Bartaman Logo
৩ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাজনৈতিক দলের গণ্ডি পেরিয়ে এক নয়া পরিসর

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) তরফে শুরু হওয়া যন্তর মন্তরের আন্দোলন এমন এক শিক্ষা দিয়েছে যা ভারতের ৭৯ বছরের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলি শেখেনি।

রাজনৈতিক দলের গণ্ডি পেরিয়ে এক নয়া পরিসর
  • ৩ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) তরফে শুরু হওয়া যন্তর মন্তরের আন্দোলন এমন এক শিক্ষা দিয়েছে যা ভারতের ৭৯ বছরের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে রাজনৈতিক দলগুলি শেখেনি। এই ধরনের ‘শিক্ষার’ প্রথম আভাস অবশ্য এবছরের গোড়াতেই পাওয়া গিয়েছিল, তবে সে-কথা পরে বলা যাবে। 

Advertisement

ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে যে, রাজনৈতিক দলগুলি সংগ্রাম ও নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে পরিবর্তন আনতে পারে। সেই শিক্ষা আজও সত্য। কংগ্রেসের নেতৃত্বেই স্বাধীনতা আন্দোলন সফল হয়েছিল। একের পর এক নির্বাচনে জিতে কংগ্রেস ভারতীয় গণতন্ত্রের বেশকিছু স্তম্ভ নির্মাণ করেছিল—যেমন সাংবিধানিক শাসন, ধর্মনিরপেক্ষতা, সংরক্ষণ ব্যবস্থা, ভাষভিত্তিক রাজ্যগঠন, স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সম্পদের বিকেন্দ্রীকরণ প্রভৃতি। একাধিক দ্রাবিড় দলের মতো আঞ্চলিক পার্টিগুলি বিভিন্ন রাজ্যে নির্বাচনে জিতে রাজ্যের ভাষা, রাজ্যের অধিকার, সাংস্কৃতিক পরিচিতি এবং ভূমিসংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছিল। ১৯৭৫ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে সংগঠিত আন্দোলন কেন্দ্রীয় সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়েছিল এবং স্বাধীনতার সুরক্ষায় চালু করেছিল সাংবিধানিক বিধান। ১৯৭৮ সালে সারা অসম ছাত্র ইউনিয়ন (এএএসইউ) বা আসুর আন্দোলন সীমান্ত পেরিয়ে অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আইনি পদক্ষেপ করতে বাধ্য করেছিল। বস্তুত, জোর দিয়ে বলা যায় যে, ভারতের শাসনব্যবস্থায় সমস্ত বড়ো ধরনের পরিবর্তনই রাজনৈতিক দলগুলি সংগ্রাম ও নির্বাচনের মাধ্যমেই ঘটিয়েছিল। 
অস্বাভাবিক সব যোগ্যতা 
সিজেপি প্রথাগত অর্থে কোনো রাজনৈতিক দল নয়। সিজেপির জন্ম অভিজিৎ দিপকে নামে এক যুবকের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া থেকে। স্পষ্টতই, আপাতদৃষ্টিতে উসকানিমূলক এক মন্তব্যে দিপকে এবং তাঁর কয়েকজন বন্ধু গভীরভাবে আহত হন। প্রতিবাদী দিপকে এই ব্যাপারে একটি মঞ্চ গড়ে তোলেন এবং প্রশ্ন রাখেন, ‘‘সব আরশোলা (ককরোচ) যদি একজোট হয়, তবে কেমন হবে?’’ তিনি ঘোষণা করেন যে, যে-কেউ এই মঞ্চে যোগ দিতে পারেন—যদি তিনি ‘বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকেন এবং পেশাদার ভঙ্গিতে ক্ষোভ উগরে দেওয়ার বা অনর্গল কথা বলার ক্ষমতা রাখেন।’ দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার্থী ও গবেষকসহ অনেকেই এই অদ্ভুত সব যোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ! আবার এমন অনেকেই আছেন যাঁরা চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও সারাক্ষণ অনলাইনে থাকেন এবং পেশাদার ভঙ্গিতে ক্ষোভ প্রকাশে দক্ষ। এঁদের মধ্যে রয়েছেন শিল্পী, শিক্ষক, চিকিৎসক, নার্স, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, অন্যান্য পেশাজীবী এবং জুনিয়র সরকারি কর্মচারীদের মতো সম্মাননীয় ব্যক্তিরা। 
