Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

অন্দরমহলে বৈশাখী সাজ

নব আনন্দে জেগে ওঠার দিন পয়লা বৈশাখ। এর পর থেকে রোজনামচায় খুব একটা পরিবর্তন হয় না বটে, তবে বৈশাখের পয়লা তারিখ এলেই বাঙালির মনের ভিতর গুনগুন করে শিকড়ের গান।

অন্দরমহলে বৈশাখী সাজ
  • ১২ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

নব আনন্দে জেগে ওঠার দিন পয়লা বৈশাখ। এর পর থেকে রোজনামচায় খুব একটা পরিবর্তন হয় না বটে, তবে বৈশাখের পয়লা তারিখ এলেই বাঙালির মনের ভিতর গুনগুন করে শিকড়ের গান। বাঙালিয়ানা ভরপুর জীবনে এই দিনটি আলাদা মাত্রা বহন করে। বৈশাখী ছোঁয়া লাগে আমাদের পোশাক, ঘরদোর ও খাবারের পাতে। নতুন বছর পরার আগেই তাই পরিকল্পনা শুরু হয়ে যায় গৃহসজ্জার। মনের ঘরকে বহু যত্ন করে ধোয়ামোছা করার কথা লিখেছিলেন কবি। তবে শুধু মনের ঘর নয়, বাসস্থানের জায়গাটিকেও ধুয়েমুছে সুন্দর করে রাখার সময় আসন্ন। 

