Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

বাঁটুল দি গ্রেট

গানে ভুবন ভরিয়ে দেব ভেবেছিল একটি পাখি—ভোরের বাজারে তখনও শুরু হয়নি ক্রেতা–বিক্রেতার দ্বৈরথ। বিক্রেতারা ব্যস্ত তাঁদের পশরা সাজিয়ে বিক্রেতার সামনে তুলে ধরতে।

বাঁটুল দি গ্রেট
  • ২৫ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তপন বন্দ্যোপাধ্যায়: গানে ভুবন ভরিয়ে দেব ভেবেছিল একটি পাখি—

Advertisement

ভোরের বাজারে তখনও শুরু হয়নি ক্রেতা–বিক্রেতার দ্বৈরথ। বিক্রেতারা ব্যস্ত তাঁদের পশরা সাজিয়ে বিক্রেতার সামনে তুলে ধরতে। ঘুম ভেঙে আড়ামোড়া খেয়ে চোখ মেলছে নানা রঙে মোড়া শাক–সব্জিরা। চৈত্রভোর, বাইরের বড় রাস্তায় তখনও কুয়াশা–কুয়াশা। প্রতিদিনের মতো ছোট্ট টুলটায় বসে টুলেরই  সামনের দিকটায় দুই চেটো দিয়ে তবলা বাজিয়ে গান ধরেছিল বাঁটুল, গানে ভুবন.... 
—যা বাঁটুল, ট্রাক এসে গেছে, শিগগির যা। টুলে বসে তবলা বাজালে চলবে?
তার কণ্ঠ বেশ সুরেলা, গানও খুব  উচ্চ মানের। কখনও তার গলায় হেমন্ত, কখনও শ্যামল, কখনও  সন্ধ্যা বা প্রতিমার গান।
বাঁটুল গান থামিয়ে বলল, অ্যাই পটলদা, রোজ রোজ বাঁটুল বলবে না। আমার নাম সূর্য, সূর্যকুমার।
পটলাদা বাজারের কোণে আলু–পেঁয়াজের দোকানে বসে, মালিক অবশ্য সে নয়, তার দাদা হাবুলদা, হাবুলদা বাজারে আসবে আরও ঘণ্টাখানেক পর।
বাঁটুলের তিরিক্ষি মেজাজ দেখে খিক খিক করে হেসে বলল, সূর্য সেই সূর্য আকাশের কোনদিকে ওঠে রে পশ্চিমে, না উত্তরে?
তার কথার উত্তর না দিয়ে, ট্রাক এসেছে শুনে বাঁটুল তড়িঘড়ি চলল বড় রাস্তার উপর। মস্ত পাঞ্জাব বডির ট্রাক আলুর বস্তা বোঝাই হয়ে অপেক্ষা করছে বাহকদের জন্য। ট্রাকের খালাসিরা ততক্ষণে শক্ত কাছির বাঁধন খুলে দিয়েছে, পিছনের ডালা খুলে নামিয়ে দিতেই বাহকরা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছে আলুর বস্তা পিঠে তুলে নিতে। এক–একজন পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়ায়, আর খালাসিরা তাদের পিঠে তুলে দিতেই বস্তার ভারে বাহকদের পিঠ  নুয়ে পড়ে সামনের দিকে। বাহকদের সবার চেহারা শক্তপোক্ত তা নয়, কিন্তু অনেক বছর ধরে বাহকের কাজ করতে করতে সবাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে বস্তা পিঠে নিয়ে  দৌড়তে, বাজারে ঢুকে আলুর ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দিয়েই আবার ফেরে ট্রাকের কাছে।     
বাঁটুলও দাঁড়ায় লাইনে, তার পালা আসতে সেও পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়ায়, খালাসিরা হেসে বলে, তোর পিঠ তো মাটির সঙ্গে লেপ্টে যায়। রোজ কী করে যে তুলি তোর পিঠে!
