সায়ন মজুমদার: Dictatorships foster oppression, dictatorships foster servitude, dictatorships foster cruelty; more abominable is the fact that they foster idiocy….
সায়ন মজুমদার: Dictatorships foster oppression, dictatorships foster servitude, dictatorships foster cruelty; more abominable is the fact that they foster idiocy….
উক্তিটি প্রখ্যাত আর্জেন্টাইন লেখক জর্জ লুইস বর্গেসের। বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায়, স্বৈরাচার নিপীড়ন বাড়ায়, স্বৈরাচার দাসত্ব বাড়ায়, স্বৈরাচার নিষ্ঠুরতা বাড়ায়; তবে এর চেয়েও জঘন্য সত্য হল, এটি মূর্খতা বাড়ায়।
কিছুদিন ধরে যন্তর মন্তরে যা চলেছিল, তা এক কথায় অভূতপূর্ব। শাসকের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস দেখিয়েছে কয়েক হাজার ছাত্র-যুব। বয়স কতই বা তাঁদের, ১৮,১৯ বা ২৪-২৫। আসলে ওই বয়সটাই যে দুরন্ত, দস্যি। নিয়ম মানে না, তথাকথিত সমাজের শৃঙ্খলা মানে না, চোখ রাঙানিকে ভয় পায় না। জোর করে কিছু চাপিয়ে দিলেই প্রশ্ন করে, বিরোধিতা করে। প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক, যতই তাঁর হাতে রাষ্ট্রীয় সব ক্ষমতা থাক, ওই বয়সটা ভয় পায় না। তাই তো বার বার যেখানে যেখানে স্বৈরাচার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, সেখানে সেখানে একনায়ককে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে আঠারো। ক্ষুদিরাম, ভগত সিং, কানাইলাল দত্ত বা চাপেকর ভ্রাতৃত্রয়, একাত্তরের নকশাল আন্দোলন বা হালফিলের নেপাল-শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশ। রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে ছাত্র-যুবর লড়াইয়ের ইতিহাস তো আজকের নয়।
গণতন্ত্রের চারটি স্তম্ভ, আইন, প্রশাসন, বিচার ও গণমাধ্যম। যে কোনো শাসকের স্বৈরাচারী হওয়ার পথে প্রথম কাজই হল এই চার স্তম্ভে ফাটল ধরিয়ে দেওয়া। আর তাতে সবচেয়ে সহজ কাজ হল যে চতুর্থ স্তম্ভকে গুঁড়িয়ে দেওয়া, তা কে না জানে। হিটলারের প্রচারমন্ত্রী গোয়েবল বলতেন, একটি মিথ্যাকে বার বার জোরালোভাবে বলে যাও, যাতে একটা সময় পর মানুষ মিথ্যাটাকেই সত্যি ভেবে বসে। আর মানুষের মতামত তৈরিতে মিডিয়া (এবং বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়া) যে ব্রহ্মাস্ত্র, তা আর আলাদা ভাবে বলে দিতে হয় না।
বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসকের এই যে অশ্বমেধের ঘোড়া, তা কিন্তু এই গোয়েবলীয় নীতিকেই বেদবাক্যের মতো মেনে এগিয়ে চলেছে। গত প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে। পুঁজিবাদী সরকার ক্ষমতায় এসে প্রথম কাজই করল, দেশের গণমাধ্যমের ভিত নড়িয়ে দেওয়া। এমনিতে সবসময় রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সরকারি গণমাধ্যম ক্ষমতাসীন দলের স্তাবকতা করেই থাকে। কিন্তু ২০১৪ পরবর্তী সময়ে আমরা দেখলাম, দেশের বেসরকারি গণমাধ্যমগুলির রাশ আস্তে আস্তে চলে গেল গুটিকয় পুঁজিপতির হাতে, যাঁদের সঙ্গে শাসকের দোস্তি সুপরিচিত।
মালিকানা বদল হতেই বদলে গেল হাউজ পলিসি। সাংবাদিকরা কেউ মেনে নিলেন, কেউ মানিয়ে নিলেন। যাঁরা মাথা নোয়ালেন না, তাঁদের দেখিয়ে দেওয়া হল এগজিট গেট। দেশের বড়ো বড়ো কোনো কোনো টিভি চ্যানেলে শুরু হল সার্কাস। কোন অ্যাংকর কত উচ্চস্বরে কথা বলতে পারেন, কত হাত-পা ছুড়তে পারেন, কত নাটুকেপনা করতে পারেন, তার এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। আর শুরু হল অর্ধ-সত্য, অসত্যকে দুমড়ে-মুচড়ে ‘সত্যি’ হিসাবে পরিবেশন করার খেলা। সে এক ভয়ানক খেল। সাংবাদিক প্রশ্ন করা ছেড়ে নোটে চিপ খুঁজলেন, ‘দেশনায়ক’ কতক্ষণ ঘুমান আর তাঁর এনার্জির উৎস কী তা বোঝার চেষ্টা করলেন, কখনো আবার অভিনেতাই সাংবাদিক সেজে জানতে চাইলেন, নেতাপ্রবর আম খেতে পছন্দ করেন কি না।
সেই সঙ্গে সঙ্গে খুব সুচারুভাবে শুরু হয়ে গেল ভাগাভাগির খেলা। দেশ ও সরকার এক না, সরকারকে প্রশ্ন করা মানে দেশের বিরুদ্ধাচারণ নয়, এই ধারণাটাই মুছে দেওয়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়ে গেল। প্রশ্ন করলেই ডিপস্টেট, সোরোস, পাকিস্তান-চীন, টুকরে টুকরে গ্যাং আরও কত কিছু থিয়োরির অবতারণা শুরু করে দিল কোনো কোনো চ্যানেল। প্রাইম টাইমে চ্যানেলে চ্যানেলে কলতলার ঝগড়া। কোনো কোনো অ্যাংকার হয়ে গেলেন শাসকদলের প্রতিনিধি। দেশবাসীর মধ্যে যাচাই করে দেখার, ডবল চেক করার প্রবণতা খুবই কম। ফলে এই প্রথমসারির কিছু সাংবাদিক যা দেখালেন, সিংহভাগ মানুষ তাই মেনে নিলেন।
এই ভয়ংকর খেলায় মিডিয়ার সঙ্গী হল সোশ্যাল মিডিয়া। আইটি সেলের তরুণ তুর্কিরা মন গড়া নানা থিয়োরির সঙ্গে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা, কিছুটা অর্ধসত্যের এমন এক ককটেল তৈরি করে আম আদমিকে গেলালেন, যে সাম্প্রদায়িকতা, সহনাগরিকে ঘৃণার নেশায় বুঁদ হয়ে গেলেন অনেকে। হু হু করে নামল ভারতের প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স। মাথারা বুঝলেন না, এই করে আসলে জনমানসে সংবাদমাধ্যমের প্রতি কত বড়ো বিরূপ প্রতিচ্ছবি তাঁরা তৈরি করে দিচ্ছেন!
