জন্মের পর থেকে বারবার প্রশ্নফাঁস, ফলাফল জালিয়াতি, বড়ো ধরনের প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত বিভ্রাটের গুরুতর অভিযোগ শোনা গিয়েছে এতদিন। এখন আবার কোটি কোটি টাকা আর্থিক গোলমালের অভিযোগের খবরও বাতাসে ভাসছে! প্রশ্ন উঠেছে, এত কেলেঙ্কারির পরেও কেন ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি বা এনটিএ-কে বাঁচিয়ে রাখা হবে? ২০১৭ সালে তৈরি হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ২৮২টি পরীক্ষা পরিচালনা করেছে এনটিএ। এর মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাহাড়প্রমাণ। সর্বশেষ অভিযোগ, চলতি বছরের নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের ঘটনা। গত ন’বছর এনটিএ-এর যাবতীয় ‘কুকর্ম’ ঢাকা গেলেও এবার জেন-জি-র হাত ধরে তৈরি হওয়া ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির আন্দোলনের জেরে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছে মোদি সরকার। রীতিমতো নতিস্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। প্রশ্নফাঁসে জড়িতদের শাস্তি আরও কঠোর করতে আইন সংশোধন, ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে বিচার, দু’তিন মাসে বিচারের নিষ্পত্তি, রাতবিরেতে সোশ্যাল মিডিয়ায় এসে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিয়ো বার্তা—এসবই দেখা গিয়েছে নতুন শক্তির বজ্রনির্ঘোষের জেরে। দাদা-দিদিদের পদাঙ্ক অনুকরণ করে যখন বিভিন্ন রাজ্যে ‘জেন-আলফা’-রা পথে নেমে সরকারকে বার্তা দিতে শুরু করেছে, তখনই এনটিএ-র আরও এক কীর্তির যেন পরদাফাঁস হল! এই কেলেঙ্কারির ঘটনাটি সামনে এসেছে খোদ সংসদের মধ্যে আলোচনায়। সেখানেই দেখা গিয়েছে, ভিন্ন বছরে একই প্রশ্নের জবাবে যে তথ্য পেশ করেছেন শিক্ষা দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী তাতে অন্তত ৫৪ কোটি টাকার গরমিল উঠে আসছে। প্রথমবারের প্রশ্নটি ছিল ২০২৪-এর ৩১ জুলাই। দ্বিতীয়বারেরটি গত ২২ জুলাই। একই প্রশ্নে দু’বার এনটিএ-র দু’রকম আয়-ব্যয় ও লাভের অঙ্ক জানিয়েছেন রাষ্ট্রমন্ত্রী! সংসদে দেওয়া এই ‘অদ্ভুত তথ্যের’ বিষয়টি সামনে আসার অবশ্য নোটিস ধরানো হয়েছে।
কিন্তু বছর বছর নানা অঘটন এবং তাকে ধামাচাপা দিতে মোদি সরকার যে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালাচ্ছে, তাতে দু’টি প্রশ্ন খুব জোরালোভাবে সামনে এসেছে। ১) প্রশ্নফাঁস আটকাতে নতুন আইন এনে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টে বিচার, শাস্তি ও জরিমানা দ্বিগুণ করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রশ্নফাঁস বা বিভ্রাট হবে ধরে নিয়ে কি পরবর্তী ধাপে কঠোর ব্যবস্থার বিধান রাখা হল আইনে? কিন্তু প্রশ্নফাঁস আটকাতে সরকার নিজে কী পদক্ষেপ করবে, তা নিয়ে একটি শব্দও নেই নতুন আইনে। বরং নতুন আইন লাগু হওয়ার পরও সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে যথারীতি। কারণ, ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের প্রথম শুনানিতেই অনুপস্থিত ছিলেন সিবিআই-এর আইনজীবী। ২) চলতি পরিস্থিতি থেকে দৃষ্টি ঘোরানোর জন্য এনটিএ-এর ৪৭ জন আধিকারিককে বরখাস্ত করা হয়েছে। নতুন সুপারিশে ৬ সদস্যের শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু অপারগ, অযোগ্য, অকর্মণ্য ও দুর্নীতিতে জড়িত বলে যে অভিযোগ উঠেছে সেই এনটিএ-কে কেন দায়িত্বে রেখে দেওয়া হবে? সংগত সেই প্রশ্নও উঠেছে।
দেশের প্রায় সব বিরোধী দল ও সিজেপি সহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের দাবি, এনটিএ তুলে দেওয়া হোক। ফিরিয়ে আনা হোক আগেকার রাজ্যওয়ারি ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষা ব্যবস্থা। সেটা না হলে নিদেনপক্ষে ইউপিএসসি বা সিবিএসই-র মতো সংস্থার হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়া হোক। এক্ষেত্রেও অবশ্য ভিন্ন মতও আছে। কেন্দ্র অবশ্য ‘অভিন্ন মান’ বজায় রাখার অজুহাতে ‘কমন এনট্রান্স টেস্ট’-এর তত্ত্বও আওড়ে চলেছে! আর পদে পদে ব্যর্থতার নজির রাখছে! আসলে গত বেশ কয়েক বছর ধরেই বিভিন্ন রাজ্য থেকে পরীক্ষায় জালিয়াতির খবর হচ্ছিল। এই সুযোগে কেন্দ্র প্রায় সব বড়ো পরীক্ষা কেন্দ্রীয়ভাবে নিতে তৈরি করে এনটিএ। ফলে গোটা দেশের জালিয়াতচক্রগুলি হয়তো এনটিএকেই পাখির চোখ করেছে। এই সংস্থার বিশাল কর্মকাণ্ডের পরিকাঠামো বলতে কয়েকজন স্থায়ী কর্মী, বেশিরভাগই চুক্তিভিত্তিক ও বাইরের সংস্থায় নিযুক্ত কর্মী। অর্থাৎ এনটিএ যেন ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারের মতো! বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, প্রায় ২৫ লক্ষ ছাত্রছাত্রীকে নিয়ে আয়োজিত নিট পরীক্ষা ব্যবস্থায় অতি-কেন্দ্রিকতাই বারবার বিপর্যয়ের মূল কারণ। বিপর্যয়ের জেরে একসঙ্গে এত পড়ুয়াকে ভুগতে হওয়ায় এর অভিঘাতও বেশি হচ্ছে। তাছাড়া, এত বড়ো পরীক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বলে এর প্রশ্নের বাজারদরও বেশি। এসব জেনে-বুঝেও মোদিবাহিনী সেই এনটিএ-কে আঁকড়ে ধরে রাখায় অন্য সন্দেহও দানা বাঁধছে। আর তাতে ইন্ধন জোগাচ্ছে সংসদে পেশ করা মন্ত্রীর দু’রকম আয়-ব্যয়ের তথ্য, যেখানে গোলমাল কোটি কোটি টাকার। কেন্দ্রীয় সরকারের তৈরি করা এনটিএ-নামক স্বশাসিত সংস্থার পাহাড় প্রমাণ ব্যর্থতা ও আর্থিক গরমিলের দায় তাই পরোক্ষে বর্তাচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারের উপরই। তাকে ঘিরে এই বিভ্রান্তি, বিতর্ক এবং লজ্জা কী করে সামলায় মোদি সরকার—সেটাই দেখার। এক্ষেত্রে গা-জোয়ারি করে অতি- কেন্দ্রিকতার ফল ভুগতে হচ্ছে সরকারকে।