বাঁটুল মুখ বাঁকিয়ে বলে, রোজ–রোজ ভ্যানতাড়া করবিনি তো তোল পিঠে। 
অন্য বাহকরা যেখানে লম্বা, বেশ তাগড়াই চেহারার, সেখানে বাঁটুলের ছোটখাট শরীরে অত বড় বস্তা তোলা সত্যিই দায়। 
ছোটখাট মানে সত্যিই ছোট। মাত্র  চার ফুট  দু’ইঞ্চি উচ্চতার বাঁটুলের আসল নাম কেউ আর বলে না। তার খর্বাকৃতি চেহারার জন্য তাকে বাঁটুল বলে ডাকতে ডাকতে এখন বাঁটুল নামটাই তার আসল নাম হয়ে গেছে। 
ট্রাকের পিছনে যখন পিঠ পেতে দাঁড়ায়, দুজন খালাসি অনেক কসরত করে আলুর বস্তা তুলে দেয়, আর কী আশ্চর্য ওইটুকু চেহারা নিয়ে সে বস্তা পিঠে টুকটুক করে ঢুকে যায় বাজারের মধ্যে। কিন্তু আরও আশ্চর্য, তার মুখে তখনও নতুন গানের  কলি, মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা—। 
বাজারের মুখে ফলের দোকানের অনলদা তার ভুঁয়ে নুয়ে পড়া শরীরটা দেখে বলল, এত ভারী বস্তা পিঠে নিয়ে তোর গলায় এমন সব কঠিন গান কী করে আসে বল তো? ধন্যি ছেলে বটে!
পানের রাশি নিয়ে বসা তিনুবাবু বললেন, যা তোর গলা না রেকর্ড কোম্পানি পারলে তোকে নিয়ে গিয়ে রেকর্ড করবে কোনও দিন। 
বাঁটুল সে–কথায় কান না দিয়ে গাইতে–গাইতে পৌঁছে যায় আলুর ব্যবসায়ী প্রসন্ন হাটুইয়ের গোডাউনের সামনে। বস্তা নামিয়ে দিয়েই পরক্ষণে আবার  ছুটতে থাকে বড় রাস্তায় ট্রাকের কাছে। 
ছ’জন বাহক আধঘণ্টার মধ্যে খালি করে ফেলে ট্রাক। খালাসিরা ট্রাকের ডালা তুলে ঠিকমতো আটকে দিতে ট্রাক রওনা হয়ে গেল তার গন্তব্যে।  এখন কিছুক্ষণের জন্য বাহকদের বিশ্রাম। বাঁটুলের অবশ্য বিশ্রাম নেই। সে আবার তার টুলে বসে আগের মতোই টুলের উপর তবলা বাজাতে বাজাতে গান ধরল, আজ মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন— 
টুলটা অবশ্য বাঁটুলের নিজস্ব নয়, অনিল সাঁপুইয়ের। তারের জাল ঘেরা তার দোকানে পাওয়া যায় হরেক রকমের বিস্কুট। মাঝেমধ্যে বাজারের কেউ কেউ ওর কাছে এসে গান শোনে। কেউ বা ফরমাশ করে, এই বাঁটুল, শ্যামল মিত্রের ওই গানটা গা দেখি, ওই যে—।
বাঁটুল অমনি ঘোর উৎসাহে গাইতে শুরু করে, ‘আহা ওই আঁকাবাঁকা যে–পথ.....’        
কেউ বলল, মান্না দে–র ওই গানটা শোনা তো—
বাঁটুল বিন্দুমাত্র দেরি না করে গাইল, ‘আমি যে জলসাঘরের...’।
কেউ বলে, তোর এত গানের স্টক আসে কোত্থেকে বল তো?
বাঁটুল হেসে বলে,  ছেলেবেলা থেকে গানের মধ্যেই তো থাকি। দেড় হাজার গান গাইতে পারি।
কেউ বলে, গান না শিখে তোর গানের এত মহিমা, শিখলে না জানি কী হতো! শিখিসনি কেন?
