সুদীপ্ত রায়চৌধুরী: একটা গল্প বলি। ঠিক গল্প নয়, বলা যেতে পারে একটা ঘটনার বর্ণনা। কোথায় শুনেছিলাম, তা এখন আর মনে নেই। সেটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণও নয়। ঘটনাটা হল, একবার একটা সফট ড্রিংকস সংস্থা পশ্চিমি দেশগুলিতে বিশেষ ধরনের বিজ্ঞাপনী প্রচার চালিয়েছিল। ছবি ও কার্টুন দেওয়া ওই পোস্টারে দেখা যায়, এক ব্যক্তি তীব্র রোদে ক্লান্ত মরুভূমিতে শুয়ে রয়েছেন। পরের ছবি একটা কার্টুন ক্যারেক্টারের। যিনি ওই সফট ড্রিংকসটি পান করছেন। তৃতীয় ছবিতে দেখা যাচ্ছে ওই ব্যক্তি দৌড়াচ্ছেন। মোদ্দা কথা, ওই সফট ড্রিংকস পান করতে মানুষজন ক্লান্তি ভুলে প্রাণ ফিরে পায় এবং দৌড়াতে শুরু করে। তুমুল হিট হয় বিজ্ঞাপনটি। এর পরেই যে কোনও কর্পোরেট সংস্থার মতো একই রাস্তায় হাঁটে সেই সফট ড্রিংকস সংস্থাটি। বিশ্বের অন্যত্রও একই বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রচার করার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আরব দুনিয়ায় বিজ্ঞাপনটি সুপারফ্লপ করে। শুধু তাই নয়, বিক্রি কমে যায় ওই সফট ড্রিংকসের। মাথায় হাত সংস্থার কর্তাদের। এমন সফল বিজ্ঞাপন কীভাবে ফ্লপ হতে পারে! ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বার করার দায়িত্ব দেওয়া হয় মার্কেটিংয়ের একটি দলকে। তারা আরব দুনিয়ার বিভিন্ন দেশের বাজার ঘুরে বুঝতে পারেন কারণটা। ওখানে সবাই আরবিভাষী। ডানদিক থেকে বাঁদিকে পড়েন। ফলে তাঁদের কাছে বিজ্ঞাপনের বার্তাটি দাঁড়ায়—এক ব্যক্তি সুস্থ অবস্থায় দৌড়াচ্ছেন। এরপর তিনি ওই সফট ড্রিংকসটি পান করছেন। তার পরেই অসুস্থ হয়ে শুয়ে পড়ছেন। অর্থাৎ, পুরো বার্তাটাই উলটো হয়ে গিয়েছে। পশ্চিমি দুনিয়ায় যে বিজ্ঞাপনী ভাষা ছিল প্রাণশক্তির প্রতীক, আরব দুনিয়ায় সেটাই হয়ে গিয়েছে নেতিবাচক একটা বার্তা।
এই ঘটনাটা হয়তো বাস্তবে ঘটেনি। কিন্তু মার্কেটিংয়ের ক্লাসে এই উদাহরণটা মাস্ট। মানুষকে, তার ভাষা-সংস্কৃতিকে না বোঝার ভুল কীভাবে একটা বিশাল ব্র্যান্ডের সুনাম ও বিক্রিকে মুহূর্তে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আর মানুষের পালস বুঝতে পারা? যে কোনও পেশায় সাফল্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে সেখানেই। এক কথায় যাকে বলে—কমিউনিকেশন। চাকরি, ব্যবসা হোক বা রাজনীতি—যে কোনও ক্ষেত্রেই এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। আর সেই কথাটাই আরও একবার স্পষ্ট করে দিলেন নিউ ইয়র্কের সদ্য নির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি। ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই তরুণ ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট নেতা দেখিয়ে দিয়েছেন, প্রযুক্তির রমরমা যুগেও রাজনীতির মূল শক্তি মানুষের আস্থা-ভরসা অর্জন। তার উপায়? মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাওয়া, তাঁদের সঙ্গে কথা বলা, তাঁদের বোঝানো এবং সবচেয়ে বড়ো কথা—তাঁদের কথা শোনা।
নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে জয়ের পর থেকেই মামদানির প্রচার কৌশল নিয়ে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের সংবাদমাধ্যমেই বিস্তর আলোচনা চলছে। উঠে আসছে বিভিন্ন দিক। তার মধ্যে অন্যতম—নিখুঁত ও নিবিড় জনসংযোগ। প্রচারের ক্ষেত্রে নিজের কমিউনিকেশন স্কিলকে একটা বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তাতেই এসেছে সাফল্য। কখনও নিউ ইয়র্কের চলন্ত সাবওয়েতে বসে ইউটিউবার, সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, কখনও আড্ডা দিতে বসে পড়েছেন ইয়োলো ক্যাব ড্রাইভারদের সঙ্গে। কখনও আবার তাঁর নির্বাচনী তহবিলে মাত্র ১০০ ডলার দেওয়ার জন্য নিজে ফোন করে প্রেরককে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। প্রচার তহবিলে ১০০ ডলার দেওয়ার জন্য স্বয়ং প্রার্থীর ফোনে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অফ আমেরিকা (ডিএসএ) নামে এক বামপন্থী সংগঠনের সদস্য জ্যাকারি কান। কারণ, টাকার বিচারে ১০০ ডলার নেহাত ফেলনা না হলেও ভোটের তহবিলের হিসেবে তা আর কতটুকু! বিশেষ করে কর্পোরেটদের লক্ষ লক্ষ ডলার অনুদানের কাছে ১০০ ডলার তো নস্যি। তার পরেও ফোন করেছিলেন জোহরান। পৌঁছে গিয়েছিলেন সাধারণ মানুষের কাছে।
জোহরান মামদানির নির্বাচনী প্রচারের মূল ভিত্তি ছিল—ডোর-টু-ডোর ক্যাম্পেইন। তিনি একা নন অবশ্য। তাঁর হয়ে প্রচারে নেমেছিলেন প্রায় লক্ষাধিক স্বেচ্ছাসেবক। ডিজিটাল যুগে নির্বাচন মানেই বড়ো বাজেটের বিজ্ঞাপন, টার্গেটেড সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেন, অ্যালগরিদমের হিসেব কষে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট। সেই সময়ে দাঁড়িয়ে মামদানি ফিরে গেলেন মানুষের দরজায়। তিনি এবং তাঁর স্বেচ্ছাসেবকরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে জানালেন, কীভাবে তাঁর নীতি, তাঁর প্রতিশ্রুতি সরাসরি তাঁদের জীবনে প্রভাব ফেলবে। মাইক্রো-টার্গেটিংয়ের বদলে তিনি জোর দিলেন হাইপার-লোকাল কথোপকথনে। নিজের বক্তব্যে কখনও মামদানি কোনও নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠী বা নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক শ্রেণিকে টার্গেট করেননি। তার বদলে প্রতিটা জায়গায় সমস্যাকে আলাদা আলাদা করে চিহ্নিত করেছেন। তা সে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, ট্রান্সপোর্টই হোক বা পুলিশি হয়রানি। অভিবাসীদের অধিকার নিয়েও সমান সরব তিনি।
