Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

প্রাচীন ভারতীয় যুদ্ধাস্ত্র

‘বৈষ্ণবাস্ত্র’ নামটা আমরা পাই মহাভারতে। স্বয়ং নারায়ণের অস্ত্র। কী ছিল তার বৈশিষ্ট্য? লক্ষ্য স্থির করে ছুড়লে নিশ্চিতভাবে সেখানেই আঘাত করবে এবং লক্ষ্যবস্তুকে পুরোপুরি ধ্বংস করবে।

প্রাচীন  ভারতীয়  যুদ্ধাস্ত্র
  • ১১ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

আশিস পাঠক: ‘বৈষ্ণবাস্ত্র’ নামটা আমরা পাই মহাভারতে। স্বয়ং নারায়ণের অস্ত্র। কী ছিল তার বৈশিষ্ট্য? লক্ষ্য স্থির করে ছুড়লে নিশ্চিতভাবে সেখানেই আঘাত করবে এবং লক্ষ্যবস্তুকে পুরোপুরি ধ্বংস করবে। এ যেন আজকের দিনের গাইডেড মিসাইল! আবার ‘নারায়ণাস্ত্র’ নামটা শুনলেই যেমন বোঝা যায়, এটি স্বয়ং নারায়ণের আশীর্বাদধন্য। শ্রীবিষ্ণু নিজেই তা দিয়েছিলেন দ্রোণাচার্যকে। একবার তা প্রয়োগ করলে হাজার হাজার শত্রুকে মারা যেত। ‘ত্বষ্টাস্ত্র’ ছিল এখনকার কেমিক্যাল ওয়েপনের সমগোত্রীয়। ব্যবহার করলে শত্রুপক্ষ সব গুলিয়ে সেমসাইড করে মারা যেত। আর ‘ব্রহ্মাস্ত্র’? এখনকার অ্যাটমিক বোমার সমান। সুদর্শন চক্র দেখলে তো এখনকার এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের কথা মনে পড়বেই। আক্রমণকারীর দিকে তাড়া করবে, তাও ৩৬০ ডিগ্রি কভার করে। কার্যসিদ্ধিও নিশ্চিত।