এই মঞ্চের রয়েছেন একজন প্রতিষ্ঠাতা-নেতা, কয়েকজন মুখপাত্র, অদম্য মনোবল। এর বাইরে আর তেমন কিছু নেই। যতদূর জানা যায়, এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সদস্যপদ, রেজিস্ট্রেশন, ঘোষিত নীতিমালা বা রাজনৈতিক দলের অন্যকোনো বৈশিষ্ট্য নেই। তা সত্ত্বেও, মাত্র ৩৫ দিনের এক আন্দোলনের মাধ্যমে সিজেপি বিরাট সাফল্য পেয়েছে: মন্ত্রিসভার দুজন সদস্যকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছে। এক মন্ত্রীর পদত্যাগ নিশ্চিত করেছে তারা। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে যত মামলা দায়ের করা হয়েছে, সেসব প্রত্যাহারেও বাধ্য করেছে সরকারকে। এই ব্যাপারে সরকারের কাছ থেকে লিখিত প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে সিজেপি। এটি নিঃসন্দেহে এক অভূতপূর্ব ঘটনা।  
নতুন এক প্রবণতার আভাস 
আগেই যেমনটি বলেছি, প্রথাগত রাজনৈতিক দলের গণ্ডির বাইরে এমন এক পরিসরের প্রথম আভাস পাওয়া গিয়েছিল তামিলনাড়ুতে। জোসেফ বিজয় ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি রাজনৈতিক দল (তামিলাগা ভেট্রি কাজাগাম বা টিভিকে) গঠনের ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু সেটি কোনো প্রথাগত দলের ‘রূপ’ নেয়নি। সেটি বরং সবদিক থেকেই ছিল একটি অসংগঠিত ‘ফ্যানস অ্যাসোসিয়েশন’ বা ভক্তদের সংগঠন মাত্র। 
মূলত, ওই ভক্তদের সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারাই টিভিকের নানা পদের দায়িত্ব নেন। টিভিকের প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রথাগত রাজনৈতিক রীতিনীতি বা বিবেচ্য বিষয়গুলিকে—যেমন জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ, পারিবারিক ঐতিহ্য বা বিত্তবৈভব—পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়। মোট ২৩৪ জন প্রার্থীর মধ্যে দুশোজনেরও বেশি প্রার্থীর নিজস্ব কোনো অর্থবল ছিল না বা তাঁরা নির্বাচনে কোনো অর্থ ব্যয় করেননি। অধিকাংশ নির্বাচনি এলাকায় টিভিক প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারের নামগন্ধও ছিল না। অনেক প্রার্থীই সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকার মানুষের কাছে ছিলেন নিতান্তই অপরিচিত মুখ। এমনকি তাঁদের বুথ এজেন্ট, পোলিং এজেন্ট বা ভোট গণনা এজেন্ট সংখ্যাও ছিল নগণ্য। বিজয় নিজে হাতেগোনা কয়েকটি রোড শো ও জনসভায় অংশ নিয়েছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, ভোটারদের কাছে কেবল ‘বিজয়’ এবং দলের প্রতীক ‘হুইসেলই’ (বাঁশি) ছিল মুখ্য বিষয়। এই পুরো প্রক্রিয়ায় জাদুকরি ভূমিকা পালন করেছিল সোশ্যাল মিডিয়া (ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউব)। বিজয়কে সব জায়গায় দেখা যাচ্ছিল এবং প্রতিটি ঘরে তাঁর কণ্ঠস্বর পৌঁছে গিয়েছিল। ডিএমকে এবং এআইএডিএমকের মতো দুটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও নির্বাচনি শক্তির বিরুদ্ধে লড়ে টিভিকে ১০৮টি আসনে জয়লাভ করে এবং মোট ভোটের ৩৫ শতাংশ নিজেদের দখলে নেয়। 