মা ভারতীয়। বাবা উগান্ডান। কিন্তু আদ্যন্ত মার্কিনি জোহরান অভিবাসীদের কাছে প্রচারের সময় ইংরেজির পাশাপাশি কথা বলেছেন হিন্দি, উর্দুতে। প্রচার চলেছে বাংলাতেও। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলিউডি গান। রাজনীতির বড়ো বড়ো কথার বদলে নিউ ইয়র্কের আম জনতার দৈনন্দিন সমস্যার সরাসরি সমাধানের কথা শোনা গিয়েছে তাঁর মুখে। আপনার বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে বা ভরা বাজারে আপনার মুখোমুখি হয়ে প্রার্থী যখন আপনারই নিত্যদিনের সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেন, তিনি তো বাকিদের থেকে কয়েক গুণ এগিয়ে যাবেনই। ঠিক সেটাই হয়েছে মামদানির সঙ্গেও। একইসঙ্গে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, রাজনীতি আজও মানুষের। এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কোনও বিকল্প নেই।
আজ না হোক, ভবিষ্যতে হয়তো কখনও কোনও ম্যানজেমেন্ট স্কুলের সিলেবাসে জায়গা করে নেবে জোহরান মামদানির এই আধুনিক রাজনীতির কমিউনিকেশন মডেল। আর তার আগের অধ্যায়েই থাকবে আরও এক রাজনীতিবিদের নাম। তিনি—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের গুরুত্ব যে কতটা, তা বোধহয় এই মুহূর্তে বাংলা তথা দেশের রাজনীতিতে এত ভালোভাবে আর কেউ বোঝেন না। মামদানির নির্বাচনী সাফল্য যতটা নতুন যুগের, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কমিউনিকেশন কৌশল ততটাই সময় পরীক্ষিত এবং বহুমাত্রিক। তাঁর রাজনীতি আসলে মানুষের রাজনীতি। একেবারে নিচুতলার মানুষ থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত, কৃষক, মহিলা, ছাত্র, সংখ্যালঘু—প্রত্যেকের সঙ্গেই তাঁর যোগাযোগ সরাসরি ও ব্যক্তিগত। আর মূল শক্তি? যে কোনও পরিস্থিতিতে মানুষের ভাষা বুঝতে পারার অনায়াস দক্ষতা।
তৃণমূল সুপ্রিমোর কমিউনিকেশন স্কিলকে আতশকাচের নীচে রাখলে প্রথমেই আসে তাঁর নিমেষে সমস্যা বোঝার ক্ষমতা। আর সেই কারণে প্রচার হোক বা প্রশাসনিক বৈঠক, জেলা সফর বা পথসভা—মমতার প্রতিটি ঘোষণায় থাকে সেই অঞ্চলের সমস্যা ও তার সমাধানের কথা। নিজের রাজ্যকে তাঁর চেয়ে ভালো বোধহয় আর কেউ চেনেন না। তার প্রমাণ মেলে জেলা সফরগুলিতে বক্তব্য রাখার সময়। উত্তরবঙ্গের বক্তৃতার কাঠামোর সঙ্গে জঙ্গলমহল, নদীয়া বা দক্ষিণ ২৪ পরগনার কোনও মিল নেই। প্রতিটি স্বতন্ত্র। তাঁর ভাষা, কথার টোন শুনলে সেখানকার মানুষটির মনে হবে, ‘আরে, এই কথাটা তো আমার জন্যই বলা।’ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মমতার অন্যতম প্রধান শক্তি তাঁর ব্যক্তিত্ব। সাধারণ শাড়ি, চটি, সরল জীবনযাপন, হেঁটে যাওয়া, অতি সহজ ভঙ্গিতে কথা বলা—এ সবই তাঁকে সাধারণ মানুষের বড়ো আপন করে তোলে। আবার ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, দুর্ঘটনা—যখনই কোনও ঘটনা ঘটে, তিনি পৌঁছে যান মানুষের পাশে। ফলে মানুষ তাঁকে ‘রাজ্যের প্রশাসক’-এর পাশাপাশি ‘দিদি’র মতো অভিভাবক হিসেবে ভালোবাসেন। বিরোধীদের সমালোচনা করতে গিয়ে শুধুমাত্র সেখানেই থেমে যান না তিনি। বরং তুলে ধরেন, ‘আমরা কী করেছি এবং পরে কী করব’ সেই বার্তা। যা আম জনতার অবচেতনে তৈরি করে ফরোয়ার্ড লুকিং ন্যারেটিভ। যা থেকে জন্ম নেয় ভরসা-আস্থা। আসলে বাংলার রাজনীতিতে বহু নেতা থাকলেও ‘জনসংযোগের ধারাবাহিকতা’—দেখা যায় শুধু মমতার মধ্যে।