প্রীতম দাশগুপ্ত: ক্ষমা মহৎ গুণ। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ক্ষমার চেয়েও বড়ো হল আত্মসমালোচনা। আত্মসমালোচনা ছাড়া রাজনৈতিক শুদ্ধতার দাবি, অনেকটা সোনার পাথরবাটির মতো। শুধু শুনতেই সুন্দর লাগে। দিনের শেষে একটি লোকদেখানো বক্তব্য হিসাবেই থেকে যায়। কেন এই প্রসঙ্গের অবতারণা?
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় বার্তা দিয়েছেন। শুক্রবার গভীর রাতে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ওই ভিডিয়ো বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি বলেন, যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারী পথভ্রান্ত ছেলে-মেয়েরা তাঁকে এবং তাঁর প্রয়াত মাকে উদ্দেশ করে যে কদর্য ভাষা ব্যবহার করেছে, তা কোনো সভ্য সমাজের পরিচায়ক নয়। এই ঘটনায় তিনি রীতিমতো সাংস্কৃতিক ধাক্কা খেয়েছেন। পাশাপাশি মোদি এও জানিয়েছেন যে, ওই পড়ুয়াদের তিনি ক্ষমা করে দিতে চান। পুলিশ বা আদালতের চক্করে ফেলে ওই কিশোর-কিশোরীদের হেনস্তা করা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। বরং তাদের সঠিক পথ দেখানোই সমাজের দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী মোদির বয়স ৭৫ পেরিয়েছে। তাই অভিভাবক হিসাবে বাচ্চাদের তিনি পথ দেখাতেই পারেন। দেখানোই উচিত। এতে কোনো অন্যায় নেই। বরং এটা তো তাঁর মহানুভবতা। সত্যি খুব ভালো বিষয়। কিন্তু তারপরও প্রশ্ন উঠছে কেন?
ছোটোবেলায় শিখেছিলাম, ‘আপনি আচরি ধর্ম অপরে শিখাও’। অর্থাৎ, নিজে নীতিহীন থেকে অন্যকে নীতির কথা বলা যায় না। আদর্শ শিক্ষক হতে হলে আগে নিজেকে সেই আদর্শের অধিকারী হতে হয়। গোদা বাংলায় বলতে গেলে, আগে নিজে করো, তারপর অন্যকে জ্ঞান দিতে এস। সেই কারণেই মোদির এই ক্ষমা করে দেওয়ার বার্তাকে নাটক বললে কি অত্যুক্তি হবে? কেন বললাম? মোদি নিজে বিভিন্ন জনসভায় বিরোধী নেতা-নেত্রীদের সম্পর্কে কত কটূ কথা বলেছেন, তা কি তাঁর মনে আছে? একটি বিশেষ ধর্মীয় সম্প্রদায়কে ‘মিঁয়া’ বলে দেগে দেওয়ার মূল কারিগর কে? তিনি নিজে বর্তমান বিরোধী দলনেতাকে ‘পাপ্পু’ কিংবা ‘শাহজাদা’ বলে চিহ্নিত করেছেন। বিরোধীরা ‘মুজরা’ করছে বলে কে বিহারের জনসভায় ভাষণ দিয়েছিল? যখন সংসদে বিএসপি সাংসদ দানিশ আলিকে বিজেপি সাংসদ রমেশ বিধুরী অশালীন শব্দ ব্যবহার করেন, তখন মোদিজি চুপ থাকেন কেন? অনুরাগ ঠাকুর যখন ‘গোলি মারার’ কথা বলেন, তখন তো মোদিজির মুখে কোনো কথা শোনা যায় না। বিজেপি প্রতিদিন অপারেশন সিন্দুর নিয়ে জয়গান করতে থাকে। আর সেই অপারেশনের মুখ হিসাবে পরিচিত কর্নেল সোফিয়া কুরেশি সম্পর্কে সেই দলেরই এক মন্ত্রী আপত্তিকর মন্তব্য করে সুপ্রিম কোর্টের ধমক খান। মোদিজিকে বলতে শুনিনি, ভুল করেছেন। জেন জি আন্দোলন নিয়ে তাঁর দলের সাংসদ কঙ্গনা রানাওয়াতের কদর্য ভাষা নিয়ে কোনো রিল তো দেখিনি। আর তাঁর দলের আমাদের রাজ্যের কান্ডারিরা তো এখন এককদম এগিয়ে গিয়েছেন। