নিজস্ব প্রতিনিধি, কুমারডিহি (পাণ্ডবেশ্বর): সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় রহস্যজনক ঘটনাকে ঘিরে তোলপাড় শিল্পাঞ্চল। রহস্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পাণ্ডবেশ্বর থানার কুমারডিহি। গ্রামে ঢুকতেই ডিহি পার্ক। এলাকার সাংস্কৃতিক ও বিনোদনের কেন্দ্রস্থল বলে পরিচিত। সেই পার্কের পিছনেই জঙ্গল লাগোয়া এলাকা থেকে মিলেছে সাড়ে চার মাস ধরে নিখোঁজ থাকা নাবালিকা যমজ বোনের পোশাক। পাশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছিল খুলি সহ হাড়গোড়। জনহবহুল এলাকা না হলেও পারিবারিক পিকনিক থেকে বন্ধুদের মধ্যে বনভোজন লেগেই থাকে সেখানে। গবাদি পশু চরাতেও বহু মানুষের আনাগোনা দেখা যায়। অথচ, সেখানে দু’টি দেহ চার পড়ে থাকল, কেউই জানতেও পারল না! তার চেয়েও বড় কথা, দেহ পচনের গন্ধও কারও নাকে আসেনি! বিষয়টি বেশ ভাবাচ্ছে পুলিসকে। যদিও উদ্ধার হওয়ার হাড়গোড়, মাথার খুলি নিখোঁজ যমজ বোনের কি না, তা রবিবার রাত পর্যন্ত নিশ্চিত নন তদন্তকারীরা। আজ, ফরেন্সিক টিম এলাকায় আসবে। হাড়গোড়ের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করবে। তার পরেই যমজ বোনের নিখোঁজ রহস্যের কিনারা হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে, উদ্ধার হওয়া পোশাকগুলি দুই বোনের বলে শনাক্ত করার পর তদন্তকারীদের অনুমান, দুই বোনকে কেউ বা কারা খুন করে ওই পার্ক লাগোয়া জঙ্গলে ফেলে দিয়ে গিয়েছে। আপাতত, পুরো এলাকা ঘিরে পাহারা দিচ্ছে পুলিস। চাপা আতঙ্ক গ্রামজুড়ে।
রবিবার কুমারডিহি গিয়ে দেখা গিয়েছে, ঘটনাস্থলে অস্থায়ী পুলিস ক্যাম্প বসেছে। বিস্তীর্ণ এলাকা ঘিরে দেওয়া হয়েছে। যাতে ফরেন্সিক দল প্রয়োজনীয় নমুন সহজেই সংগ্রহ করতে পারে। যে মাঠ থেকে দুই বোন হারিয়ে গিয়েছিল, সেই মাঠেও বসানো হয়েছে পুলিস পিকেট। ঘনঘন টহল দিচ্ছে পুলিস ভ্যান। টান টান উত্তেজনা গ্রামজুড়ে। হারিয়ে যাওয়া ইস্তক দুই বোনকে খুঁজতে পুলিসের চেষ্টার অন্ত ছিল না। দু’জনের ছবি নিয়ে দূর দুরান্তে তদন্তে গিয়েছিল পুলিস। অণ্ডাল স্টেশনেও তাদের মতো যমজবোনের দেখা গিয়েছিল বলে পুলিস সূত্রে সেই সময়ে দাবি করা হয়েছিল। পুলিস কুকুর দিয়ে এলাকার তদন্ত করা হয়। এত কিছুর পরও কোনও সূত্র পায়নি পুলিস। শেষে গ্রামের অদূরেই যমজ বোনের পোশাক ও মানব দেহের কঙ্কাল উদ্ধারের ঘটনায় তাজ্জব দুঁদে তদন্তকারী থেকে শুরু করে স্থানীয় বাসিন্দারা।
দু’বোনের নিখোঁজের পর তদন্ত করতে নেমে পরতে পরতে রহস্যের গন্ধ পায় পুলিস। গত বছর ১ ডিসেম্বর বাড়ির অদূরে ফুটবল মাঠ থেকে নিখোঁজ হয়ে যায় তারা। সকালে তাদের সঙ্গে গ্রামের এক যুবককে খেলতে দেখা যায়। নিখোঁজের পরদিন ওই মাঠ থেকেই যুবকের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। তা নিয়ে রহস্য ঘনীভুত হয়। পুলিসের দাবি ছিল, দেনার দায়েই ওই যুবক সম্ভবত আত্মহত্যা করেছিলেন। কিন্তু, চার মাস পর দুই বোনের পোশাক উদ্ধারের ঘটনায় যুবকের ‘আত্মহত্যা’র ফাইলও নতুন করে আতস কাচের তলায় ফেলতে হচ্ছে পুলিসকে। নিখোঁজ হওয়ার আগে একমাত্র ওই যুবকের সঙ্গে শেষবার দেখা গিয়েছিল নাবালিকা যমজ বোনের। তা হলে কি যুবকের রহস্য মৃত্যুর পিছনেও যমজ বোনের নিখোঁজ রহস্যের কোনও যোগসূত্র রয়েছে? উত্তর খুঁজতে মরিয়া পুলিস।
এদিন দুই বোনের মামার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দিদা মন্দিরা বাউরি ও মামা অভিজিৎ বাউরি ইতস্তত পায়চারি করছেন। তাঁরা বলছিলেন, ‘ওই পোশাকগুলি পরেই শেষ বারের জন্য খেলতে বেরিয়েছিল দু’বোন। আমাদের প্রথম থেকেই সন্দেহ, মৃত যুবক ওদের নিখোঁজের বিষয়ে কিছু জানত। যদি যমজ বোনকে ওখানেই খুন করা হয়ে থাকে, তা হলে এতদিন কেন মানুষের নজরে এল না?’ প্রশ্ন তুলেছেন দিদা ও মামা। পার্ক পরিচালন কমিটির সম্পাদক অরুপ ভট্টাচার্য বলেন, ‘মেয়েগুলি নিখোঁজ হওয়ার পর পার্কে একাধিক অনুষ্ঠান হয়েছে। প্রায়ই গমগম করত এলাকাটি। এখনও করে। অনেক সময়ে পিছনের গাছে ঘেরা এলাকায় মানুষ ঘোরাফেরা করে। অথচ, কারও নজরে পড়ল না!’ পুলিসেরও বক্তব্য, ‘শুধু পার্ক নয়, পাশের ফাঁকা অংশে পিকনিক করারও একটি প্রবণতা রয়েছে। এখানে খুন করে দেহ রাখা থাকলে দুর্গন্ধ বের হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কেউ সেই গন্ধ পেল না! স্থানীয় একটি সূত্রে মনে করছে, যমজ বোনকে খুন করে দেহগুলি মাটির নিচে পুঁতে দেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি বৃষ্টিপাতের জেরে হাড়গোড় বেরিয়ে এসেছে। সেগুলি কুকুর বা শেয়াল টানাটানি করার জন্য বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনাস্থল ঘিরে রেখেছে পুলিস।-নিজস্ব চিত্র