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমি দেশগুলির ধাঁচে ভারতের রাজনীতিতেও পলিটিক্যাল স্ট্যাটেজিস্টদের উত্থান হয়েছে। এসেছে একাধিক সংস্থা। তারা অ্যাসাইমেন্টের ঢঙে বরাত নেওয়া রাজনৈতিক দল ও তাদের প্রার্থীকে প্রোডাক্ট হিসেবে আম জনতার কাছে তুলে ধরেন। তাদের কাছে ভোটাররা হলেন ক্রেতার মতো। ঝকঝকে পণ্য (পড়ুন ভোটপ্রার্থী) দেখিয়ে ক্রেতাদের মন জয়ই তাদের লক্ষ্য। ভারতের রাজনীতির ময়দানে এমনই একজন ভোটকুশলী হলেন প্রশান্ত কিশোর। একটা সময়ে ভারতের রাজনীতিকে চমকে দিয়েছিলেন পিকে ও তাঁর পলিটিক্যাল কনস্যালটেন্সি সংস্থা আইপ্যাক। একাধিক নির্বাচনী প্রচারে সাফল্যের পর আইপ্যাক ছেড়ে রাজনীতির ময়দানে নামেন পিকে। বিহার নির্বাচনের প্রচারপর্বে ঝড় তোলে তাঁর দল জন সুরাজ পার্টি। কিন্তু ফলপ্রকাশের পর দেখা গেল, ভোটের দৌড়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে পিকের দল। যা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট—কৌশল যতই নিখুঁত হোক না কেন, সঠিক যোগাযোগ না থাকলে রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে সব কৌশল ব্যর্থ হয়ে যায়। পিকে যেখানেই গিয়েছেন, সেখানে জনতা ভিড় করেছে। তাঁর কথা শুনেছে। হাততালি দিয়েছে। কিন্তু ভোট দেয়নি। আসলে ভারতীয় রাজনীতিতে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে—হাততালি আর ভোট এক জিনিস নয়। মানুষ নেতাদের কথা শুনে হাততালি দেয়, কিন্তু ইভিএমের সামনে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুহূর্তে ওই সমস্ত কথা আর মনে পড়ে না। বিহারের নির্বাচনে পিকের প্রচার মাস কমিউনিকেশন (গণ যোগাযোগ) হিসেবে শক্তিশালী হলেও ইন্টার-পার্সোনাল কমিউনিকেশনের (ব্যক্তি যোগাযোগ) ক্ষেত্রে ছিল দুর্বল। মানুষ প্রশান্ত কিশোরকে টিভিতে, পোস্টারে, মঞ্চে দেখেছে। কিন্তু নিজের বাড়ির সামনে জন সুরাজ পার্টির কাউকে দেখেননি। আর মনে রাখা দরকার, রাজনীতিতে মানুষের সিদ্ধান্ত নির্ভর করে পরিচিত মুখের উপর। যারা বাড়ির দোরগোড়ায় আসে, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ায়। শুধু বড়ো পোস্টার বা পদযাত্রার ভিডিও দিয়ে মানুষের বিশ্বাস জয় করা যায় না।
এখানেই পথ দেখিয়েছেন মামদানি-মমতা। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, প্রচারের সমস্ত মাধ্যম ব্যবহার করার পাশাপাশি ভোটারদের বাড়ির দরজায় পৌঁছে তাঁদের কাছে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার কোনও বিকল্প নেই। আর সেই কারণেই সমাজ-সংস্কৃতিগতভাবে ভিন্ন দুই রাজনীতিবিদের সাফল্যের ভিত্তি একই—নিবিড় যোগাযোগ।
নেতার কাজ শুধু বক্তৃতা দেওয়া নয়, মানুষকে বোঝা। পিকে যদি বুঝতেন...।