Advertisement

গৃহসজ্জা উৎসবে নতুনত্বের ছোঁয়া এনে দেয়। পরিপূর্ণতা দেয় গৃহস্থের শখে। তাই এই বিশেষ দিনে ঘর সাজিয়ে তুলতে পারেন বাঙালিয়ানায়। নিজের বসার ঘর বা ডাইনিং রুমে আনতে পারেন বৈচিত্র্য। কেমন করে? রইল বিশেষজ্ঞ অন্দরসজ্জাবিদদের পরামর্শ। 
রঙিন ঘরদোর
ঘর সাজানোর প্রাথমিক শর্ত তার অন্দরের খোলনলচে বদলে ফেলা। কিন্তু তার মানেই তো পকেটে একগাদা চাপ! কিন্তু বুকপকেট সামলেও ঘরের ভিতরের সাজে আনতে পারেন বদল। যদি মনে করেন, রং কিছু কিছু জায়গায় নষ্ট হয়ে গিয়েছে, রঙের কথা ভাবা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে চোখের আরাম দেয় এমন রং বেছে নিন। ঘরের ক্ষেত্রফল কত তার উপর রং কতটা প্রয়োজন, তা নির্ভর করবে। কোন সংস্থার রং নির্বাচন করছেন, তার উপর নির্ভর করবে খরচ। তবে রং না করতে চাইলে মন দিন সাজানোর অন্যান্য দিকগুলিতে। 
দেওয়াল কথা
এই বৈশাখে মাটির নানা শোপিস, প্রদীপ, নকশি কাঁথা এগুলি ব্যবহার করুন সুযোগ মতো। দেওয়ালের সাজে ব্যবহার করতে পারেন বাঙালিয়ানা উসকে দেওয়া কোনও বড় ছবি বা ছৌ নাচের মুখোশ। বরফি আকারে বড় নকশি কাঁথাকে কাঠের বাইন্ডারে বাঁধিয়ে রাখতে পারেন দেওয়ালে। ব্যবহার করতে পারেন বাঁশ বা বেতের তৈরি ট্রে। বিশাল আকারের লেসের কাজ করা হাতপাখাও দেওয়ালের বিকল্প সাজ হতে পারে। দেওয়াল আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পিতলের নকশাকাটা বিশাল থালা বা পিতলের উপর মীনা করা কাজ খোদাই করা থালাও টাঙাতে পারেন দেওয়ালে। আর ছবির শখ থাকলে বাংলার জনপদের কথা উঠে আসে এমন কোনও পেইন্টিং রাখতে পারেন দেওয়াল-ভাবনায়।
তাক ও মেঝের যত্ন
 ঘরের তাক বা কোনাগুলো সাজিয়ে তুলুন ডোকরার কাজ, মাটির শোপিস, বাঁকুড়ার ঘোড়া কিংবা বই দিয়ে। বাহারি আলোর বাতিদান রাখুন তাক ঘেঁষেই। এবার নজর দিন মেঝের দিকে। এই দিনটিতে অনেকেই বাড়িতে ছোট করে পুজোআচ্চা সারেন। ফলে আলপনা দিয়ে মেঝের সাজ এইদিনের জন্য যথার্থ। যদি তেমন পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে মেঝেয় কার্পেটের বদলে পেতে দিন নকশা কাটা ফরাস, শতরঞ্চি বা শীতলপাটি। ঘরের কোণে একটা ছোট ডিভান রেখে, তার ধার ঘেঁষে নানা রঙিন কুশন রাখুন। ডিভানের উপর পেতে দিন বাংলার মাদুর বা নরম সুতির চাদর, যার ছাপাটি বাংলার সংস্কৃতির কথা বলে। ঘরে বৈঠকী আড্ডার পরিবেশ রাখতে কয়েকটি গদিওয়ালা মোড়া, ছোট বেতের চেয়ার, বেতের সেন্ট্রাল টেবিল বা কাঠ, কাচ ও বাঁশ মিলিয়ে তৈরি নকশাদার টেবিলও রাখতে পারেন। ঘরের চার কোণে চারটি বাহারি ফুলের গাছ রাখুন।  
পর্দাপ্রথা
 ঘরের পর্দায় হালকা কোনও রং বাছুন। সাদার উপর নকশাকাটা পর্দা, কাঁথাকাজ বা লেসের কাজের ভারী পর্দা বাঙালিয়ানাকে ফুটিয়ে তুলবে। দেওয়ালের রঙের সঙ্গে খাপ খাইয়ে পর্দা কিনুন। পয়লা বৈশাখ কিন্তু গরমের মরশুম, তাই পর্দার রং হালকা রাখলে ঘর ঠান্ডা থাকবে।
আলোর দুনিয়া 
আড্ডা যদি সন্ধেবেলা হয়, তাহলে আলোর কথা আলাদা করে ভাবতে হবে বইকি! এদিনের জন্য আলোর সাজ একটু ভিন্ন রকমের হোক। ফিরিয়ে আনুন বাঙালি আমেজ। ইদানীং এলইডি টুনি হ্যারিকেনের মধ্যে পাওয়া যায়। অনলাইন ছাড়াও বাংলার বাহারি নানা দোকানে এমন ল্যাম্প পাবেন। হ্যারিকেনের মোড়কে ল্যাম্প না পেলে রংচঙে বাহারি ল্যাম্প শেড বাছতে পারেন। ঘরের একটি কোণকে বেছে সেখান থেকে তিন-চারটি ল্যাম্পশেড ঝুলিয়ে দিন। প্রথমটি সিলিং থেকে সাড়ে সাত ফুট, পরেরটি সাত ফুট, তার পরেরটি সাড়ে ছ’ফুট ও শেষেরটি ছ’ফুট নীচে ঝুলিয়ে দিন। সাদা মিহি আলোর বিকল্প হয় না, তাই মূল আলোটি এলইডি বাল্বের সাদা রঙের হলেও ল্যাম্পের আলোতে নীল, হলুদ বা সবুজ রং ব্যবহার করতে পারেন। 
