


অর্পণ সেনগুপ্ত, কলকাতা: পূর্ববঙ্গ থেকে এপার বাংলায় উদ্বাস্তু হয়ে আসা মানুষের জীবনসংগ্রাম নিয়ে অনেক সাহিত্য, সিনেমার সঙ্গে আমরা পরিচিত। শুধু সাহিত্য বা সিনেমার মাধ্যমে নয়, আমাদের অনেকেই সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন সেই কঠিন দিনগুলি। তবে, অনেকটাই প্রচারের আড়ালে থেকে যায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ব পাকিস্তানে পাড়ি দেওয়া মানুষের গল্প। ধর্মীয় কারণে এপার থেকে অনেক মুসলমানই পাড়ি দিয়েছিলেন সেখানে। তবে, তাঁদের অনেকেরই স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল। ফিরেও আসতে বাধ্য হয়েছিলেন বহু মানুষ। এঁদের নিয়েই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক নিসারুদ্দিন আহমেদের গবেষণাপত্র ঠাঁই পেয়েছে এশিয়ান স্টাডিজ রিভিউ জার্নালে।
ওপার বাংলায় পাড়ি দেওয়া মানুষকে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। সর্বপ্রথম ভাগটিকে বলা হচ্ছে অপটিজ। দেশভাগের সময় এঁরা ব্রিটিশ ভারতে বাংলার সরকারের অধীনে কাজ করতেন। তাঁদের কেন্দ্রীয় সরকার বিকল্প দেয়, ভারত বা পাকিস্তানের সরকারি চাকরিতে যোগদানের জন্য। তখন বহু মুসলমান সরকারি কর্মী, আধিকারিক (পিওন থেকে শুরু করে পুলিশ আধিকারিক এবং আমলা) পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান। সেখানে গিয়ে তাঁরা ভাষা, পরিকাঠামোগত সমস্যায় পড়েন। শুধু তাই নয়, অনিয়মিত রেশন, বিদ্যুৎ এবং পানীয় জলের অভাবে তাঁরা নাজেহাল হয়ে পড়েন। উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে মহম্মদ মোসলেম আলি নামে এক সরকারি আধিকারিকের কথা। দেশভাগের আগে তিনি রাইটার্স বিল্ডিংসে চাকরি করতেন। ওপারে গিয়ে তিনি ঢাকার পুরানো নবাবগঞ্জ এলাকায় একটি দু-কামরার ভাড়া বাড়িতে ওঠেন। অনেক পরে তিনি মতিঝিল এলাকায় বাড়ি নিতে পারলেও স্বীকার করেছেন, আগে তাঁর জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত ছিল।
আরেকটি ভাগ হল প্যাট্রিয়ন অ্যান্ড জব সিকার্স। মুসলিমদের জন্য তৈরি হওয়া একটি দেশকে ভালোবেসে এবং সেখানে মুসলমানদের জন্য বেশি কাজের সুযোগ থাকবে, এই ভেবে তাঁরা পূর্ব পাকিস্তানে পাড়ি দেন। এভাবে বহু শিক্ষিত মুসলমান কাজের সন্ধানে সেখানে যান। তাঁরা গিয়ে কোনো-না-কোনো চাকরি জুটিয়ে নিতে পারেন ঠিকই, তবে, বাসস্থান এবং অন্যান্য সমস্যার সম্মুখীন হন তাঁরা। অন্যদিকে, ১৯৪৬ সালে কলকাতা, নোয়াখালি এবং বিহারে দাঙ্গার পরে বহু মুসলমান পূর্বমুখী হন। সামান্য সম্বল নিয়ে নতুন জায়গায় আস্তানা গেড়ে তাঁরা মানসিকভাবে এবং আর্থিকভাবে আগের অবস্থায় পৌঁছাতে পারেননি। এছাড়া একটা বড়ো অংশ ছিল হোম কামার্স। আদতে পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা বহু মানুষ কাজ ও ব্যবসার কারণে কলকাতা সংলগ্ন এলাকা বা পশ্চিমবঙ্গের বর্ধিষ্ণু জেলাগুলিতে এসে থিতু হন। দেশভাগের পরে তাঁরা আবার পূর্ববঙ্গে ফিরে যান। দেশভাগ না-হলে এঁরা কেউই নিজের পুরানো জায়গায় ফিরে যেতেন না। তাই এটাও দেশভাগের ফল বলেই ধরা হয়েছে। এরপর আসে এক্সচেঞ্জিস। এপার বাংলার মুসলমানরা এখানে তাঁদের বাড়ি ও সম্পত্তি বিনিময় করে নেন ওপার বাংলা থেকে আসা হিন্দুদের সঙ্গে। মূলত মধ্য এবং উচ্চবিত্ত মানুষের মধ্যেই এটা ঘটে।
একটা বড়ো অংশ ছিলেন হিন্দি এবং উর্দুভাষী মুসলমানও। পাকিস্তান সরকারের ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, ১ লক্ষ ১৮ হাজার ১৮১ জন উদুভার্ষী মুসলমান পাড়ি দিয়েছিলেন পূর্ববঙ্গে। এঁদের অনেকেই বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং অসমের বাসিন্দা ছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়ার চেয়ে পূর্ব পাকিস্তানে যাওয়াই তাঁদের জন্য সুবিধাজনক ছিল। তবে, সেখানে গিয়ে সরকারি আধিকারিকদের বৈষম্যের মুখে পড়েন অনেকে। বাংলাভাষীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন তাঁরা। আবার অনেক সরকারি অফিসার ভাষাগত বৈষম্য না করেই এক হারে ঘুষ নিয়ে গিয়েছেন উদ্বাস্তুদের থেকে। জমির পাট্টা এবং অন্যান্য সুযোগের পরিবর্তে সরকার নির্ধারিত অর্থের বহুগুণ বেশি নিয়েছেন। ১৯৫১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম (৪১,৯৩৫), ঢাকা (১,৬২,৮৫৫) এবং রাজশাহি (৪,৯৪,২৮৯) ডিভিশনে মোট ৬ লক্ষ ৯৯ হাজার ৭৯ জন উদ্বাস্তু ছিলেন। এঁদের অনেকেই পরবর্তীকালে স্বপ্নভঙ্গের কারণে ফিরে আসতে বাধ্য হন।