১৯ এপ্রিল, ১৯৭৫। রাশিয়ার একটি ছোট মিলিটারি শহর। সকালে কনকনে ঠান্ডা। সেই ঠান্ডাতেও উত্তেজনায় ঘামছেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা। দিন চল্লিশের পরিশ্রম সার্থক হবে তো? শুরু হয়ে গিয়েছে কাউন্টডাউন। হঠাৎই বিজ্ঞানীরা শুনলেন, একজন রাশিয়ান চিৎকার করে বললেন, ‘পায়াক্কালি।’ রুশ দেশে এই শব্দটি খুবই জনপ্রিয়। প্রথম মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগারিন মহাকাশে যাওয়ার প্রাক মুহূর্তে এই শব্দটি বলেছিলেন। এর মানে, ‘লেট আস গো’ অর্থাৎ চল যাই। মুহূর্তের মধ্যে মহাকাশের পথে রওনা দিল ভারতের নিজের তৈরি প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ ‘আর্যভট্ট’। সেই সফল উৎক্ষেপণের পর অর্ধশতাব্দী কেটে গেল। ৫০ বছর পরে আজ ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর মুকুটে অসংখ্য পালক। এখনও পর্যন্ত ১৩১টি উপগ্রহ তৈরি করেছে ইসরো। যার মধ্যে ৫১টি এখনও পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরছে।
ভারতীয় মহাকাশ গবেষণার জনক বিক্রম সারাভাই। ইসরোর প্রতিষ্ঠাতা। ভারতীয়রাও যে উপগ্রহ তৈরি করতে পারে, সেটি তিনিই প্রথম ভেবেছিলেন। প্রথমে ঠিক ছিল আমেরিকার সাহায্যে এই উপগ্রহ উৎক্ষেপণ করা হবে। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে রাশিয়ার কাছ থেকে সহযোগিতা করার প্রস্তাব পান। সেই প্রস্তাবপত্র বিক্রম সারাভাইকে পাঠিয়ে দেন ইন্দিরা। প্রস্তাবে সাড়া দিতে দেরি করেননি তৎকালীন ইসরো প্রধান। রুশ রাষ্ট্রদূত নিকোলাই পেগভের সঙ্গে বৈঠকে বসতে বলেন প্রফেসর রাওকে। সেই বৈঠকেই প্রফেসর রাও প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে প্রেজেন্টেশন দিলেন। সব শুনে রাষ্ট্রদূত শুধু জিজ্ঞেস করলেন, চীনের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহের ওজন কত ছিল? প্রফেসর রাও বললেন, ১৯০ কেজি। রুশ রাষ্ট্রদূত বললেন, ভারতেরটি এর থেকে বেশি ওজনের হওয়া চাই। তবে ওজন যাই হোক, আমরা উৎক্ষেপণ করব।
শুরু হল উপগ্রহ তৈরির প্রথম পর্যায়। কিন্তু শুরুতেই বিপর্যয়। ডিসেম্বরে এক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন বিক্রম সারাভাই। ইসরোর অন্তর্বর্তী চেয়ারম্যান হলেন এম জি কে মেনন। হাল ধরলেন অধ্যাপক মেনন। বিক্রম সারাভাইয়ের স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিরুবনন্তপুরমে রুশ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে চূড়ান্ত আলোচনা হল। এরপর অধ্যাপক রাওয়ের কাজ ছিল এস্টিমেট করা, কত খরচ হবে। মোটামুটি তিন কোটি টাকার প্যাকেজ ধরা হল। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সব শুনে বললেন, ঠিক আছে। এগিয়ে চলুন। কাজ শুরু হল দ্রুত। ১৯৭২ সালের ১০ মে। ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হল ভারত ও রাশিয়ার। ভারতের পক্ষে সই করলেন অধ্যাপক মেনন। ঠিক হল ভারতের তরফে প্রকল্পের নেতৃত্বে থাকবেন প্রফেসর রাও। আর রাশিয়ার তরফে কোভতুনেঙ্কো।
তখনও কৃত্রিম উপগ্রহের নাম ঠিক হয়নি। কোথায় এই স্যাটেলাইট তৈরি হবে, সেটিও ঠিক হয়নি। প্রাথমিকভাবে ঠিক হল বেঙ্গালুরু অথবা হায়দরাবাদের মধ্যে কোনও এক জায়গায় এই কাজ শুরু হবে। ভারতের দুই শহরের লড়াইয়ে জয় হল বেঙ্গালুরুর। কর্ণাটক সরকার সবরকম সহায়তার প্রস্তাব দিল ইসরোকে। কাজের জন্য বেছে নেওয়া হল কর্ণাটকের পীন্যা শহরকে। প্রফেসর রাওয়ের প্রস্তাব মতো ৫ হাজার বর্গফুটের চারটি টিনের শেড দেওয়া ঘর তৈরি করে দেওয়া হল। সেখানেই গড়ে তোলা হল ল্যাব। ১৯৭২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, গণেশ চতুর্থীর দিন ওই ঘরগুলির উদ্বোধন হল। ডিজাইন অনুযায়ী উপগ্রহের নানাবিধ পার্টস খুঁজে বের করতে আমেরিকা ও ইউরোপ সফর করল রাওয়ের নেতৃত্বাধীন টিম। কাজ এগচ্ছিল ভালোই। কিন্তু বিপদ এল অন্য জায়গায়।
