রান্নাঘরে ঢুকলেই মনে হয় কাজের যেন কোনও শেষ নেই। একটার পর একটা রান্না শেষ করে রান্নাঘর পরিষ্কার করা, ব্যবহার করা বাসনপত্র মেজে ধুয়ে ঠিক মতো পরিষ্কার করা, সবই যেন এক বিশাল দায়িত্ব। এর মধ্যেই একটি বড় চিন্তার কারণ হল রান্নার কড়াইয়ের কালো দাগ দূর করা। শত ঘষা মাজা করেও যেন সে দাগ তোলা মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। তবে যে কোনও কঠিন সমস্যার সমাধান পেতে হলে আগে সেই সমস্যাকে গোড়া থেকে জানতে হবে। রান্নার সময় আপনার ঠিক কোন কোন দিকে গাফিলতি হচ্ছে যার ফলে এই ধরনের কালো দাগ পড়ছে কড়াইতে।
মূলত, তাড়াতাড়ি রান্না শেষ করার চেষ্টায় কড়াইতে অতিরিক্ত তাপ দিলে পোড়া কালো দাগ তৈরি হয়। কখনও কখনও এই অতিরিক্ত তাপের কারণে রান্না পুড়ে যায়। তার ফলেও পোড়ার দাগ তৈরি হয়। এছাড়া, গ্যাসে রান্না চাপিয়ে তা বার বার নাড়াচাড়া না করলেও খাবার নীচে লেগে পুড়ে যায় এবং তৈরি করে পোড়ার দাগ। আরও একটি পরিচিত কারণ হল খাবারের দাগ লেগে থাকলে তা পুড়ে গিয়ে এমন কালো পোড়া দাগে রূপান্তরিত হয়। চিনি বা তেল মশলা রয়েছে এমন খাবার রান্নার সময় কড়াইয়ের গায়ে লেগে গেলে এই সমস্যা তৈরি হয়। আবার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুধ গরম করা বা জ্বাল দেওয়ার সময় অতিরিক্ত তাপের কারণে দুধ অতিরিক্ত ফুটে উঠে পাত্রের বাইরে পড়ে যায় এবং তৈরি করে পোড়ার দাগ। আবার, দিনের পর দিন একই পাত্রে দুধ গরম করা হলে পাত্রের গায়ে দুধ জমতে থাকে এবং গরম আঁচে তা পুড়ে গিয়ে পোড়ার দাগ তৈরি করে।
জেনে গেলেন যে, ঠিক কোন কোন কারণে আপনার রান্নার কড়াই বা পাত্রগুলিতে পোড়া কালো দাগ তৈরি হয়েছে। চলুন এইবারে চটপট দাগগুলি দূর করার উপায় জেনে নেওয়া যাক।
বেকিং সোডা, নুন, ভিনিগার এবং লেবুর রসের মতো ঘরোয়া উপকরণ দিয়েই মিলবে এই কঠিন সমস্যার চটজলদি সমাধান।
সাবানের জাদু
আপনি যদি বাসন মাজার ক্ষেত্রে লিকুইড সাবান ব্যবহার করেন তাহলে প্রথমেই কড়াইয়ের পোড়া অংশে খানিকটা জল দিয়ে তাতে সামান্য কয়েক ফোঁটা লিকুইড সাবান দিয়ে ৫ থেকে ১০ মিনিট ভালো করে ফোটান। এরপর ঠান্ডা করে বাসন মাজার স্পঞ্জ দিয়ে হালকা হাতে ঘষে নিন। জমে থাকা কালো দাগ নিমেষের মধ্যে হবে গায়েব।
সোডা-ভিনিগারের জুটি
কড়াইয়ের কালো দাগ তুলতে বেকিং সোডা এবং ভিনিগারের কোনও তুলনা হয় না। কীভাবে ব্যবহার করবেন? প্রথমে পুড়ে যাওয়া প্যানে বা কড়াইতে এক কাপ ভিনিগার দিয়ে তা অল্প আঁচে গরম করে নিন। এরপর গ্যাস থেকে নামিয়ে তাতে অল্প বেকিং সোডা ছিটিয়ে দিলেই দেখবেন ফেনা তৈরি হচ্ছে। নাড়াচাড়া না করে সেই অবস্থাতেই অন্তত ১০মিনিট রেখে দিন। এরপর কাপড় দিয়ে হালকা হাতে মুছে নিলেই পোড়া দাগ উঠে গিয়েছে।
