নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বাঙালি ঐক্যবদ্ধ হলে বা গোষ্ঠী তৈরি করলেই ব্যবসায় সফল হবে। কারণ, এদেশে যারাই ব্যবসা বা শিল্পে সফল হয়েছে, তারা ঐক্যবদ্ধ। এমনই দাবি করলেন রাজ্য ক্ষুদ্র শিল্প উন্নয়ন নিগমের চেয়ারম্যান তথা বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অভিরূপ সরকার। রবিবার বেঙ্গল বিজেনস কাউন্সিলের বার্ষিক অধিবেশনে তিনি বলেন, ‘এরাজ্যে বড় শিল্প হলে ভালো। কিন্তু বড় বিনিয়োগ না এলে শিল্প হবে না, এমন ভাবনার কোনও কারণ নেই। কারণ, কেরলের মতো রাজ্য আয়ুর্বেদ, পর্যটন বা জুয়েলারির মতো ছোট ছোট শিল্পের মাধ্যমেই বাজিমাত করেছে। তারই ফলশ্রুতি তাদের আর্থিক সমৃদ্ধি। এরাজ্যের মাথাপিছু আয়ের তুলনায় কেরলের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ!’
অভিরূপবাবুর কথায়, ‘স্বাধীনতা এবং তার পরবর্তীকালে মহারাষ্ট্র ও গুজরাতের তুলনায় অবিভক্ত বাংলার শিল্পপরিস্থিতি অনেক ভালো ছিল। এমনকী, পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ ভাগ হওয়ার পরও পশ্চিমবঙ্গের দিকটিতেই শিল্পের ভাগ বেশি ছিল।’ কিন্তু কেন সেই গরিমা চলে গেল? অভিরূপবাবু এর একাধিক কারণ সামনে এনে বলেন, ‘এরাজ্যের শিল্পগুলি ছিল ব্রিটিশ পরিচালিত এবং দেশীয় চাহিদা পূরণের তুলনায় রপ্তানিনির্ভর। বরং পশ্চিমের রাজ্যগুলি অনেক বেশি দেশীয় চাহিদা মেটাত। স্বাধীনতার পর এই বাংলার শিল্পগুলি হয় গুজরাতি বা মাড়োয়ারিরা কিনে নেন, অথবা তা রাষ্ট্রায়ত্ত হয়ে যায়। নিজস্ব শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলিতেও বাঙালির পরবর্তী প্রজন্ম আগ্রহ দেখায়নি। পাশাপাশি এরাজ্যে স্বদেশি পণ্যের যে আবেগ ছিল, স্বাধীনতা-পরবর্তী যুগে তা কিছুটা ফিকে হয়ে যায়। বহুজাতিক সংস্থাগুলিও তাদের কার্যালয় বাংলা থেকে সরিয়ে নিতে শুরু করে।’ এরই সঙ্গে এখানে নকশাল কার্যকালাপ শিল্পের অনেক ক্ষতি করেছে বলে তিনি দাবি করেন। পাশাপাশি বাঙালি ব্যবসায়ীদের ঐক্যবদ্ধ না-হওয়ার কারণকেও সামনে এনেছেন অভিরূপবাবু।
এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, ‘গুজরাতি বা মাড়োয়ারি সম্প্রদায় ব্যবসার বিষয়ে নিজেদের মধ্যে এতটাই জোটবদ্ধ, তারা অন্য কাউকে সেখানে ঘেঁষতে দেয় না। মহারাষ্ট্রের পার্সিরাও জোটবদ্ধ একইরকম। বাঙালি যদি একইভাবে জোটবদ্ধ হয়, নিজেদের কমিউনিটি নেটওয়ার্ক তৈরি করে, তাহলে সাফল্য আসতে বাধ্য। এক্ষেত্রে কোনও সংস্থা পিছিয়ে পড়লে অন্য সংস্থা তাকে সাহায্য করবে। একাধিক সংস্থার মধ্যে ব্যবসায়িক চুক্তি অনেক ক্ষেত্রেই লঙ্ঘিত হয়। তাতে ব্যবসা মার খায়। আইনি সাহায্য পাওয়া গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদি। বরং গোষ্ঠী তৈরি হলে, সেখানে চুক্তি লঙ্ঘন না-করার চাপ থাকবে।’ ‘ব্যবসা চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দক্ষ কর্মী পেতেও সাহায্য করে গোষ্ঠী বা কমিউনিটি’, দাবি অভিরূপবাবুর।
এদিনের অনুষ্ঠানে বেঙ্গল বিজেনস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান অভিষেক আড্ডি জানান, বাঙালির ব্যবসা সম্প্রসারণে তাঁরা একাধিক পদক্ষেপ করবেন। যেমন, ব্যবসাকে কেরিয়ার হিসেবে গ্রহণ করতে বাঙালিদের উৎসাহিত করবেন তাঁরা। কাউন্সিল সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক ব্যবসা বাড়াবেন। সরকারি নীতি ব্যবসায় প্রভাব ফেললে, তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনার পথ প্রশস্ত করা হবে। ‘বাঙালি ব্যবসা করতে জানে না’—এই মিথ ভাঙার জন্য দেশে-বিদেশে প্রচার করবে কাউন্সিল। তারা তুলে ধরবে বাঙালি ব্যবসার বর্তমান সাফল্যের ছবি।