Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আওয়ামির ভোটবাক্সেই নজর

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে দানা বাঁধা প্রবল জনবিক্ষোভের জেরে ২২ মাস আগে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে আওয়ামি লিগ। দলনেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রিত্বে ইস্তফা দিয়ে দেশ ছেড়েছেন।

আওয়ামির ভোটবাক্সেই নজর
  • ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে দানা বাঁধা প্রবল জনবিক্ষোভের জেরে ২২ মাস আগে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে আওয়ামি লিগ। দলনেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রিত্বে ইস্তফা দিয়ে দেশ ছেড়েছেন। এমনকি, সুযোগ বুঝেই মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষণা করেছে মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্যবাহী আওয়ামি লিগকে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামি লিগ সমর্থকদের বড়ো অংশই ভোট দিতে চলেছেন মুক্তিযুদ্ধ সমর্থনকারী আর এক রাজনৈতিক দল বিএনপিকে। এমনই দাবি, ‘আনকভারিং দ্য পাবলিক পালস: ফাইন্ডিংস ফ্রম আ নেশনওয়াইড সার্ভে’ শীর্ষক জনমত সমীক্ষার। ‘কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ এবং ‘বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজ যৌথভাবে এই সমীক্ষা করেছে। তার ফল জানাচ্ছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামি লিগকে ভোট দিয়েছিলেন, এমন ৪৮.২ শতাংশ ভোটার এবার বিএনপিকে ভোট দেবেন। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তি জামাতে ইসলামি (জামাত নামেই যা পরিচিত) পেতে পারে ২৯.৯ শতাংশ আওয়ামি লিগ ভোটারের সমর্থন। ওই জনমত সমীক্ষার দাবি, আওয়ামি লিগের সমর্থনকারী ভোটারদের ৬.৫ শতাংশ এবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের একাংশের তৈরি নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টিকে (এনসিপি) ভোট দেবেন। প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া ওই আন্দোলনের জেরেই ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন হাসিনা। সেই আন্দোলনের অন্যতম ‘মুখ’ নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনত আবদুল্লার মতো ছাত্রনেতারা পরবর্তীকালে এনসিপি গড়েন। এবার সেই তথাকথিত ‘বিপ্লবীরা’ জামাতের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে ভোটে লড়ছেন। যদিও এখনো কোনো সমীক্ষায় তাদের তেমন কপাল খোলেনি!

Advertisement

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন একই সঙ্গে হবে জুলাই সনদ নিয়ে গণভোটও। মজার কথা, যে দলকে নিয়ে নয়াদিল্লির দুশ্চিন্তা রয়েছে সেই জামাতে ইসলামি তাদের নির্বাচনি ইস্তাহারে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্কের কথা জানিয়েছে। তাদের ইস্তাহারের পাতায় পাতায় ভারতীয় ছবি ব্যবহার করেছে। তাতে পাকিস্তানের নামগন্ধও নেই। অন্যদিকে বিএনপি তাদের ইস্তাহারে দুর্নীতি দমন এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। বিএনপি-র বক্তব্য, দুর্নীতির বিষয়ে কোনো সমঝোতা নয়। দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য পদ্ধতিগত ও আইনের সংস্কারের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপি বা জামাতের ইস্তেহারে আশাপ্রদ কথা থাকলেও জীবন-জীবিকা-সম্পদ ও সম্ভ্রম নিয়ে তাদের উদ্বেগ কাটছে না বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ। পরিষদ আরও বলছে, এই উদ্বেগ ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিরুৎসাহিত করতে পারে। সম্প্রতি তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই নিরুৎসাহের দায় নিতে হবে সরকার, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলিকে। পরিষদের বক্তব্য, নির্বাচনের আর নামমাত্র দিন বাকি। এখনো গত বছরের মতো সাম্প্রদায়িক হিংসা অব্যাহত। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম ২৭ দিনে সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে ৪২টি। এর মধ্যে হত্যার ঘটনা ১১টি। এই নির্বাচনে অধিকাংশ দলই আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের প্রার্থী করেনি। বড়ো দলগুলি এক্ষেত্রে বেশি পিছিয়ে। এবারে সংখ্যালঘু প্রার্থী ৭৯ জন। এর মধ্যে আদিবাসী প্রার্থী সম্ভবত জনা ১৫। তৃতীয় লিঙ্গের একমাত্র প্রার্থীটিও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। আদিবাসী ও সংখ্যালঘু প্রার্থীরা অধিকাংশই ছোটো ছোটো দলের। গত দেড় বছরে জামাত সহ কিছু দলের নারীবিদ্বেষী প্রচার এত বেশি ছিল যে, নারীদের মোটামুটি সাবহিউম্যানের পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলির অধিকাংশেরই (জামাত সহ ৩০টি দল) কোনো মহিলা প্রার্থী নেই। নির্বাচনে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দলের মধ্যে বিএনপিও মহিলা প্রার্থী রেখেছে মাত্র ১০ জন, অর্থাৎ তাদের মোট প্রার্থীর মাত্র ৩ শতাংশ। ফলে নির্বাচনে মনোনয়ন, কর্মঘণ্টা, ফ্যামিলি কার্ড— নারী ইস্যুতে বিএনপি ও জামাতের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবসম্মত, সেই প্রশ্ন উঠেছে তাদের ইস্তাহার ঘিরেই।
এসবের মধ্যেও বিএনপি-র সমর্থন তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বেড়েছে। খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং তারেকের দেশে প্রত্যাবর্তন পরবর্তী পরিস্থিতি অনুঘটকের কাজ করেছে। তারেক প্রকাশ্যে বলছেন, ‘আজ যদি একটি দলকে নিষিদ্ধ করা হয়, তা হলে আগামী কাল আমার দলকেও নিষিদ্ধ করা হবে না, এমন নিশ্চয়তা কোথায়?’ একইসঙ্গে, ভারতের প্রতি বৈরী মনোভাব নিয়ে চললে আখেরে যে বাংলাদেশের ক্ষতি তা বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন বিএনপি-র চেয়ারম্যান। ফলে আগে যে আওয়ামি সমর্থকরা নির্বাচন নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন, তাঁরাও বিএনপি-কে বেছে নিতে শুরু করেছেন। এমনকি, জামাত বা এনসিপি-র অনেক সমর্থকও বিএনপি-র দিকে ঘুরে গিয়েছেন। ‘পিপল্‌স ইলেকশন পাল্‌স সার্ভে’-র সমীক্ষা জানাচ্ছে, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেই দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেখছেন বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ মানুষ। তার ধারেকাছে নেই জামাত, এনসিপি। আর এটা বুঝেই, ভোটের শেষ বেলায় জামাত নেতারা ধর্মনিরপেক্ষ, নারীবাদী, শান্তির মুখোশ পড়তে চাইছেন। ভারত-বিরোধিতার সুর বদলে বন্ধুত্বের বার্তা দিতে চাইছেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