম মুর্শিদাবাদের গণ্ডি পেরিয়ে রাজ্যের আনাচে কানাচে ছড়িয়েছিল। এখন মুর্শিদাবাদের ছোট গলি বা পাড়ার মিষ্টির দোকানেও ছানাবড়া পাওয়া যায়। কিন্তু, ছানাবড়ার উদ্ভব যে শহরে হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়, সেই মুর্শিদাবাদ শহরেই আজ ছানাবড়ার খুব ভালো কোনও দোকান নেই বলে আক্ষেপ করেন কনেকে। পুরনো ঐতিহ্যবাহী যেসব দোকান ছিল সেগুলি আজ বন্ধ। বর্তমানে মুর্শিদাবাদের ছানাবড়া বললে বহরমপুরের ছানাবড়াকেই সাধারণত বোঝানো হয়। বহরমপুরের খাগড়ার ছানাবড়া আজও সমান জনপ্রিয়। শহরের আরও কিছু এলাকায় ভালোমানের ছানাবড়া এখনও পাওয়া যায়। সেই ছানাবড়া জিআই তকমা পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই খুশি মিষ্টি ব্যবসায়ীরা।
বহরমপুরের প্রসিদ্ধ মিষ্টি দোকানের কর্ণধার বৈশালীবিজয় সাহা বলেন, ছানাবড়া জিআই পাওয়ার ব্যাপারে আমার বাবা প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন। বাবা বলেছিলেন, রসগোল্লা যদি জিআই পেতে পারে তাহলে আমাদের ছানাবড়াও পেতে পারে। পরে সেই লড়াই আরও এগিয়ে নিয়ে যান এখানকার কয়েকজন মিষ্টি ব্যবসায়ী। বাইরে থেকে যাঁরা এই মিষ্টি খেতে আসেন তাঁরা সকলেই ভাবতেন এটা কালোজাম। একটু বড় সাইজের কালোজাম। ছানাবড়া বলে অনেকে মানতে চাইতেন না। এই স্বীকৃতি বহরমপুরবাসীর জন্য অত্যন্ত ভালো খবর। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে শুরু করে বিশিষ্টরা এখানকার ছানাবড়া খেয়েছেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব রাহুল গান্ধী বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সকলেরই এই ছানাবড়া খুব প্রিয়। এমনকী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ও আমাদের দোকানের ছানাবড়া পছন্দ করতেন।
বহরমপুরের আর এক মিষ্টি ব্যবসায়ী সৌম্যজিৎ সাহা বলেন, নবাবি আমলে পটল ওস্তাদের ছানাবড়া প্রথম তৈরি হয়। বহরমপুরের ছানাবড়ার যা গুণগত মান তা আর কোথাও পাওয়া যায় না। দীর্ঘদিনের পরিশ্রম আজ সফল হল। বিশ্বের দরবারে আমরা ছানাবড়া পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। ছানাবড়া আমাদের কাছে বরাবরই বিখ্যাত ছিল। এবার গোটা রাজ্য তথা দেশের কাছে বহরমপুরের ছানাবড়া বিখ্যাত হবে।