কোনো রাজনৈতিক দল, নেতা, সাংবাদিক কিংবা জনমত সমীক্ষক—কেউই টিভিকের এই জয়ের আঁচ পায়নি এবং পূর্বাভাস দিতে পারেনি। ভোটের ফলাফল যখন আসতে শুরু করে, তখন জাঁদরেল রাজনৈতিক দলগুলি যেমন বিস্মিত হয়েছিল, ঠিক তেমনই টিভিকের মধ্যেও দেখা দিয়েছিল সমান বিস্ময়। 
তামিলনাড়ুর এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের নেপথ্যে ছিলেন সাধারণ নাগরিকরা, যাঁরা প্রথাগত রাজনৈতিক দলের গণ্ডির বাইরের সেই পরিসরটিকেই নিজেদের কার্যক্রমের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তামিলনাড়ুর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে এমনটা ভাবা মোটেও অসম্ভব নয় যে, পরিবর্তন আনতে পারেন এমন সব নাগরিক—যাঁরা হয়তো একে অপরকে চেনেন না, পরস্পরের সঙ্গে কথা বলেন না কিংবা কোনো সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন—কিন্তু তাঁরা একই ধাঁচে ভোট দিয়ে সরকার গঠনের মতো যথেষ্ট সংখ্যক প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারেন। 
রাজনৈতিক দলগুলির সামনে চ্যালেঞ্জ 
তামিলনাড়ুর নির্বাচনের ফলাফল এবং যন্তর মন্তরের আন্দোলনের পরিণতির বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলির গভীরভাবে পর্যালোচনা করা উচিত। সুসংগঠিত রাজনৈতিক দলগুলি হয়তো বিলুপ্ত হবে না, কিন্তু ‘হাইকমান্ড’, কার্যনির্বাহী কমিটি, সাধারণ পরিষদ, মহাসভা, দলীয় সদস্যপদ এবং দলীয় নির্বাচনের মতো প্রথাগত ধারণাগুলি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়তে পারে। একসময় হয়তো হারিয়েই যাবে—‘ভোট ব্যাংক’-এর মতো আপত্তিকর শব্দটি। 
মোবাইল ফোন, টুইটার (এখন ‘এক্স’), ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রামের কল্যাণে নাগরিকরা তাদের নীরবতা ভেঙেছেন। এখন মনে হচ্ছে—তাঁরা ভয়কেও জয় করেছেন। খাকি বা নীল উর্দি, পুলিশ, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, বন্দুক কিংবা গ্রেপ্তার বা আটকের ভয় তরুণদের আর দমাতে পারে না। বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকরাও হয়তো তাঁদের পথ অনুসরণ করবেন। আমি চাই, রাজনৈতিক দলগুলির গণ্ডির বাইরে এক বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসর গড়ে উঠুক। 
‘জেন-জি’ (Gen Z) এবং অন্যান্য আন্দোলনকারীদের সামনে রয়েছে বেশকিছু কঠিন চ্যালেঞ্জ: 
• প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে মধ্যযুগীয় মানসিকতা ও কূপমণ্ডূকতা থেকে বের করে আনতে হবে।
•  ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশবিক শক্তি, ‘মোরাল পুলিশিং’ এবং বজরং দলের মতো ‘বলপ্রয়োগকারী’ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাদের রুখে দাঁড়াতে হবে।
•  তাদের লড়াই করতে হবে আইনের জোরে চাপিয়ে দেওয়া নৈতিকতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে।
•  স্থানীয় রাজস্ব ও রেজিস্ট্রেশন দপ্তর, হাসপাতাল, রেশন দোকান এবং স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্থাগুলির মতো ক্ষেত্রগুলিতে যে দমনমূলক দুর্নীতি চলে, ‘জেন-জি’-কে তা রুখতে হবে। 
যন্তর মন্তরের ঘটনার পর, ইতিবাচক পরিবর্তনের যেকোনো কিছুই এখন সম্ভব বলে মনে হচ্ছে। 
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