Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

ক্লান্ত মনের যত্ন

তেমন কিছুই কাজ করতে হয়নি সারাদিন! তবু দরকারি কাজটুকু সারতে ইচ্ছা করছে না। দিনভর মনখারাপ, ‘ভাল্লাগছে না’ অসুখ জ্বালিয়ে মারছে। সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকে আবার একটু একটু গা-হাত-পা ব্যথা।

ক্লান্ত মনের যত্ন
  • ১৭ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

আপনি ক্লান্ত। কিছুই ভালো লাগছে না। এ ক্লান্তি শরীরের না মনের? কী করে চিনবেন? ক্লান্তি থেকে বেরনোর পথই বা কী?

Advertisement

তেমন কিছুই কাজ করতে হয়নি সারাদিন! তবু দরকারি কাজটুকু সারতে ইচ্ছা করছে না। দিনভর মনখারাপ, ‘ভাল্লাগছে না’ অসুখ জ্বালিয়ে মারছে। সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকে আবার একটু একটু গা-হাত-পা ব্যথা। এর আগে একটানা অফিস সেরে, ফাইনাল রিপোর্ট সাবমিট করে, পড়িমড়ি দৌড়ে ফ্লাইট বা ট্রেন ধরে কত বেড়াতে গিয়েছেন! এক ঘুমে শরীরের ক্লান্তি ভ্যানিশ হয়েছে। কিন্তু ইদানীং একটু খাটাখাটনির পরেই হাঁপিয়ে যাচ্ছেন। সারা সপ্তাহের শ্রম ভুলতে স্যালোঁয় গিয়ে একটা ভালো মাসাজ স্পা করেন অনেকে। মনখারাপ, উদ্বেগ, অবসাদ লাঘব করার জন্যও আধুনিক স্যালোঁয় নানা থেরাপি থাকে। কারও আবার অত বিলাসিতা করার সুযোগ থাকে না। ঘুম, নিজের মতো করে বিশ্রাম ও টুকটাক ব্যায়ামেই ক্লান্তি কাটাতে হয়। মন ভালো রাখার জন্য হাতের কাছে তেমন কোনও রেডিমেড ব্যবস্থা থাকে না অনেকের কাছেই। কী করবেন তাঁরা? মনের হাত ধরে শরীরেও আধিব্যধি থাবা বসায়। তাই নিজের ক্লান্তি, গ্লানি এগুলোকে আলাদা করে চিনতে শেখা খুব জরুরি, কোথাকার ক্লান্তি কোথায় গিয়ে গড়াচ্ছে তা না বুঝতে পারলে নিজেকে ফিট রাখা মুশকিল। বিশেষ করে আধুনিক ছুটোছুটিতে যেখানে ‘কর্মবিরতি’ নামের স্টেশনটি অনেক পেশাতেই হাতে গোনা একটি দিনের জন্য আসে! হোমমেকারদের তো আবার সেটুকু ছুটিও মেলে না। 

মন নিয়ে কাছাকাছি
শরীর ও মন অনেকটা সুখী সংসারের স্বামী-স্ত্রীর মতো। একজন বিব্রত থাকলে অন্যজনের জীবনমান কিছুটা ধাক্কা খায়। তবে মনের ক্লান্তি তত সহজে কাটে কি? তাকে চিনবেনই বা কী করে? ‘হরমোনের অসাম্য, কাজের স্ট্রেস, অ্যানিমিয়া, দিনের পর দিন পর্যাপ্ত বিশ্রাম না মেলা ইত্যাদি নানা কাজে ক্লান্তি বাড়ে। মন যেমন ভারাক্রান্ত হয়, তেমন শরীরেও ব্যথাবেদনা বাড়ে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আবার খিদে ঘুম ইত্যাদির উপর কোপ পড়ে’, জানালেন মনোবিদ ডাঃ অমিতাভ মুখোপাধ্যায়।