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দেশের বিরোধী দলনেতাকে অশালীন ভাষায় আক্রমণ করছেন। এক বিধায়ক ককরোচ আন্দোলনকে বলেছেন, হিন্দির চুলের আন্দোলন। রাজ্যের সভাপতি তো কথায় কথায় ঠ্যাং ভেঙে দেওয়ার কথা বলছেন। শুনেছেন মোদিজিকে কোনো বার্তা দিতে? মোদিজি আপনার মা, মা। রাহুল গান্ধীর মা, মা নন? আপনার মা সম্পর্কে অশালীন শব্দ প্রয়োগ যেমন অন্যায়, তেমনি সোনিয়া গান্ধী সম্পর্কেও। আপনার দলের নেতারাই তো সোনিয়াজিকে বারমেইড, ওয়েট্রেস বলেছিলেন? কখনও আপত্তি করেছেন। করবেন কেন, আপনি নিজেই তো একসময় তাঁকে ‘জার্সি গোরু’ বলেছিলেন। এখানেই শেষ নয়। বিজেপির আইটি সেল প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় বিরোধী নেতৃত্ব, সমাজকর্মী বা সাধারণ প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে কী ভাষা প্রয়োগ করেন। সেটা কি প্রধানমন্ত্রী জানেন না? কোনোদিন শুনেছেন, প্রধানমন্ত্রী বলছেন, এই সব অশালীন শব্দ প্রয়োগ করা উচিত নয়। তাঁর দলের এই ‘সুযোগ্য সন্তান’দের কখনোই সংশোধনের বার্তা মোদি দিয়েছেন বলে তো শুনিনি। তিনি নিজে যখন একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, তখন তাঁর দলের নেতা-কর্মীরা একটি সম্প্রদায়কে সবক শেখাতে নেমেছিলেন। তাদের বীরের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। হাতরাস থেকে উন্নাও, ভুলে গিয়েছেন? দেশের রত্নরা যখন ব্রিজভূষণের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন, তখন আপনি সরব হয়েছেন? আসলে নিজের দলের নেতাদের বেলায় সাত খুন মাফ। আর নিজেদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় রাস্তায় নামা সাধারণ পড়ুয়াদের বেলায় কড়া দাওয়াই। প্রথমে জিরো এফআইআর দায়ের। আর তারপর ক্যামেরার সামনে ক্ষমা করে দিলাম বলাটাকে ‘নাটক’ করাই বলে। এসব রাজনৈতিক দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
একথা সত্যি ভারতের রাজনীতিতে ভাষার অবক্ষয় নতুন কিছু নয়। মোদিজি যে মতাদর্শ থেকে উঠে এসেছেন, সেই জনসংঘ কথায় কথায় ইন্দিরা গান্ধীর স্লিভলেস ব্লাউস আর ববকাট চুল নিয়ে কটাক্ষ করত। তবে গত কয়েক দশকে এই ‘ভাষা-সন্ত্রাস’ ভীষণভাবে বেড়েছে। আর এর
শুরুটা বিজেপির আইটি সেলকে দিয়েই। এখন কোনোপক্ষই এতে খামতি রাখছে না। সোনিয়া গান্ধী স্বয়ং মোদিকে
‘মওত কা সওদাগর’ বলেছিলেন। মণিশঙ্কর আইয়ার ‘নীচ লোক’ বলেছেন। তৃণমূল কংগ্রেস থেকে শুরু করে আপ, কিংবা সমাজবাদী পার্টি এমনকি বাম, কেউ বাদ যাচ্ছে না। এখন রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গা দখল করেছে
ব্যক্তিগত আক্রমণ। চলছে বিদ্বেষমূলক মন্তব্য এবং সামাজিক মাধ্যমে বিষাক্ত প্রচার। এমনকি নেতার জাত দেখেও সমালোচনা করতে ছাড়ছে না কেউই। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী যদি রাজনৈতিক শালীনতার ডাক দেন, তাহলে অবশ্যই স্বাগত। কিন্তু সেই আহ্বান কি শুধু বিরোধীদের জন্য প্রযোজ্য? প্রশ্ন সেটাই।
বিরোধী দলগুলিও সেই একই কথা বলেছে? কংগ্রেস নেতা পবন খেরার মন্তব্য, প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় দেশ চাইছে মোদিজি ক্ষমা চান। তিনি সেটা না চেয়ে উলেটে অন্যদের ক্ষমা করলেন। বিরোধীরা স্পষ্টই বলেছে, প্রশ্নফাঁস থেকে বেকারত্বের মতো জ্বলন্ত সমস্যাগুলি নিয়ে দেশের মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। সেই মূল সমস্যাগুলির সমাধানের পথ বাতলানোর দায়ভার নিচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী। উলটে ক্ষমা করে দিলাম বলে আবেগময় রিল করে নাটক ফেঁদেছেন। ককরোচ আন্দোলনের নেতা অভিজিৎ দিপকেও বলেছেন, এই ক্ষমার কথা কি রিলেই থাকবে, নাকি বাস্তবে আপনি কেস প্রত্যাহার করবেন?