স্বৈরাচারী যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়তে কেউ না কেউ থাকেই। আপস যাঁরা করেননি, কোনো কোনো বড়ো মিডিয়া হাউস থেকে বেরিয়ে এলেন তাঁরা। ক্রমে ক্রমে তৈরি হল অল্টারনেটিভ মিডিয়া। স্বাধীন গণমাধ্যম প্রশ্ন করা শুরু করল, সরকারের সমালোচনাও হল।
স্বৈরতন্ত্রের বৈশিষ্ট্যই হল, বিরুদ্ধ স্বর সে পছন্দ করে না। তার স্বভাবই হল ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও। কাজে লাগিয়ে দেওয়া হল ইডি, ইনকাম ট্যাক্স-এর মতো রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শক্তিগুলিকে। শুরু হল সাংবাদিক-হত্যা। খুন হলেন গৌরী লংকেশ, সুজাত বুখারি, মুকেশ চন্দ্রকর, সন্দীপ কোঠারি আরও কত জন। এদের ‘দোষ’ কী? তাঁরা মাথা নত করেননি। ক্ষমতাবানকে প্রশ্ন করেছেন, দুর্নীতি সামনে এনেছেন। এছাড়া, খবর করার জন্য সাংবাদিকের হাজতবাস তো জলভাত হয়ে গিয়েছে।
তবে, মিথ্যা, ভয়ের আস্তরণটা সমাজে খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিরুদ্ধস্বর একটা সময় ঠিক মাথাচাড়া দিয়ে ওঠেই। শুরু হয় পালটা প্রতিরোধ। আর এখানেই সবার প্রথম আঘাতটা নেমে আসে স্বৈরাচারের তল্পিবাহক গণমাধ্যমগুলির উপর। যেকোনো সরকারবিরোধী আন্দোলনকে ‘দেশবিরোধী’ লেবেলিং করার জন্য প্রথমসারির কোনো কোনো সংবাদমাধ্যম জনতার রোষানলে পড়েছিলই। কৃষক আন্দোলন, এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে মাঠে নেমে তা টের পেতে শুরু করলেন রিপোর্টাররা। সাংবাদিকদের প্রতি এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে গেল ‘ককরোচ’ আন্দোলনে। যন্তর মন্তরে কী দেখলাম আমরা, প্রথমসারির চ্যানেলের সাংবাদিকরা যখনই ঘটনাস্থলে গেলেন তখনই তাঁদের দিকে ধেয়ে এল কটূক্তি। কোনো কোনো সাংবাদিককে ধাক্কা দেওয়াও হল। আর ২৪ জুলাই ধর্মতলায় সেই পালটা প্রতিরোধ আরও কয়েকগুণ বেড়ে গেল। পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে আক্রান্ত হলেন সাংবাদিকরা। মারধর, জামা ছেড়া, গালিগালাজ, বুম কেড়ে নেওয়া, ক্যামেরা ভেঙে দেওয়া— বাকি ছিল না প্রায় কিছুই।
কেউ বলবেন, বেশ করেছে। কেন জনতার আন্দোলনকে ঘিরে ক্রমাগত হেয় করা হবে, কেন তাঁদের ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’, ‘পাকিস্তানি এজেন্ট’ বলে দেগে দেবে সংবাদমাধ্যম? জনআক্রোশ বলে ডিম-থেরাপির মতো মব-জাস্টিসকে সমর্থন করে গলা ফাটাবেন একদল সাংবাদিক? এসব করলে তো মার খেতেই হবে।
বেশ। আন্দোলন-বিরোধিতা তো ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে। বিপক্ষ বা বিরোধীদের পেশিশক্তির মাধ্যমে নিঃশেষ তো করে দেয় স্বৈরাচারীরা। যদি ধরে নিই, সংবাদমাধ্যম আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধাচার করেছে, সেই হিসাবে তাঁরা বিরোধী। তাদের মত আপনার মতের সঙ্গে মিলছে না। আপনি কী করলেন? যেই তাকে একা পেলেন, অমনি দেখিয়ে দিলেন পেশিশক্তি কাকে বলে! এই বিরোধীকে মারার প্রবণতাটা ফ্যাসিস্টদের বৈশিষ্ট্য। লড়াইটা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধেই তো ছিল। ফ্যাসিবাদকে রুখতে নেমে আন্দোলনকারীদের মধ্যেই সেই স্বৈরাচারের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না তো?