সতর্ক হলেই সমাধান
আপনার বাড়িতে যদি হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড থাকে তাহলে জানবেন এটি কড়াইয়ের দাগ তুলতে মোক্ষম একটি অস্ত্র। পোড়া অংশ ঢেকে যাবে সেই মতো পরিমাণে এই রাসায়নিকটি ঢেলে দিন দাগের উপর এবং খুবই সাবধানে অল্প আঁচে গরম করুন। কিছুক্ষণ পর ফেনা তৈরি হলে গ্যাস বন্ধ করে অপেক্ষা করুন। তারপর ধুয়ে ফেলুন। এক্ষেত্রে অবশ্যই হাতে গ্লাভস ব্যবহার করবেন। নাহলে এই রাসায়নিক আপনার হাত পুড়িয়ে ফেলতে পারে।
আরও সহজে
এগুলো ছাড়াও যদি আরও সহজ সমাধান চান তাহলে কড়াইতে টম্যাটো স্যস মাখিয়ে রেখে দিন। শুকিয়ে গেলে রোজকারের বাসন মাজার সাবান দিয়ে মেজে ফেলুন। স্টিলের কড়াই নতুনের মতো চকচক করবে। এছাড়া, খাবারের দাগ লাগা পোড়া কড়াইতে জল নিয়ে ২-৩ টুকরো পাতিলেবু সেদ্ধ করতে দিন। ভালো করে ফুটে গেলে দেখবেন লেগে থাকা খাবার ভেসে উঠেছে। এরপর আগের ওই একই পদ্ধতিতে ভালো করে ধুয়ে ফেলুন।
এ তো গেল সমস্যার সমাধান। তবে, এই সমস্যা এড়াবেন কীভাবে এবার সেটাও জেনে নেওয়া যাক।
প্রথম ধাপই হল, রান্নার পাত্রটি যেন স্টিলের হয়। কারণ, অ্যালুমিনিয়ামের তুলনায় স্টিলের বাসনের পোড়ার দাগ অনেকটাই কম পড়ে। আপনি চাইলে, নন-স্টিক বাসন ব্যবহার করতে পারেন। এগুলিতে সহজে খাবার আটকে যায় না। তাই পোড়া দাগের সম্ভাবনা কম থাকে। স্টেইনলেস স্টিল ব্যবহার করতে পারেন। কারণ সঠিক পরিমাণে তেল এবং মাঝারি আঁচে রান্না করলে এতে কালো দাগ পড়ে না।
এছাড়াও, রান্না সবসময় মাঝারি বা কম আঁচে করুন। তাতে অতিরিক্ত তাপে খাবার দ্রুত পুড়ে যাবে না। যদি আপনি স্টেনলেস স্টিলের মতো পাত্রে রান্না করেন, তাহলে রান্না করার আগে যথেষ্ট পরিমাণে তেল বা মাখন গরম করে নিন। এতে পোড়ার দাগ এড়ানো যাবে। এছাড়া, খাবার যাতে পাত্রের তলায় লেগে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখুন। রান্না চাপিয়ে মাঝে মাঝে নেড়ে দিন। এর ফলে, খাবার কড়াইয়ের তলায় ধরে যাবে না। রান্নার পর সবসময়ে পাত্রটি জলে ভিজিয়ে রাখুন। যাতে অল্প সাবান দিয়ে ঘষলেই ভালো মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। পাশাপাশি, যদি দেখেন যে একবার কড়াইতে দাগ ধরেছে, সময় বুঝে পরিষ্কার করার কথা না ভেবে উল্লেখিত যেকোনও একটি টিপস ব্যবহার করে দাগ দূর করুন। নিয়মিত রান্নার পাত্র ভালো করে পরিষ্কার রাখলে পোড়া কালো দাগ কম জমবে।
কথিকা পাল