বাঁটুলের শরীরটা ছোট্ট হলে কী হবে, তার চোখদুটো বড় বড়, বাঙ্ময়। সেই চোখ ছলছল করে ওঠে। তার গান–না–শেখার কাহিনি কখনও বলে, জানো, ছোটবেলায় বাবা না থাকলে সেই  ছেলেমেয়ের খুব জ্বালা। বাবা একটা লেদ মেশিনে কাজ করত। হঠাৎ সেই মেশিনে জড়িয়ে গিয়ে বাবা হাসপাতালে, সেখান থেকে শ্মশানে। মা কী করবে, লোকের বাড়ি কাজ করে মানুষ করল আমাকে। মানুষ করল, মানে বড় করল। লেখাপড়ায় মন ছিল না, ছোট থেকে শুধু গান করতাম। মাকে বললাম, গান শিখব। পাড়ার একজন গানের টিচার ছিলেন, তাঁর কাছে গেলাম, তিনি আমার চেহারা দেখে নাক শিঁটকে বললেন, ‘তোর গান শিখে কী হবে? হারমোনিয়ামের রিড হাতে পাবি না।’ তাই শুধু গান শেখাই হল না তা নয়, কোথাও একটা কাজও জোগাড় করতে পারলাম না। আমাকে কে কাজ দেবে  যেখানেই যাই, বলে আগে আরও ছ’ইঞ্চি লম্বা হয়ে আয়।
—তারপর?
—যে যা বলেছে, তাই করেছি। কেউ বলল, ‘রিং কর, লম্বা হবি’, কত রিংয়ে ঝুললাম, আধ ইঞ্চির বেশি বাড়লাম না। কেউ বলল, ‘জিমন্যাস্টিক কর। রোজ আর্চ করবি, দেখবি—।’ কোনও কিছুতে কিছু হল না। তবে জিমন্যাস্টিক করে শরীরটা বেশ শক্তপোক্ত হল, এখন তিরিশ মন পিঠে নিয়ে অনায়াসে এক মাইল হেঁটে যেতে পারি।
বলতে বলতে বাঁটুলের মুখটা কীরকম ম্রিয়মাণ হয়। বাজারের ভিতরের গুমোটে তার চোখের কোণ চিকচিক করতে থাকে। 
কয়েকদিন পর হঠাৎ একদিন বাজারের ঝাঁপ খুলল না। বাজার–কমিটির কোনও নেতা মারা গিয়েছে, তাঁর স্মরণে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে বাজার সেদিনকার মতো বন্ধ। 
বাজার বন্ধ হলে বাঁটুলের খুব বিপদ। তার তো ঘরবাড়ি নেই, সকাল থেকে খোলেনি কোনও দোকান। সব্জি–বাজার, মাছের বাজার, ফলের বাজার—সবাই ঝাঁপ বন্ধ করে বাড়ি গিয়ে দুপুরের ঘুমে ব্যস্ত। বাঁটুল ফাঁকা বাজারের ভিতর একা–একা ঘুরতে থাকে, বেলা বাড়লে কাছের একটা হোটেলে গিয়ে খেয়ে আসে, ভাবছিল বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে যাবে অদূরের একটা আশ্রমে। ওখানে বিকেলের আরতি খুব ধুমধাম করে হয়। তার আগে ভজন গাওয়া হয়। শুনবে সেসব। ভজনও তার পছন্দ।
বেরতে গিয়ে দেখে, বাজারের বাইরে, রাস্তার উপর বাঁধা হচ্ছে একটা ছোট মঞ্চ। প্রয়াত নেতার স্মরণে বক্তৃতা হবে। বাঁটুলকে দেখে বাজার কমিটির নেতা দীনু মল্লিক বললেন, বিকেলের সভায় থাকবি, বাঁটুল। বাজার বন্ধ বলে সব দোকানি বাড়ি চলে গেছে, সভায় ক’জন আসবে কী জানি।
বাঁটুল কী আর করে নেতার কথা অমান্য করা চলবে না। 