ফুলেল ঘর
বাঙালিয়ানায় ঘর সাজালে ফুল দিয়ে অন্দরসজ্জার কথা আলাদা করে মাথায় রাখতে হবে। বাড়ি লাগোয়া বাগান থেকে একসময় বাঙালি বেল, টগর, জুঁই, বোগেনভিলিয়ার দল দিয়ে অতিথিদের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করত। নিজেদেরও মন ভালো হতো এসব ফুলে। আজ ঘরে ঘরে বাগান অতীত। চৌখোপের ফ্ল্যাটে বাগানবিলাসের জায়গাও অনেকের কম। তবু ফুল দিয়ে ঘর সাজানো এখনও বড় আকর্ষণীয়। সারাবছর নানা হস্তশিল্প মেলায় বাঁশের উপর খোদাই করা বাহারি কাজের ফুলদানি বা মাটির নকশার ফুলদানি পাওয়া যায়। হাতের কাছে তেমন কিছু না থাকলে কাঁসা, তামা বা পিতলের ফুলদানি ব্যবহার করুন। তাতে সাদা ফুল রেখে ঘর সাজাতে পারেন। তবে বেতের ফুলদানিতে আসল ফুল রাখলেও জল দিয়ে রাখবেন না, তাতে বেত পচে যেতে পারে। বাড়ির প্রবেশপথে বা সদর দরজার দুই প্রান্তে পোর্সেলিনের বড় ফুলদানি বসাতে পারেন। তাতে গাছসুদ্ধ অর্কিড বা পাতাবাহার গাছ বসাতে পারেন। অথবা ঘরের সামনে বড় মাটির বা ধাতুর পাত্রে জল ঢেলে তাতে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়েও অতিথি আপ্যায়ন করতে পারেন। 
খাবার পরিবেশন
 অতিথিদের খাবারের পাত্র থেকে শুরু করে পরিবেশনের পাত্র সবেতেই রাখুন বাঙালিয়ানার ছোঁয়া। আড্ডার সময় ভাজাভুজি খাওয়ার জন্য ছোট ছোট বেতের পাত্র বা মাটির বাটি ব্যবহার করতে পারেন। ডাইনিং হল-এ খাবার পরিবেশনের সাজে বাঙালিয়ানা অটুট রাখুন। টেবিল সাজানোর ক্ষেত্রে রঙিন পাটের তৈরি ‘টেবিল রানার ম্যাট’ ব্যবহার করুন। মাদুরকাঠির বাহারি রানার ম্যাটও আজকাল পাওয়া যায়। চেনা টেবিলের সাজ বদলে দিন। টেবিলের মাঝে ছোট একটি ফুলদানি রাখুন। মাটির বাসনপত্র, বাঁশ বা বেতের তৈরি ট্রে ব্যবহার করুন। 
শোওয়ার ঘরের সাজ
বিছানার চাদর ও পিলো কভারের দিকে দিতে হবে বাড়তি নজর। এই দু’ক্ষেত্রে ব্যবহার করুন উজ্জ্বল রং। বিছানার চাদর বা পর্দার কাপড়ের ওপর বাঙালি ঐতিহ্য ও লোকশিল্পের নানা মোটিফ রাখতে পারেন। কাপড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে আদ্দি, খাদি, ইক্কত, সুতি বেছে নিতে পারেন।
অন্যান্য ঘরের দেখভাল
ঘরের অন্দরের সঙ্গে মানানসই করে সাজিয়ে তুলুন বাথরুম ও রান্নাঘরকেও। মডিউলার কিচেন না হলেও ক্ষতি নেই। রান্নাঘরের প্রবেশপথে থাক নকশাকাটা গালচে বা বাহারি কাপড়ের পাপোশ। মশলাদানি থেকে শুরু করে বাসনের তাক সবেতেই থাক বাঙালিয়ানা। পিতল-তামা-কাঁসা বা মাটির বাসনপত্র ব্যবহার করুন। মশলাদানিগুলি মাটির হলে মন্দ হয় না কিন্তু! বাথরুমের তোয়ালের বদলে বাংলার বড় গামছা থাকুক নববর্ষের দিনে। ইদানীং গামছা আকারের সুতির কাপড়ে নানা বাহারি সুতোর কাজ দেখা যায়। সেসবও গামছা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। বেতের বা মাটির বাথরুম সেট-এ সাজিয়ে রাখুন তেল-সাবান, শ্যাম্পু সহ প্রয়োজনীয় উপাদান। এভাবেই বাঙালিয়ানা ফিরে আসুক আপনার অন্দর ও হৃদয় জুড়ে।
মনীষা মুখোপাধ্যায়

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