


নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: পাহাড় ছাড়াও ভারী বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত ডুয়ার্সের বিস্তীর্ণ এলাকা। ভারী বৃষ্টির ফলে উপচে পড়ছে তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, রায়ডাকের মতো সিকিম এবং ভুটান থেকে নেমে আসা একাধিক নদী। দার্জিলিং, কালিম্পংয়ের বিপর্যয়ের পাশাপাশি ইতিমধ্যে কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার এবং জলপাইগুড়ি জেলার একাধিক এলাকা এখন পুরোপুরি জলমগ্ন। মৃত্যু হয়েছে একাধিক ব্যক্তির। এই পরিস্থিতিতে ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা ওয়াংচু নদীতে (পশ্চিমবঙ্গের অংশে যার নাম রায়ডাক) অবস্থিত টালা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধের উপর দিয়ে জল বইতে শুরু করায় পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে এগোচ্ছে। ভুটান সরকারের ড্রুক গ্রিন পাওয়ার কর্পোরেশন নিয়ন্ত্রিত এই বাঁধের গেট বিকল হয়ে যাওয়াতেই উত্তরবঙ্গে বিপর্যয়ের মেঘ আরও ঘনীভূত হচ্ছে। কারণ, সেই ক্ষেত্রে ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা বৃষ্টির জল সামান্য হলেও ধরে রাখার আর কোনও উপায় রইল না। এটা বুঝতে পেরেই কোচবিহার, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ারে ভারী মাত্রায় বন্যার সতর্কতা জারি করেছে ভুটানের থিম্পুতে অবস্থিত জাতীয় জলবিদ্যা ও আবহাওয়া কেন্দ্র। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কার কথা প্রকাশ করে মানুষের সুরক্ষার লক্ষ্যে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে। রাজ্যের এক পদস্থ কর্তা জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ বিষয়টি নিয়েই শীর্ষস্তরে আলোচনা হয়েছে। সাধারণ মানুষের ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব কম করা যায় সেই লক্ষ্যেই প্রশাসনের সর্বস্তরের আধিকারিক কর্মীকে কাজে নামানো হয়েছে।
আগে থেকেই উত্তরবঙ্গে অতিভারী বৃষ্টির হওয়ার লাল সতর্কতা জারি করেছিল আবহাওয়া দপ্তর। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থাও নিয়ে রেখেছিল প্রশাসন। কিন্তু, ডুয়ার্সের এই বিপর্যস্ত পরিস্থিতির জন্য সরাসরি মোদি সরকারকে দায়ী করছে রাজ্য প্রশাসন। কারণ, প্রতিবছরই ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা জলে বানভাসি হয় উত্তরবঙ্গের তিন জেলা। ফলে এই বিপর্যয়ের হাত থেকে রেহাই পেতে ইন্দো-বাংলাদেশ রিভার কমিশন, ইন্দো-নেপাল রিভার কমিশনের মতোই ইন্দো-ভুটান রিভার কমিশন তৈরির প্রস্তাব দিয়েছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অন্যান্য চিঠির মতো এক্ষেত্রেও কেন্দ্রের তরফে রাজ্যকে কিছুই জানানো হয়নি। এমনকি, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় এই কমিশন গঠনের প্রস্তাব পাশ করিয়ে পাঠানো হয়েছিল কেন্দ্রের কাছে। এরপরেও কেন্দ্র কোনও উচ্যবাচ্য না করায় গত ১১ আগস্ট তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় মোদি সরকারের এই বিষয়ে কী চিন্তাভাবনা রয়েছে তা জানতে চান। উত্তরে, এই কমিশন গড়ার কোনও পরিকল্পনা তাঁদের নেই বলে জানিয়ে দেন কেন্দ্রীয় জলশক্তিমন্ত্রী সি আর পাতিল। কেন্দ্রের এই সিদ্ধান্তকে বাংলার প্রতি বিমাতৃসুলভ আচরণ বলেই রবিবার ব্যাখ্যা করেছেন রাজ্যের সেচমন্ত্রী মানস ভুঁইয়া। তিনি জানিয়েছেন, রিভার কমিশনের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, সেটা আজকে বোঝা যাচ্ছে। যাঁরা বাংলাদরদি সেজে ঘুরে বেড়ান, আর উত্তরবঙ্গে গিয়ে ভাগাভাগির রাজনীতি করেন, আজ এতগুলি প্রাণ গেল কেন, তার জবাব তাঁদের দিতে হবে।
কিন্তু কেন প্রয়োজন এই রিভার কমিশনের? রাজ্যের এক পদস্থ কর্তা জানিয়েছেন, ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা অন্তত ৭২টি নদী ও ঝোরার জলের ভার বইতে হয় উত্তরবঙ্গকে। তার ফলে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার ফসল, রাস্তাঘাটসহ বহু সম্পত্তি নষ্ট হয়ে যায়। সব ধুয়ে মুছে যায়। ফের নতুন করে সব গড়তে হয়। এই কমিশন গঠন হলে এই সমস্যায় ইতি টানার নকশা তৈরি করা সম্ভব হবে। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, বর্তমানে ভুটান পাহাড়ে ছয়টি রেনগজ স্টেশন আছে। সম্প্রতি, জলশক্তি মন্ত্রক, সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন, অসম এবং বাংলার একটি যৌথ প্রতিনিধি দল ভুটান পাহাড় পরিদর্শনের পর ৫৫টি জায়গায় রেনগজ স্টেশন স্থাপনের প্রস্তাব দেয়। উদ্দেশ্য, বৃষ্টিপাত সম্পর্কিত আরও ভালো পূর্বাভাস পাওয়া। কিন্তু, এরপরেও কমিশন তৈরি নিয়ে রাজ্যের প্রস্তাব কেন্দ্র মানে কি না, সেদিকেই নজর রয়েছে সকলের।