দেখতে দেখতে বিকেল। মাইকম্যান এসে মঞ্চের উপর সাজাতে শুরু করে তার সরঞ্জাম। দীনুদা ঘড়ি দেখছেন ঘন ঘন। মোবাইলে ফোন করছেন বারবার। বিখ্যাত নেতা জহর পোদ্দার কখন আসবেন তা জেনে নিয়ে মাইকম্যানকে তাড়া দিলেন, অ্যাই আবির, এখনও মাইক টেস্টিং শুরু করলি না, সাড়ে চারটে বাজে। জহরদা এখনই এসে পড়বেন। উনি কিন্তু এসেই বলবেন, আমার সময় নেই। 
আবির অমনি মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে শুরু করল, হ্যালো মাইক টেস্টিং, ওয়ান, টু, থ্রি...।
বড় নেতা আসছেন, তাঁর নামে একজন দু’জন করে ভরে উঠতে লাগল সামনে বিছানো প্লাস্টিকের লাল চেয়ারগুালো। দীনু মল্লিক আবার ফোন করলেন, ওপাশে কিছু শুনে তাঁর মুখ পাংশু, চেঁচিয়ে বললেন, কী হবে রমলা শিকদারকে বলেছিলাম উদ্বোধনী সঙ্গীত গাইতে। তিনি হঠাৎ সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে খুব চোট পেয়েছেন। এখন কাকে পাই গানের জন্য। অ্যাই রন্টে, তোর পিসি তো ভালো গান গান, তাঁকে ফোন কর তো। বল, গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি। এসে একটা গান করেই চলে যাবেন। 
রন্টে বলল, পিসির তো আজ গড়িয়ায় ফাংশন আছে। পাওয়া যাবে না। আপনি সরসিজ রায়কে  ফোন করে বলুন, গাড়ি পাঠালে নিশ্চয়ই আসবেন।
দীনু মল্লিক আবার মোবাইলে ফোন করে কিছু বলে অপেক্ষা করলেন উত্তরের জন্য। পরক্ষণে ফোন কেটে দিয়ে বললেন, এরা সব বড় আর্টিস্ট। বলে কি না আগে থেকে না বললে হয় না। ওদিকে জহরদা গাড়িতে উঠে পড়েছেন।        
রন্টে বলল, কত আর আর্টিস্টদের সাধবেন উদ্বোধনী সঙ্গীত ছাড়াই শুরু করে দিন, দীনুদা। 
দীনু মল্লিক বললেন, না। তা হয় না। দীনু মল্লিকের একটা প্রেস্টিজ নেই জহরদা এসে বললেন, কী দীনু, একজন গানের আর্টিস্ট জোগাড় করতে পারনি! দেখি নিয়তি মজুমদারকে বলে— 
রন্টে বলল, দীনুদা, সব আর্টিস্টের এখন পায়া ভারী। এত দেরিতে ফোন করলে কত অজুহাত দেখাবে, তার চেয়ে বাঁটুলকে বলুন। 
—বাঁটুল, কে বাঁটুল দীনু মল্লিককে বেশ দিশেহারা দেখায়, বললেন, ওদিকে জহরদা আর পাঁচ মিনিটের মধ্যে এসে পৌঁছবেন।  
—ওই যে, সামনের রো-এ বসে। দিনরাত তবলা বাজিয়ে গান করছে। অ্যাই বাঁটুল, শোন—
বাঁটুল হাঁ করে দেখছিল নেতাদের কাণ্ডকারখানা, থতমত খেয়ে উঠে এসে বলল, কী?
—উদ্বোধনী সঙ্গীত গাইতে পারবি?
বাঁটুল বুঝে উঠতে পারছেন না তার সঙ্গে মশকরা করছেন কি না এঁরা। বলল, আমি তো হারমোনিয়াম বাজাতেই শিখিনি। 
—তা হলে খালি গলায় গাইবি। নে ওঠ স্টেজে। 
দীনু মল্লিক বললেন, ও কী গাইবে জহরদা রেগে যাবেন তো!
