ভগবানের বিশেষ বিধানে বিশ্বাস করা অথবা নিজেকে ভগবানের হাতে যন্ত্ররূপে বোধ করা, অনেকে ধৃষ্টতা বলে মনে করেন। কিন্তু আমি তো দেখি প্রত্যেক মানুষেরই জন্য ভগবান বিশেষ বিধাতা হয়েছেন—চাষীর হাত দিয়ে কোদাল ভগবানই ধরেছেন, শিশুর মুখে ফোটে তাঁরই কলধ্বনি।
যে জাহাজডুবি থেকে আমি রক্ষা পেয়েছি কিন্তু আর সকলে তলিয়ে গেছে, কেবল তাই যে বিশেষ ভাগবত বিধানের পরিচয় এমন নয়। যে বিধানে আর সকলকে বাঁচিয়ে দিয়েছে কিন্তু আমার রক্ষার শেষ আশ্রয়টুকু পর্যন্ত কেড়ে নিয়েছে, আমাকে অকূল পারাবারে ডুবিয়ে দিয়েছে তাও ভগবানের বিশেষ বিধান। বিজয়ের আনন্দ কখন কখন দ্বন্দ্বের ও কষ্ট-ভোগের আকর্ষণ অপেক্ষা অল্পতর হয়ে থাকে, তবুও বিক্রমী মানবাত্মার লক্ষ্য হবে দুঃখের পসরা নয়, বিজয়েরই বৈজয়ন্তী। ঊর্দ্ধমুখী নয় যে সব জীব তারা ভগবানের ব্যর্থ সৃষ্টি—তবে তারা প্রকৃতির তৃপ্তিসাধন করে বটে। প্রকৃতি তাদেরই বংশ বৃদ্ধি করে থাকে, কারণ তারাই তার স্থায়িতা দৃঢ় করে, তার সাম্রাজ্যের আয়ু বাড়িয়ে দেয়। যারা দরিদ্র অজ্ঞান হীনবংশ-জাত কুশিক্ষায় বর্দ্ধিত তারা প্রাকৃত-জন নয়, প্রাকৃত-জন হল তারা যারা ক্ষুদ্রতা নিয়ে, একটা মোটামুটি মনুষ্যতা নিয়ে সন্তুষ্ট। মানুষকে সাহায্য কর, কিন্তু তাদের হীন-বীর্য্য করো না। মানুষকে পথ দেখাও, শিক্ষা দাও, কিন্তু দেখো তাদের কর্মপ্রবর্তনার সামর্থ্য, তাদের স্বকীয়তা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে। সকলকে তোমার নিজের মধ্যে তুলে নাও, কিন্তু পরিবর্তে দাও তাদের প্রত্যেকের আপন আপন পূর্ণ দেবত্ব। এ কাজ যিনি করতে পারেন তিনিই হলেন দিশারী, তিনিই গুরু।
ভগবান জগৎকে একটা যুদ্ধক্ষেত্ররূপে তৈরী করেছেন, প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রচণ্ড আস্ফোটে আর বিপুল দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষের আরাবে তাকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। ভগবানের শান্তিকে তুমি গোপনে আত্মসাৎ করতে চাও, অথচ তার জন্যে তিনি যে মূল্য নির্দ্ধারণ করে রেখেছেন তা দিতে চাও না? দৃশ্যতঃ নিখুঁত যে সাফল্য তাকে বিশ্বাস করো না। কিন্তু সাফল্য লাভ করেও যদি দেখতে পাও যে অনেক কিছু করবার এখনও বাকী রয়েছে তবে সানন্দে তা স্বীকার করো আর এগিয়ে চল। সত্যকার নিখুঁত সিদ্ধি-লাভ সুদীর্ঘ প্রয়াসসাপেক্ষ। সাময়িক একটা অবস্থাকে লক্ষ্য বলে ভুল করা অথবা মাঝ-পথের বিশ্রাম স্থানে অতিরিক্ত বিলম্ব করা—প্রাণশক্তিকে এর মত নিস্তেজ করে ফেলতে পারে এমন প্রমাদ আর নাই। যেখানে দেখবে রয়েছে মহৎ পরিণাম সেখানেই জানবে নিশ্চয় রয়েছে মহান আরম্ভ, যেখানে বিকট মর্ম্মন্তুদ ধ্বংস দেখে তোমার মন বিহ্বল, সেখানে তাকে এই সান্ত্বনা দিও যে এক বৃহৎ এক মহান সৃষ্টি আসন্ন। ভগবান যে কেবল ক্ষীণ স্তিমিত মর্মবাণীর মধ্যে তা নয়, তিনি রয়েছেন আবার আগুনের মধ্যে, ঝঞ্চার মধ্যে।
শ্রীঅরবিন্দের ‘চিন্তা-কণা দৃষ্টি-নিমেষ’ থেকে



