রাজনীতিতে কখনো কখনো বিরোধীদের অভিযোগের চেয়েও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে শাসকের নিজমুখে উচ্চারিত স্বীকারোক্তি। কারণ সেখানে রাজনৈতিক কৌশলের আড়াল কম, বাস্তবতার ছাপ বেশি। সেই কারণেই বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে নিছক আত্মসমালোচনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বরং তা বর্তমান সরকারের কর্মক্ষমতা ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির উপর এক কঠিন প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। বাংলার রাজনীতিতে ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওঠার পথে বিজেপির অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিল ‘তোলাবাজি-বিরোধী’ স্লোগান। দীর্ঘদিন ধরে তারা দাবি করে এসেছে, সিন্ডিকেটরাজ, কাটমানি সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক দাদাগিরির অবসান ঘটানোই তাদের প্রধান লক্ষ্য। বিধানসভা ভোটপ্রচারের ময়দানে সেই প্রতিশ্রুতি বারবারই উচ্চারিত হয়েছে। বাংলার মানুষকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাবে শাসকের চরিত্র এবং শাসনের রকমও। কিন্তু ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েকমাসের মধ্যেই দলের রাজ্য সভাপতির মুখে শোনা গেল এক ভিন্ন সুর। তিনি স্বীকার করলেন, তোলাবাজি বন্ধ হয়নি; পুরানো অপসংস্কৃতিরও অবসান ঘটেনি। এমনকি ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে বিজেপিরই একাংশের মধ্যে অর্থ ও প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এই স্বীকারোক্তির রাজনৈতিক অভিঘাত গভীর। কারণ প্রশ্নটি এখন আর বিরোধীদের অভিযোগের নয়। প্রশ্নটি শাসক দলের আপনার উপলব্ধির। যে-দল বাংলার প্রতিটি রাজনৈতিক ব্যাধির জন্য একদশকেরও বেশিকাল যাবৎ তৃণমূলকে কাঠগড়ায় তুলেছিল, সেই দলেরই রাজ্য সভাপতি আজ কার্যত জানিয়ে দিচ্ছেন, ক্ষমতা বদলালেও রোগের উপশম হয়নি।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—তবে কি বাংলার মানুষকে এমন এক পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, যার ভিতই ছিল দুর্বল? তবে কি ‘পরিবর্তন’ শেষপর্যন্ত কেবল নির্বাচনি প্রচারের স্লোগান হিসাবেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেল? তোলাবাজি কোনো দলবিশেষের ব্যাধি নয়। ক্ষমতাই এর জনক। ক্ষমতার অপব্যবহার থেকেই সৃষ্ট এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি। প্রশাসন দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠতে ব্যর্থ হলে এবং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অন্যায় আর্থিক সুবিধা আদায়ের পথ খোলা থাকলে, ক্ষমতার রং বদলেও অপসংস্কৃতির চরিত্র বদলায় না। বাংলার মানুষ আজ সেই কঠিন সত্যের মুখোমুখি। এই প্রসঙ্গে দলবদলের রাজনীতিও নতুন করে আলোচনায় চলে আসে। সাম্প্রতিককালে বিরোধী শিবির থেকে বহু নেতা-কর্মী বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। যাঁদের বিরুদ্ধে একসময় দুর্নীতি, কাটমানি, সিন্ডিকেট চালানো কিংবা রাজনৈতিক সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলে জনমত গড়া হয়েছিল, তাঁদের অনেককেই আজ নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে ‘স্বাগত’ জানানো হয়েছে। এতে জনমানসে সংশয় তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। গতকাল যাঁরা ছিলেন ‘দুর্নীতির প্রতীক’, তাঁরাই আজ কীভাবে ‘সততার প্রতীক’ হয়ে উঠলেন? রাজনৈতিক পতাকা বদলালেই কি অতীতের সমস্ত কলঙ্ক মুছে যায়? শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যে আরও একটি সতর্ক সংকেত রয়েছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন, ক্ষমতার স্বাদ অনেকের রাজনৈতিক চরিত্র বদলে দিয়েছে। বিরোধী অবস্থানে থেকে নীতির কথা বলা সহজ কিন্তু ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছে সেই নীতিকে অক্ষুণ্ণ রাখা অনেক কঠিন।
ইতিহাস সাক্ষী—আত্মতুষ্টি এবং ক্ষমতার ঔদ্ধত্যই শেষপর্যন্ত বহু শক্তিশালী শাসকের পতনের কারণ হয়েছে। শাসক যখন আত্মসমালোচনার ক্ষমতা হারায়, তখনই সূচনা হয় তার অবক্ষয়ের। বাংলার মানুষ সরকার পরিবর্তন করেছিল কেবল মুখ বদলের জন্য নয়—তাদের প্রত্যাশা ছিল শাসনের ধরন বদলাবে। তারা এমন এক প্রশাসন চেয়েছিল, যেখানে ব্যবসা করতে গেলে রাজনৈতিক সেলামি দিতে হবে না; বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে কোনো সিন্ডিকেটের কাছে মাথা নত করতে হবে না; সরকারি পরিষেবা পেতে গেলে সংকীর্ণ দলীয় পরিচয়ের প্রয়োজন হবে না। কিন্তু যদি শাসক দলের সর্বোচ্চ রাজ্য নেতা নিজেই স্বীকার করেন যে সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি, তবে জনমনে হতাশা জন্ম নেবে—এটাই স্বাভাবিক। রাজনীতিতে আত্মসমালোচনার মূল্য অবশ্যই আছে। কিন্তু আত্মসমালোচনা কখনো সাফল্যের পরিচয় নয়—তা বরং ব্যর্থতার স্বীকৃতি। জনগণ বিজেপিকে ভোট দিয়েছিল তোলাবাজির অস্তিত্ব মেনে নেওয়ার জন্য নয়, তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। ফলে এখন আর সতর্কবার্তা বা ভাষণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ফলপ্রসূ পদক্ষেপ, নিরপেক্ষ প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং দলীয় পরিচয় ঘনিষ্ঠতা নির্বিশেষে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা। অন্যথায় বাংলার মানুষ খুব দ্রুত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে যে ক্ষমতার পালাবদলই ঘটেছে মাত্র, কিন্তু রাজনীতির গুণগত চরিত্র পালটায়নি। তোলাবাজির বোর্ডে শুধু নতুন নাম লেখা হয়েছে। জনমনে এমন বিশ্বাস স্থায়ী হলে সেটিই হবে এই সরকারের সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক ব্যর্থতা—এবং ভোটারদের প্রতি মারাত্মক বিশ্বাসভঙ্গ।