১৮ মে, ১৯৭৪। রাজস্থানের পোখরানে বুদ্ধ হাসল। অর্থাৎ প্রথম পরমাণু বিস্ফোরণ (স্মাইলিং বুদ্ধ) ঘটাল ভারত। ব্যস, জারি হয়ে গেল মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। উপগ্রহ তৈরির গোটা প্রক্রিয়াই থমকে গেল। হতাশ হননি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। ১১ জুলাই তিনি পীন্যায় পৌঁছলেন। উৎসাহ দিলেন বিজ্ঞানীদের। দেখলেন যাবতীয় কাজ। সব দেখে শুনে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল প্রধানমন্ত্রীর। বিজ্ঞানীদের বললেন, এটি শুধু একটি যন্ত্র নয়। এটি বিজ্ঞানের জগতে ভারতের একটি দৃঢ় পদক্ষেপ। যে কাজ দ্রুত শেষ হতে পারত, আমেরিকার বাধায় তা কিছুটা পিছিয়ে গেল। কিন্তু ভারতীয় বিজ্ঞানীদের অদম্য উৎসাহে একসময় শেষ হল উপগ্রহ নির্মাণের কাজ।
১৯৭৫ সালের মার্চ মাস। প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা ঠিক করলেন, উপগ্রহের একটা নাম তো দিতে হবে। কী নাম দেওয়া যায়। অনেক আলোচনা করে তিনটি নাম ভাবা হল। প্রথম নাম ‘আর্যভট্ট’। গুপ্তযুগের ভারতীয় জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে সম্মান জানাতেই ভাবা হল ওই নাম। প্রস্তাবিত দ্বিতীয় নামটি হল ‘মৈত্রী’। ভারত-রাশিয়ার যে মৈত্রীর বন্ধনে এই কাজ এগিয়েছে, তাকে সম্মান জানাতেই ওই নাম। তৃতীয় নামের প্রস্তাব এল ‘জওহর’। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে শ্রদ্ধা জানাতে ওই নামটি ভাবা হল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে ওই তিনটি নামের প্রস্তাব নিয়ে গেলেন ইসরোর বিজ্ঞানীরা। সব দেখে ‘আর্যভট্ট’ নামেই সায় দিলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রফেসর রাও এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমাদের প্রত্যাশাই ছিল ইন্দিরাজি আর্যভট্ট নামই বেছে নেবেন। ঠিক হল, আর্যভট্ট উৎক্ষেপণকে স্মরণ করে একটি স্ট্যাম্প প্রকাশ করা হবে। ২ টাকার নোটেও আর্যভট্টের ছবি থাকত।
৩৫৮ কেজি ওজনের ২৬ মুখের এই বহুমাত্রিক কৃত্রিম উপগ্রহটি উৎক্ষেপণের পাঁচ দিনের মাথাতেই স্তব্ধ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সেটির জীবন আর ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। যদিও আর্যভট্টর মূল কাঠামোটি সক্রিয় ছিল ১৯৮১ সালের মার্চ পর্যন্ত। উৎক্ষেপণের ১৭ বছর পরে ১৯৯২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ফিরে আসে ভারতের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ। ভারতের আগে ১০টি দেশ মহাকাশে উপগ্রহ পাঠিয়েছিল। আর্যভট্ট পাঁচদিনের মাথায় থেমে গেলেও এর সাফল্যকে খাটো করা যায় না। ওই ঘটনার ৫০ বছর পরে আজ মহাকাশ গবেষণায় ইসরো বিশ্বের প্রথম সারির নাম। চাঁদ থেকে শুরু করে মঙ্গল গ্রহে সফল অভিযান হয়েছে। সূর্যের অভিমুখেও সফল আদিত্য মিশন সম্পন্ন হয়েছে। যোগাযোগের উন্নতিতে পাঠানো হয়েছে ইনসাট সিরিজের একের পর এক উপগ্রহ। পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণে মহাকাশে গিয়েছে কার্টোস্যাট উপগ্রহ। এখন আবহাওয়া থেকে শুরু করে নজরদারি— ইসরোর উপগ্রহের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বিক্রম সারাভাই মহাকাশ গবেষণায় ভারতকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দেশে পরিণত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন প্রফেসর রাও। ভারত যে মহাকাশ গবেষণায় সাফল্য দেখাবে, সেটিই বিশ্বের অগ্রগণ্য দেশগুলি ভাবতে পারেনি। সেই কাজটাই করে দেখিয়েছিলেন ইসরোর সেদিনের বিজ্ঞানীরা। আজও সমানভাবে সেই কাজ করে যাচ্ছেন। ইসরোর অভিযানের খরচ অন্য যে কোনও দেশের অভিযানের থেকে কম। একসময় রাশিয়ার সাহায্যে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়েছিল ভারত। এখন ভারত অন্য দেশের স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠায়। আর্যভট্ট উৎক্ষেপণের ৫০ বছরে এই বিবর্তনের সাক্ষী দেশ। সেই ক্ষণটি আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।