


পরামর্শে বিশিষ্ট নিউরোসার্জেন ডাঃ অমিতাভ চন্দ ও গ্যাস্ট্রোএনটেরোলজিস্ট ডাঃ উদয় চন্দ্র ঘোষাল।
চেম্বারে এসে মুখ কাঁচুমাচু করে বসে পড়লেন ব্যাংককর্মী। তারপরই গড়গড় করে বলতে শুরু করলেন, - ‘ডাক্তারবাবু পেটটা মাঝে মাঝে বিগড়ে যায়। তারপর আর কিছুই করতে পারি না। ব্যাংকের সব হিসেব ভুল হয়ে যাচ্ছে। এমন হলে আর কাজ করতে পারব না মনে হচ্ছে।’ এভাবেই কেউ হঠাৎ ভয় পাচ্ছেন। কারও দুশ্চিন্তা হচ্ছে। কেউ ভাবছেন, বোধহয় ইন্টারভিউটা খারাপ যাবে। কেউ আবার বিপদের কিংবা কোনও দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন। কোনওকিছু নিয়ে আগে থেকেই খারাপ-ভালো নানা অনুভূতি ভিড় করছে মাথার মধ্যে। ঘটনাচক্রে পরে তা সত্যিও হচ্ছে। না, এর পিছনে কোনও অলৌকিক তত্ত্ব নেই। গাট ফিলিংস, সিক্সথ সেন্সের মতো কোনও ব্যাখ্যাও নেই। আছে বিজ্ঞান। আছে এক রহস্য। আছে গাট ব্রেন অ্যাক্সিস। যা লুকিয়ে আমাদের পেটের মধ্যে। আসলে আমাদের মস্তিষ্কের সঙ্গে কথা বলে পেট। এই দুইয়ের বন্ধুত্বে ফাটল ধরলেই বিগড়ে যায় মেজাজ। নানারকম অস্বস্তি, উদ্বেগের জন্ম হয়। আশঙ্কায় ভুগতে থাকেন মানুষজন। নানা ধরনের বিপদের সংকেত পান। চিকিৎসার পরিভাষায় এই পুরো সিস্টেমের নাম ‘গাট ব্রেন অ্যাক্সিস।’ কী এই ব্যবস্থা? কীভাবে কাজ করে?
অন্ত্রের মস্তিষ্ক
মাথার পর শরীরে সবচেয়ে বেশি স্নায়ুকোষ রয়েছে পেটে। এজন্য পেটকে বলা হয় ‘লিটল ব্রেন’। অনেকে আবার ‘দ্বিতীয় মস্তিষ্ক’ বলেও ডাকেন। আসলে মস্তিষ্ক ও পেট গভীরভাবে এক অন্যের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। পেট আমাদের আবেগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া সমস্ত বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এক্ষেত্রে অন্ত্রে ব্যাকটিরিয়া, ভাইরাস, ফাঙ্গাস মিলে বিরাট এক সংসার রয়েছে। একে বলা হয় ‘গাট মাইক্রোবায়োম’। এরা নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি করে। অর্থাৎ এমন কিছু রাসায়নিক তৈরি করে, যা মস্তিষ্কে সঙ্কেত পাঠাতে সাহায্য করে। এদের ভারসাম্য নষ্ট হলেই অন্ত্রে সমস্যা দেখা দেয়। আর তার প্রভাব পড়ে মাথার উপর। জন্ম নেয় ক্লান্তি, অবসাদ, ভয়, আশঙ্কা ইত্যাদি।
পেট ও মস্তিষ্কের মধ্যে যোগসূত্র গড়ে তোলে ভেগাস স্নায়ু। ৮০ শতাংশ বার্তা এই স্নায়ুপথেই মস্তিষ্কে পৌঁছয়। আবার মস্তিষ্ক থেকেও একইভাবে নানা বার্তা পৌঁছয় অন্ত্রে। আর এভাবেই সম্পন্ন হয় শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। খিদে পাওয়া, প্রদাহ, হজম, মাংসপেশি সংকোচন, অন্ত্রের সঞ্চালন সহ নানা বার্তার নিরন্তর আদানপ্রদান চলে। স্নায়ুর পাশাপাশি হরমোন ও নিউরোট্রান্সমিটারের ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। যেমন, সেরোটোনিন নামক নিউরোট্রান্সমিটার। এটির ৯০ শতাংশ উৎপাদিত হয় অন্ত্রে। যা মস্তিষ্কের কার্যকারিতাকে নিয়ন্ত্রণ করে। রয়েছে নানা ধরনের হরমোন। যেগুলি মনমেজাজ ভালো রাখতে, ঘুম, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ, ব্যথা অনুভবের তীব্রতা বুঝতে সাহায্য করে। পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দিতে সাহায্য করে। বলাবাহুল্য, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার একটি বড় অংশই নিয়ন্ত্রিত হয় অন্ত্রে। তাই অন্ত্রে গোলমাল হলেই সব গড়বড় হয়ে যায়।
ব্রেনের থেকেও বেশি ধুরন্ধর ‘গাট ব্রেন’। তাই আপাতদৃষ্টিতে গাট ফিলিংস মনে হলেও আসল চাবিকাঠি রয়েছে অন্ত্রে। মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণ করে পেটের মধ্যে থাকা স্নায়ুতন্ত্র। চিকিৎসকদের পরামর্শ, এক্ষেত্রে পূর্বপুরুষদের কথা মাথায় রাখতে হবে। বৈদিক যুগেও আয়ুর্বেদশাস্ত্রে অন্ত্র ভালো রাখার পরামর্শ দেওয়া হত। বাড়ির বড়রাও বলেন, পেট ঠান্ডা রাখ। উল্টো-পাল্টা খাস না। এই বিষয়গুলি ভুলে গেলে চলবে না। গাট ব্রেন সিস্টেমকে ঠিক রাখতে নজর দিতে হবে খাওয়া-দাওয়ার উপর। পর্যাপ্ত পরিমাণে ফাইবার, ভিটামিন, খনিজ ও আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। বাইরের জাঙ্ক ফুড এড়িয়ে যেতে হবে। প্রয়োজন পর্যাপ্ত ঘুমের। পেট ঠিক থাকলেই আমাদের মন ও মাথাও ভালো থাকবে। সেইমতো ব্যবহার, আবেগ, অনুভূতি সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রিত হবে। কোষ্ঠকাঠিন্য, পার্কিনসনস, অবসাদ সহ নানা জটিল সমস্যা থেকেও মুক্তি মিলবে।
লিখেছেন শোভন চন্দ