


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: ঘটনা ১: শনিবার রাত সওয়া ১০টা। এন আর এস মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সিতে বুকে হাত দিয়ে বসে পড়লেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। কোনোক্রমে বললেন, ‘বুকে প্রচণ্ড ব্যথা করছে। ডাক্তারবাবু কোথায়?’ তাঁকে ওই অবস্থায় দেখে একজন এগিয়ে এসে বললেন, ‘আপনার কী হয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘জানি না। কিন্তু বুকে প্রচণ্ড ব্যথা করছে। আপনি ডাক্তার?’ উত্তর এল, ‘না।’ ‘তাহলে একটু ডাক্তারবাবুকে ডাকুন। কষ্ট বাড়ছে।’ অভিযোগ, ঘটনার সময় ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার দরজা বন্ধ করে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। জানতে পেরেই স্বমূর্তি ধারণ করলেন সেই ব্যক্তি! বললেন, ‘ডাকুন তাঁকে। আমি স্বাস্থ্যসচিব।’ ক্রমে জানা গেল, তিনি যতক্ষণ ‘বুকে ব্যথার রোগী’ ছিলেন, তখন যাঁর সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল, তিনি চতুর্থ শ্রেণির কর্মী!
ঘটনা ২: শনিবার রাতেরই ঘটনা। কলকাতা মেডিকেল কলেজের ইমার্জেন্সিতে গিয়ে হতবাক নীল টি-শার্ট, ছাই রংয়ের ক্যাজুয়াল প্যান্ট পরা সেই পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তি। কোথায় হাসপাতালের পোশাক, কোথায় সরকারি আইডি কার্ড? ইমার্জেন্সি টিকিট কাউন্টারে যিনি বসে আছেন, তিনি একেবারে ঘরোয়া পোশাকে টিকিট এন্ট্রি করছেন! ঘটনাস্থল থেকে মেডিকেলের সুপার তথা উপাধ্যক্ষকে ফোন করেন সেই ব্যক্তি তথা স্বাস্থ্যসচিব। জানতে পারেন, যিনি বসে আছেন কাউন্টারে, তিনি আসলে চতুর্থ শ্রেণির কর্মী। কম্পিউটারের কাজ জানেন, তাই লোকবলের অভাবে তাঁকে দিয়েই ডেটা এন্ট্রি অপারেটরের কাজ করাচ্ছে হাসপাতাল!
এভাবে এক-একটি মেডিকেল কলেজে এক-এক ধরনের বিচিত্র দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন সচিব। সবক’টিতে মোটামুটি ‘কমন’ যে বিষয়টি, তা হল, রাতের হাসপাতালে সিনিয়র ডাক্তার নেই বললেই চলে। এরপর তিনি মেডিকেল, আর জি কর, পিজি, এন আর এস, ন্যাশনাল— প্রতিটি জায়গার সুপার ও অধ্যক্ষকে জানিয়ে দেন, মেডিসিন এবং মেডিসিন সংক্রান্ত বিভাগের একজন এবং সার্জারি বা সার্জারি সংক্রান্ত বিভাগের একজন করে সহকারী অধ্যাপককে রাতে হাসপাতালে থাকতেই হবে। শুধু ‘অন-কল’ হলেই চলবে না। যে কোনো ঘটনা-দুর্ঘটনা হোক বা কোনো জটিল রোগের চিকিৎসার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া— জনস্বার্থে রাতের হাসপাতালে মেডিকেল অফিসারদের পাশাপাশি ২ জন স্পেশালিস্ট চিকিৎসক থাকতেই হবে।
এখানেই শেষ নয়। গৃহীত এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোন মেডিকেল কী ব্যবস্থা নিল, রোস্টার তৈরি হল কি না ইত্যাদি জানতে রবিবার কলকাতার মেডিকেল কলেজগুলির সুপার-অধ্যক্ষদের তলব করেন প্রধান সচিব। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত তাঁরা ছিলেন স্বাস্থ্যভবনেই। এত রাত পর্যন্ত স্বাস্থ্যভবনে থাকা নিয়ে এসব সুপার-অধ্যক্ষদের একাংশের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তাঁদের কেউ কেউ বলেন, ‘এগুলি আগে করেননি কেন? শূন্যপদ পূরণ করেননি কেন? এখন সারপ্রাইজ ভিজিট ও অ্যাকশন নেওয়ার কথা মনে পড়ছে?’ স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম বলেন, ‘রাতের হাসপাতালেও উন্নত পরিষেবা নিশ্চিত করতে হবে। তাই জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।’ এদিকে, বুধবার রাতেই স্বাস্থ্যভবন নির্দেশিকা জারি করে জানিয়েছে, সমস্ত সরকারি মেডিকেল কলেজ ও হাসাপাতালে কর্মরতদের জন্য সাত রকমের পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। ২৫ মে থেকে এই কাজ শুরু হবে। ২৮ মে’র মধ্যে তা শেষ করতে হবে।