শ্রীকান্ত পড়্যা, পাঁশকুড়া: বিজেপির রাজ্য সম্পাদক তিনি। এলাকায় দাপুটে নেতা বলেও পরিচিত। দলীয় ক্ষমতার এমন সুযোগ নিয়ে কখনও প্রার্থী করার টোপ, কখনও নানা প্রস্তাব দিয়ে দলেরই এক প্রবীণ নেতার সর্বস্ব হাতিয়ে পথে বসিয়ে দিয়েছেন তিনি। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে নালিশ ঠুকেও খুব একটা লাভ হয়নি। একরকম বাধ্য হয়েই পাঁশকুড়ার ওই নেতা সিন্টু সেনাপতির বিরুদ্ধে ৯১ লক্ষ ৬৫ হাজার ৬২৩ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে থানায় এফআইআর দায়ের করলেন প্রতারিত নেতা নারায়ণকিঙ্কর মিশ্র। ৭৪ বছর বয়সি নারায়ণবাবু দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি করছেন। ২০০১, ২০১১ ও ২০১৬ সালে তিনবার কোলাঘাট ও পাঁশকুড়া বিধানসভা থেকে দলের প্রার্থী হয়েছিলেন। কর্মজীবনে রঘুনাথবাড়ি হাইস্কুলে লাইব্রেরিয়ান ছিলেন। বর্তমানে সিন্টুর শাগরেদদের নাগাড়ে হুমকিতে প্রবীণ নেতাও এলাকায় ঢুকতে পারছেন না।
জানা গিয়েছে, পাঁশকুড়ার কেদারপুরের বাসিন্দা নারায়ণকিঙ্করবাবুর বিপুল সম্পত্তির মালিক। বিভিন্ন সময়ে সিন্টু চাপ দিয়ে টাকা আদায় করেছেন বলে তাঁর অভিযোগ। একটা সময় তাঁকে সল্টলেক সহ বিভিন্ন জায়গায় আটকে রেখে সিন্টু ও তাঁর দলবদল জমিজমা বিক্রি করিয়ে জোর জবরদস্তি করে টাকা হাতিয়েছেন বলে তিনি জানান। গোটা বিষয়টি জানিয়ে ২ ফেব্রুয়ারি থানায় এফআইআরও দায়ের করেন। এর আগে গত ২৪ জানুয়ারি রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকেও চিঠি দিয়ে সবটাই জানিয়েছিলেন। তাতে লাভের লাভ হয়নি।
পুলিশ সূত্রে খবর, সিন্টু সেনাপতি, দলের আরও দুই নেতা বালিডাংরির কৌশিক জানা ও কোলাঘাটের পয়াগ গ্রামের প্রসেনজিৎ সরকারের বিরুদ্ধে এফআইআর করেছেন নারায়ণকিঙ্করবাবু। কৌশিক ও প্রসেনজিৎ দু’জনই বিজেপি নেতা। তাঁরা সিন্টুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পাঁশকুড়ার রাজনীতিতে পরিচিত। নারায়ণবাবুর অভিযোগ, ২০১৫ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সাত বছরে তাঁর কাছ থেকে সিন্টু, কৌশিকরা নানা অছিলায় ৯১ লক্ষ ৬৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। নিজের অবসরকালীন প্রাপ্ত টাকা ছাড়াও নিজের প্রচুর সম্পত্তি বিক্রি করে ওই টাকা জুগিয়েছেন তিনি। এই মুহূর্তে প্রায় নিঃস্ব অবস্থা তাঁর। স্ত্রী মারা গিয়েছেন। এদিকে, সিন্টুর মতো নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় অভিযোগ জানিয়ে নিজেও প্রাণ সংশয়ে ভুগছেন।
সিন্টু দোর্দণ্ডপ্রতাপ বিজেপি নেতা বলে পরিচিত। ২০২১ সালে পাঁশকুড়া পশ্চিম বিধানসভার বিজেপি প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন। ২০২২ সালে আগস্ট মাসে তৎকালীন জেলা বিজেপি সভাপতি তপন বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সঙ্গীদের উপর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চড়াও হওয়ার অভিযোগ ওঠেছিল সিন্টু ও তাঁর দলবলের বিরুদ্ধে। এপর্যন্ত মোট ৩৯টি মামলা রয়েছে সিন্টুর নামে। ফের নারায়ণকিঙ্করবাবুর ঘটনাটি সামনে আসতেই তোলপাড় শুরু হয়েছে। তদন্ত শুরু করেছে পাঁশকুড়া থানার পুলিশ। একটি কোম্পানির অ্যাকাউন্ট ছাড়াও সিন্টুর সহযোগী বেশ কয়েকজনের অ্যাকাউন্টে টাকা লেনদেন হয়েছে। সেই তথ্যও পুলিশকে দিয়েছেন নারায়ণকিঙ্করবাবু। এমনকী, ১০ টাকার স্ট্যাম্প পেপারে সিন্টু সমূহ টাকা ফেরত দেওয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েও কথা রাখেনি বলে তাঁর দাবি। গত ৯ ডিসেম্বর টাকা চাওয়া নিয়ে ঝামেলা হলেই সিন্টু কপালে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয় বলেও নারায়ণবাবু পুলিশকে জানিয়েছেন।
এনিয়ে সিন্টু বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন নারায়ণকিঙ্কর মিশ্র। তিনি আমাদের পার্টি করতেন। এখন অন্য কোনও দলের নেতাদের প্রশ্রয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ করছেন। ১০ টাকার স্ট্যাম্প পেপারে যে সই রয়েছে, সেটা আমার নয়।’ নারায়ণকিঙ্করবাবু বলেন, ‘আমি সিন্টুর সঙ্গেই থাকতাম। ২০২১ সালে প্রার্থী করার টোপ দিয়েছিলেন তিনি। আমি অবসরকালীন আর্থিক সুবিধা ও জমিজমা বেচে টাকা দিয়েছি। টাকা ফেরত দেওয়ার লিখিত অঙ্গীকার করেও প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছে।’