সমীর সাহা, নবদ্বীপ: আজ অক্ষয় তৃতীয়া। বৈষ্ণব পঞ্জিকা মতে অক্ষয় তৃতীয়া হচ্ছে ‘সত্যযুগাদ্যা’। শাস্ত্র অনুসারে, সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর এবং কলি, এই চার যুগ চক্রাকারে আবর্তিত হয়। তার মধ্যে সত্য যুগ হল সর্বশ্রেষ্ঠ। সত্য সংকল্প, সত্যনিষ্ঠা, সত্যব্রত এই যুগের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বিশ্বাস, এমনই এক অক্ষয় তৃতীয়া তিথিতে সত্যযুগের শুভারম্ভ হয়েছিল। গঙ্গা নদীও এই তিথিতেই কৈলাস থেকে মর্ত্যে অবতরণ করে।
মহাভারতে বলা হয়েছে, এই তিথিতে স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দ্রৌপদীকে অক্ষয় পাত্র প্রদান করেছিলেন। ঘটনাটা এরকম, পঞ্চপাণ্ডব তখন বনবাসে রয়েছেন। যুধিষ্ঠির সূর্যদেবের থেকে প্রার্থনা করে একটি দিব্যপাত্র লাভ করেন। দ্রৌপদীর খাওয়া শেষ না হওয়া অবধি সেই পাত্র ভরা থাকবে। কিন্তু একদিন দ্রৌপদীর ভোজনের পর ঋষি দুর্বাসা শিষ্য সহ সেখানে উপস্থিত হয়ে আতিথ্য গ্রহণ করেন। এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে দ্রৌপদী শ্রীকৃষ্ণের শরণাপন্ন হলেন। শ্রীকৃষ্ণ তখন পাত্রে লেগে থাকা একটি অন্ন মুখে তুলে বলেন, ‘তৃপ্তোষ্মি’। তখনি দুর্বাসা সহ সকল ঋষির পেট ভরে যায়। সেদিন থেকে শ্রীকৃষ্ণের কৃপায় সেই পাত্রের সীমাবদ্ধতা উঠে গেল। সেটি অক্ষয় পাত্রে পরিণত হল।
আবার পুরাণ মতে, ভগবান বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম এই তিথিতেই আবির্ভূত হয়েছিলেন। এই তিথিতেই সুদামা প্রিয় সখা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে দ্বারকা ধামে দেখা করতে গিয়েছিলেন। আবার, পুরীধামে এই তিথিতেই জগন্নাথদেবের রথ তৈরি শুরু হয়। বৈষ্ণবরা এই অক্ষয় তৃতীয়া তিথিতে কষ্টিপাথর নির্মিত বিষ্ণু বিগ্রহের অঙ্গে চন্দন লেপন করে থাকেন। রীতি মেনে নবদ্বীপের বিভিন্ন মঠ-মন্দিরের বিগ্রহেও চলে চন্দন লেপন।
নবদ্বীপ রাধা মদনমোহন মন্দিরের অন্যতম সেবায়েত প্রভুপাদ নিত্যগোপাল গোস্বামী বলেন, অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্যলগ্নে ভারতবর্ষের সমস্ত মন্দিরের বিষ্ণুমূর্তির সর্বাঙ্গে চন্দন লেপন হবে। ইতিমধ্যে সমস্ত মন্দিরেই চন্দন বাটা শুরু হয়ে গিয়েছে। বিষ্ণুমূর্তি বলতে শ্রীকৃষ্ণ, নারায়ণ, নৃসিংহ, শালগ্রাম শিলা। সব থেকে প্রসিদ্ধ হল নারায়ণ মূর্তি। বাকি সমস্ত মূর্তিকে বিষ্ণুর অবতার বলা হয়। যেমন- শ্রীকৃষ্ণ, নৃসিংহদেব, এঁরা সকলেই বিষ্ণুর স্বরূপ। নিত্যানন্দ বংশীয় ধারায় এই তিথিতে শ্রীমতী রাধারানির চরণ দর্শন করা হয়। এই তিথিতে যত দান তত অক্ষয় পুণ্য প্রাপ্তি হয়। কালী, শিব, গণেশ যারই ভক্ত হোক না কেন, এই তিথিতে সমগ্র সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই ব্রত পালন করেন।
নবদ্বীপ গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের মহাসচিব কিশোরকৃষ্ণ গোস্বামী বলেন, অক্ষয় তৃতীয়াকে বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বীরা পূর্ণ দীক্ষার মন্ত্র নেওয়ার দিন হিসাবে বেছে নেন। এই দিনে অনেকে ভিত পুজোও করেন। অনেকে গৃহপ্রবেশ করেন। ‘অক্ষয় তৃতীয়া’ কথার অর্থ এক অমরাক্ষয় পূর্ণ তিথি বা শুভদিন। এই তিথিতে মন্দির প্রতিষ্ঠা থেকে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা, সবকিছুই চলে। এই বিশেষ দিনে নবদ্বীপের বিভিন্ন গঙ্গার ঘাটে কয়েক হাজার ভক্ত-পুণ্যার্থী পুণ্যস্নানে ভিড় করেন। • নিজস্ব চিত্র