নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: এসআইআর কি সত্যিই বিজেপিকে ডিভিডেন্ড দিচ্ছে? শুনানিপর্বের মাঝামাঝি পৌঁছে সন্দিহান গেরুয়া বাহিনীর অন্দরমহলই। কারণ, এক কোটি বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গার খোঁজ মেলেনি। যাঁরা পাকাপাকিভাবে স্থানান্তরিত হয়েছেন, তাঁদের সিংহভাগই বিহার, উত্তরপ্রদেশের মতো গো-বলয়ের বাসিন্দা। অর্থাৎ, বিজেপির ভোটার হওয়ার সম্ভাবনাই তাঁদের বেশি। বাকি থাকল নো-ম্যাপ এবং শুনানিতে ডাক পাওয়া ভোটাররা। সেক্ষেত্রেও কোটি খানেক বাংলাদেশি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাহলে ভোটে কীভাবে ফায়দা পাবে গেরুয়া শিবির? শুধুই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে কুকথা বলে? সেটাও তো সম্ভব নয়। কারণ, গোটা রাজ্যে হাতেগোনা এমন কিছু ঘরই পাওয়া যাবে, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকল্পের আলো পৌঁছায়নি। আর তার মধ্যে মাথা উঁচু করে রয়েছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। এই একটি সমীকরণ কাটতে না পারলে বাংলা বিজয় যে এবারও স্বপ্নই থেকে যাবে, তা বিলক্ষণ বোঝেন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বও। উপরন্তু পৌষের শীতে এসআইআর শুনানির নামে লাইনে দাঁড়ানো সাধারণ মানুষ ফুঁসছে কমিশন এবং বিজেপির বিরুদ্ধে। তাই এবার বঙ্গ বিজেপির মরিয়া চেষ্টা কী? অন্তত মহিলা ভোটারদের আটকানো। তাঁরা ভোট দিতে বুথ পর্যন্ত পৌঁছালে মমতার ঝুলিই যে ভরতি হবে, তা নিশ্চিত। তাই এখন থেকে ‘মরিয়া’ প্রচারেই নেমে পড়েছেন গেরুয়া সদস্যরা। রীতিমতো তালিবানি ফতোয়ায় জারি হচ্ছে ভোটের সময় মহিলাদের ঘরবন্দি করে রাখার নিদান।
পশ্চিম মেদিনীপুরের দাসপুরে বিজেপির রাজ্য কমিটির সদস্য কালীপদ সেনগুপ্ত প্রকাশ্যে ফতোয়া দিয়েছেন, ‘এখনও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পাওয়া মায়েরা আছেন, যাঁরা জোড়াফুলে ভোট দিতে যাবেন। আমি সেই সব পরিবারের স্বামীদের বলছি—ওই মায়েদের ঘরে বন্দি রেখে দেবেন। ভোটটা দিতে হবে পদ্মফুলে। জোড়াফুলে নয়।’ এহেন মন্তব্যে রাজ্যজুড়ে প্রবল সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিজেপিকে স্রেফ ‘নারী বিরোধী’ বলে তকমা সেঁটে দিয়েছে আম জনতার একটা বড় অংশ। পাশাপাশি আসরে নেমে পড়েছে তৃণমূলও। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাফ ব্যাখ্যা, প্রথমে নির্বাচন কমিশনকে হাইজ্যাক, এসআইআর পরিচালনা করে বৈধ ভোটারের নাম গণহারে মুছে ফেলার চেষ্টা। পরের ধাপে লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি বা অসংগতিতে জোর। যখন সেসব ব্যর্থ হল, তখন বিজেপি নেতা হুমকি দিচ্ছেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রাপক মহিলারা যেন ভোট দিতে বেরতে না পারেন! ২০২৬ সালে বিজেপি যাঁদের বন্দি করে রাখতে চাইছে, সেই লক্ষ লক্ষ মহিলারা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নারী বিরোধী বিজেপিকে চিরতরে বিদায় দেবে।
তৃণমূলের দাবি, বিজেপিও কোথাও বুঝতে পারছে যে, সাংগঠনিক ক্ষমতার জোরে তৃণমূল যেভাবে রাজ্যের ৮১ হাজার বুথে সাধারণ মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তাতে ছাব্বিশের লড়াই আরও কঠিন হচ্ছে। তাই এবার মহিলা ভোট তৃণমূলের ঝুলিতে যাওয়া আটকাতে চাইছে তারা। কারণ, ২ কোটি ২১ লক্ষ ভোটার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পেয়ে থাকেন। এই সংখ্যাটা যে কোনও ভোটের ফল নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট। তা ছাড়া নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নের নজির তো বাংলায় রয়েইছে। সেই কারণেই পঞ্চায়েত থেকে লোকসভা পর্যন্ত তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় মহিলা প্রতিনিধিত্ব সবথেকে বেশি। পাশাপাশি কেন্দ্রের রিপোর্টেই কলকাতা পেয়েছে নিরাপদতম শহরের তকমা। এই সামগ্রিক নির্যাসে তৃণমূলকে এখনও পিছিয়ে দিতে পারেনি। তার উপর ‘নারী স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া’র যে প্রচার বিজেপি শুরু করল, তা মোটেই গেরুয়া ব্রিগেডকে ভোটে সুবিধা দেবে না। এই অঙ্ক বুঝতে পারছেন বঙ্গ বিজেপির নেতারাও। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার তাই সাফাই দিয়েছেন, ‘যিনি ওই মন্তব্য করেছেন, তাঁকে আমি চিনি না।’ ঘাটাল বিজেপির সাংগঠনিক সভাপতি তন্ময় দাস বলেন, ‘গণতান্ত্রিক অধিকার সবাই প্রয়োগ করুন। যাঁরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পান, তাঁরা দেশের নাগরিক। তাঁরা অবশ্যই ভোট দিতে যাবেন। নারী বিরোধী মন্তব্য আমরা সমর্থন করছি না।’