ক্লান্তি আসলে কার? 
যে শ্রান্তিতে দিনরাত জেরবার হচ্ছেন, তার উৎস আসলে কোথায়? নিজের জন্য কিছুটা সময় বরাদ্দ করলে ও নিজের কথা ভাবতে বসলে হয়তো এর উত্তর মিলবে। 
 দীর্ঘদিনের ক্লান্তি থাকলে কিছু পরীক্ষা করান। হরমোনের ভারসাম্য, সম্পূর্ণ ব্লাড রিপোর্ট এসবে কোনও গোলমাল না থাকলে, ধরে নিতে হবে সমস্যার শিকড় মনের মাটিতে গাঁথা।
 অমিতাভবাবুর মতে, ‘মানসিক ক্লান্তি বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না। একজন কোন পরিস্থিতিতে আছেন, তাঁর কাজের চাপ কেমন, চারপাশের অবস্থান কী ইত্যাদি নানা কিছুর উপর একজনের মনের অবস্থা দাঁড়িয়ে থাকে। মন ও মস্তিষ্কের সঙ্গে শরীরের যোগ রয়েছে। কাজের চাপ বেশি থাকলে তার ছাপ শরীরেও পড়ে। অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ বেড়ে যায়। পেশিক্লান্তির মূল কারণ হাইড্রোজেন আয়ন, যা ল্যাকটিক অ্যাসিডের কারণে তৈরি হয়। ক্লান্তির ছাপ শরীরে থাকে। মনের ক্লান্তির কোনও ছাপ বাইরে থেকে বোঝা যায় না। জীবনের বাঁকে এমন কিছু অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটতেই পারে যা মনকে বিক্ষিপ্ত করে ক্লান্ত করে। ঘুমের অভাবে বা কোনও অসুখ বা ওষুধের প্রভাবে শরীর ক্লান্ত হলে তা ফের কাটিয়ে ওঠা যায়, কিন্তু মনের বেলায় সেই ক্লান্তি চেনাই দায় হয়ে ওঠে।’ তাই ব্লাড টেস্টের রিপোর্ট, পর্যাপ্ত ঘুম, নিয়মিত ভিটামিন খাওয়ার পরেও ক্লান্ত হলে বুঝতে হবে, মনের ঘরেই মেঘ করেছে।

শ্রান্তি ভুলে শান্তি
 মনের শান্তি বজায় রাখার জন্য ইদানীং বিভিন্ন লাইফস্টাইল ক্লাস, প্রাণায়ামের সেশন নেওয়ার চল হয়েছে। তেমন কিছু পছন্দ হলে অভ্যাস করতে পারেন। নইলে ভালো কোনও যোগ প্রশিক্ষকের কাছ থেকে প্রাণায়াম ও মেডিটেশন শিখে তা অভ্যাস করুন। এতে মনের চাপ কমবে। আবেগ নিয়ন্ত্রণে আসবে ও মন শান্ত হবে।
 কাজের চাপ অনেকটা বেড়ে গেলে কাজের রুটিন ভাগ করে নিন। কোন কাজ কখন করবেন তার একটা তালিকা তৈরি করে সময়মতো কাজ সেরে রাখুন। মোবাইলে আজকাল নানা ওয়ার্ক রুটিন ভাগ করা অ্যাপ রয়েছে, জরুরি কাজ লিখে রাখার জন্য নোটও ব্যবহার করতে পারেন। এতে কাজের চাপে কাজ ভুলবেন না, স্ট্রেসও হাতের মুঠোয় থাকবে।
 সময়ের কাজ সময়ে শেষ করুন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সময় থাকতে কাজ না সেরে রাখার খেসারত দিতে হয় অল্প সময়ে অনেক কাজ শেষ করে। এতে কাজে ভুল হয়। কাজ শেষ করার স্ট্রেসও তৈরি হয়।
 মন ভালো রাখতে নিজের শখের গোড়ায় রোজ জল দিন। যে কাজ করতে ভালোবাসেন, সে কাজে নিয়মিত সময় দিন।
 পরিবারকে সময় দিন। সপ্তাহান্তে একসঙ্গে বেরনো বা ঘরোয়া আড্ডা, ভালো নাটক বা সিনেমা দেখা, খেতে বেরনো এগুলো রোজনামচায় আরও জৌলুস এনে দেয়। অনেকের ক্ষেত্রে খেতে বেরনো বা বাইরে সিনেমা-নাটক দেখার আর্থিক চাপ থাকে। সেক্ষেত্রে বাড়িতেই নিজেরা ভালো রান্না করে খান, আড্ডা দিন, ধারেকাছে কোনও পার্ক বা আড্ডার জায়গা থাকলে সেখানে যান। মোট কথা, চেনা জীবনের ডাল-ভাতে যেভাবে পারেন একটু নুন-মরিচ যোগ করুন।
 শিশু ও গাছের সঙ্গে সময় কাটান বেশি করে। বাড়িতে কোনও পোষ্য থাকলে তাকে সময় দিন।
 বই পড়া, গান শোনা এগুলো শান্তি দিতে পারলে অবশ্যই তা করুন। তবে এসবের পরেও কোনও কারণে মানসিক ক্লান্তিতে বিধ্বস্ত হলে অবশ্যই মনোবিদের শরণ নিন। 

মনীষা মুখোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