প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে ১৫ বছরের ওই কিশোরীর মন্তব্য কখনোই সমর্থনযোগ্য নয়। তার জন্য মেয়েটি, তার পরিবার ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু আসল প্রশ্ন হল, যে চরম হতাশা, ক্ষোভ এবং বঞ্চনা থেকে ওই ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে, রাষ্ট্র কি তার দায় এড়াতে পারে? একজন প্রকৃত রাষ্ট্রনেতার কাজ কি? শুধু ক্যামেরার সামনে আবেগঘন বার্তা দেওয়া নাকি ব্যবস্থার পচন রোধ করা। প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই ভাষার শালীনতা নিয়ে চিন্তিত হন, তবে তাঁর উচিত সবার আগে নিজের দলের নেতা-মন্ত্রী ও আইটি সেলকে সংযত করা। আর যদি তিনি সত্যিই ছাত্রসমাজের প্রতি সংবেদনশীল হন, তবে ক্ষমা করার বার্তা দেওয়ার বদলে প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর হন। কারণ পড়ুয়ারা করুণা বা ক্ষমা চাইছেন না। সেটা সত্যিই তাঁদের প্রয়োজন নেই। তাঁদের প্রয়োজন ন্যায় বিচার।
সত্যি বলতে কি, সুস্থ গণতন্ত্রে মতভেদ থাকবেই। প্রতিবাদ থাকবে, কঠোর সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু আপনি প্রতিবাদ করলেই দেশের শত্রু। সমালোচনা করলেই বিদেশি শক্তির দালাল। সরকারের কাজ নিয়ে প্রশ্ন তুললেই ব্যক্তিগত আক্রমণ—এই ন্যারেটিভটাই বিপজ্জনক। প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসাবে দেখানো হচ্ছে। ব্যক্তিগত আক্রমণকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানিয়ে চলছে উল্লাস। এবং কুরুচিকর ভাষা প্রয়োগকেই স্বাভাবিক হিসাবে দেখানো হচ্ছে। আখেরে এতে গণতন্ত্রেরই ক্ষতি। মনে রাখতে হবে বিরোধীদেরও এ ব্যাপারে সমান দায়িত্ব আছে। তাদেরও মাথায় রাখতে হবে, সমালোচনা হবে নীতিভিত্তিক। ব্যক্তি আক্রমণ নয়, সরকার বা প্রশাসনের কাজের সমালোচনা করুন। প্রধানমমন্ত্রীই হোন বা বিরোধী দলনেতা—মানদণ্ড সবার ক্ষেত্রেই এক হওয়া উচিত।
প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমার বার্তা যদি সত্যিই আন্তরিক হয়, তবে তো এটি শুধুমাত্র একটি ভিডিয়ো বার্তায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিটি স্তরে তার প্রতিফলন দেখা উচিত। কারণ রাজনৈতিক শালীনতা একতরফা হয় না। তা সব পক্ষের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। মনে রাখা দরকার, কাউকে উপদেশ দেওয়া যত সহজ, উপদেশ পালন করা তার চেয়ে অনেক কঠিন। যিনি উপদেশ দিচ্ছেন, তিনি নিজে যদি তা পালন না করেন, তাহলে উপদেশ গ্রহণকারীর কাছে এর কোনো গুরুত্ব থাকে না। নুপূর জে শর্মা, অঙ্কিত জৈনের এক্স হ্যান্ডল ফলো করেন প্রধানমন্ত্রী। এদের ভাষা দেখেছেন। অন্তত এদের আনফলো করে একটা বার্তা তো দিন মোদিজি। তবে তো বুঝতে পারব, পঁচাত্তরে এসে সত্যিই আপনার বোধোদয় হয়েছে। এখন রাতবিরেতে আপনার রিল শুনে মনে হচ্ছে, আপনার উদ্দেশ্য, সমস্যার প্রকৃত সমাধান নয়। সমস্যার অভিমুখ ঘুরিয়ে সমাধানের পথ খোঁজা।