রন্টে বলল, দীনুদা, নাই মামার চেয়ে বাঁটুলই ভালো। বলে বাঁটুলের কোমরে দু’হাত রেখে উঁচু করে তুলে দিল মঞ্চের উপর। বলল, খালি গলায় গাইবি। যেমন বাজারের মধ্যে গাইতে থাকিস।
রন্টে তখন মঞ্চে উঠে আজকের অনুষ্ঠানের 
কথা বলছে কণ্ঠস্বর ভারী করে। বলল, বাজার–কমিটির নেতা দীনু মল্লিক আছেন মঞ্চে। একটু পরেই এসে পৌঁছবেন অবিসংবাদিত নেতা  জহর পোদ্দার। তার আগে উদ্বোধনী সঙ্গীত গাইছে আমাদের বাঁটুল—।
বাঁটুল বলল, রন্টেদা, আমার নাম বাঁটুল না, সূর্যকুমার দে।
—ও, রন্টে তার কথা সংশোধন করে নিয়ে বললে, উদ্বোধনী সঙ্গীত গাইবে সূর্যকুমার দে।      
 মাইকম্যান তখন বাঁটুলের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে মাইক্রোফোন। বাঁটুল তো থ। মাইক হাতে নিয়ে কখনও গান গায়নি। এখন কি পারবে? কিন্তু তাকে তো আজ পারতেই হবে।
সদা হাসিখুশি বাঁটুল বেশ গম্ভীর হয়ে বলল, এই শোকের দিনে আমি আজ শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইব। বলে শুরু করল—
‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/ তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’
সেই গান গমগম করে ছড়িয়ে পড়ল বহু দূর পর্যন্ত। বাজারের লোকজন কেউ তার গান অ্যামপ্লিফায়ারের মধ্য দিয়ে শোনেনি। সবাই অবাক হয়ে শুনছে। হারমোনিয়াম নেই, তবলা নেই, খালি গলায় সূর্যকুমারের গান শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল শ্রোতারা। তাদের মনে হচ্ছে কোনও বড় গায়ক গাইছেন মঞ্চে। গানের কথাগুলো যেন এই মুহূর্তে তাদেরই কথা। এক আশ্চর্য বেদনা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে সবাইকে। গান শেষ করে চুপ করে রইল বাঁটুল। দর্শকাসন থেকে জোর হাততালি। তার গান শেষ হতে শ্রোতারা চেঁচিয়ে ওঠে, তুই আর একটা গান কর, বাঁটুল। জহরদা এখনও আসেননি।  
কে যেন বলল, ও এখন আর বাঁটুল নয়, সূর্যকুমার দে। 
সূর্যকুমার দে তখন বিভ্রান্ত মঞ্চের উপর বসে। সবার তাগিদে পরের গান ধরল— ‘আমার সকল দুঃখের প্রদীপ জ্বেলে দিবস গেলে করব নিবেদন—/ আমার ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন।...’
সেই গান শুনে আরও মুগ্ধ শ্রোতারা। তার মধ্যে নেতা জহর পোদ্দার গাড়ি হাঁকিয়ে এসে নামলেন মঞ্চের পাশে।  দীনু মল্লিক বললেন, বাঁটুল এবার নাম মঞ্চ থেকে। জহরদা বলবেন।
শ্রোতাদের ভিতর থেকে সমবেত ধ্বনি, না, না, ওকে আরও গান গাইতে দিন। কী সুন্দর গাইছে। জহর পোদ্দারও বললেন, ঠিক আছে, আর একটা গান করুক—।
সূর্যকুমার দে গাইতে শুরু করল, ‘দুঃখ যদি না পাবে তো দুঃখ তোমার ঘুচবে কবে/ বিষকে বিষের দাহ দিয়ে দহন করে মারতে হবে’।  সে–গান শেষ হতে দর্শকাসন থেকে আবার চিৎকার, আর একটা, আর একটা। বক্তৃতা তো অনেক শুনি, আজ শুধু গান—। 
দীনু মল্লিক উশখুশ করছেন, কিন্তু জহর পোদ্দার নেতা মানুষ তিনি জনতার দাবিকে মান্যতা দিলেন, বললেন, সূর্যকুমার আরও গাইবে আজ।
সূর্যকুমার আবার গাইতে শুরু কর ‘দূরে কোথায় দূরে দূরে/ আমার মন বেড়ায় গো ঘুরে ঘুরে।’ জহর পোদ্দার বললেন, বেশ ভালো গায় তো ছেলেটা। কোথায় থাকে? 
সব শুনে বললেন, তাই নাকি আমাদের পাড়ায় গানের স্কুলে একজন পিয়ন লাগবে। স্কুলের দরজা খুলবে, দরজা বন্ধ করবে। ঘর পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখবে। আমি টিচারকে বলে দেব, বিনি–মাইনেয় গান শেখাবেন ওকে। তারপর হয়তো অন্য জায়গা থেকে ডাক পাবে ফাংশনে গান গাওয়ার।
বাঁটুল হতবাক হয়ে শুনছিল নেতার কথা। তাকে আর ভারী ভারী বস্তা বইতে হবে না!
রন্টে চেঁচিয়ে বলল, বাঁটুল, তুই আজ বাঁটুল দি গ্রেট। 
দীনু মল্লিক বললেন, না, না, আজ থেকে তুই আর বাঁটুল নোস। সূর্যকুমার দে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