Advertisement

কুরুক্ষেত্রে যে সব অস্ত্রের উল্লেখ রয়েছে, সে নিয়ে ভাবতে বসলে তাক লাগতে বাধ্য। পানিপথের যুদ্ধে বাবরের কাছে প্রথম কামান দেখেছিল ভারত। তাহলে মহাভারতের যুদ্ধ এত আধুনিক কীভাবে? উত্তর পাওয়া মুশকিল। বেদ এবং বিভিন্ন পুথি থেকে একেবারে বেসিক ধারণাটুকুই পাওয়া যায়। যেমন আমরা জানতে পারি, ‘চপ’ ছিল প্রাচীন ভারতে যুদ্ধের অন্যতম প্রধান উপাদান। এ চপ অবশ্য সে চপ নয়, এর অর্থ বাঁশ। এই চপ থেকেই এসেছে আমাদের ছোটবেলার জ্যামিতির বৃত্ত-চাপ ইত্যাদি পরিভাষা। ধনু তৈরির একটা মুখ্য উপাদান বাঁশ। কিন্তু কেমন বাঁশ? অপক্ক, অতিজীর্ণ, জ্ঞাতি-ঘৃষ্ট দিয়ে হবে না, অন্য বাঁশ দ্বারা ঘৃষ্ট, দগ্ধ, ছিদ্রযুক্ত, গলগ্রন্থি ও তলগ্রন্থিও নয়। নিয়ম ছিল শৃঙ্গের ধনু দিয়ে যুদ্ধ করবে গজারোহী, অশ্বারোহীরা। আর রথী ও পদাতিক বাঁশের ধনু দিয়ে। 
শৃঙ্গের ধনু মানে মোষ, শরভ আর রোহিষ—এই তিন প্রাণীর শিং দ্বারা নির্মিত। রোহিষকে ছাগবিশেষ বলে মনে করেছেন যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি। আর শরভ এক ধরনের মৃগ, যার পরিচয় এখনও রহস্যে ঢাকা। মৃগ মানেই অবশ্য হরিণ ভেবে নেওয়ার কোনও কারণ নেই। সংস্কৃত ভাষার পুরনো অর্থ-সম্বন্ধে ‘মৃগ’ মানে যে কোনও জন্তু, যাদের চলার নির্দিষ্ট পথকে মার্গ বলা হতো। শরভ সেই অর্থে মৃগ। অদ্ভুত মৃগ। একটি সংহিতা বলছে, এর আটটি পা। তার মধ্যে চারটি নাকি উপরের দিকে। শিং লম্বা। উটের মতো উচ্চতা। অরণ্যে থাকে এবং কাশ্মীর দেশে বেশি পাওয়া যায়। তবে জন্তুটির এই আটপেয়ে ব্যাপারটা কল্পনা হওয়াটাই স্বাভাবিক। মহাভারতেও শরভের উল্লেখ আছে—তার মুখ নাকি সিংহের মতো ভয়ানক এবং সে সিংহকেও হারিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি একে বাইসন বলে মনে করেছেন। তাঁর অনুমান, ‘কাশ্মীর দেশের দুর্গম বনাচ্ছন্ন পর্বতে এই মৃগ বাস করিত, এবং যাহারা ইহার শিং আনিয়া বিক্রয় করিত, তাহারা মূল্য বৃদ্ধির অভিপ্রায়ে মৃগ অষ্টপাদ বলিয়া গল্প করিত। অতিশয় দ্রুত ধাবিত হয় বলিয়াও অষ্টপাদ মনে হইয়া থাকিবে।’ শরভের মাংসের উপকারিতার কথা আছে প্রাচীন ভারতের চিকিৎসাবিজ্ঞানের মৌলিক গ্রন্থ সুশ্রুত-সংহিতায়। কবিকঙ্কণ-চণ্ডীতেও শরভের উল্লেখ মেলে। কালিকা-পুরাণে বরাহ ও শরভের যুদ্ধের সবিস্তার বর্ণনা পাওয়া যায়। এহেন আশ্চর্যন্তু শরভের শিং ছিল ধনুক তৈরির মূল্যবান উপাদান। 
প্রাচীন ভারতের অস্ত্রবিজ্ঞানকে বলা হতো ধনুর্বেদ। চার বেদের চার উপবেদ— আয়ুর্বেদ, ধনুর্বেদ, গান্ধর্ববেদ, আর শিল্পবেদ। কারও কারও মতে শিল্পবেদ নয়, তন্ত্রশাস্ত্র। ধনুর্বেদকে যজুর্বেদের উপবেদ বলা হয়েছে। কিন্তু ধনুর্বেদ আবার অনেক রকম। নগেন্দ্রনাথ বসুর বিশ্বকোষ বলছে, ‘পূর্ব্বকালে বহুতর ধনুর্ব্বেদ প্রচলিত ছিল, তন্মধ্যে এখন শুক্রনীতি ও কামন্দকনীতিবর্ণিত ধনুর্ব্বেদ, অগ্নিপুরাণোক্ত ধনুর্ব্বেদ, বৈশম্পায়নোক্ত ধনুর্ব্বেদ, বীরচিন্তামণি, লঘুবীর-চিন্তামণি, বৃদ্ধশার্ঙ্গধর, যুদ্ধজয়ার্ণব, যুক্তকল্পতরু, নীতিময়ূখ প্রভৃতি গ্রন্থে ধনুর্ব্বেদের কথা পাওয়া যায়।’ কিন্তু কোথাও অগ্নিপুরাণে বন্দুক-কামানের নাম নেই। ধূপ বা খ-ধূপ (হাউই)-এর কথা আছে, যোগেশচন্দ্রের মতে যা বন্দুকেরই পূর্বজ। 
তবে অস্ত্রই প্রাচীন ভারতীয় যুদ্ধবিজ্ঞানের প্রধান আলোচ্য নয়। শাসন-নীতির সঙ্গেই জুড়ে ছিল সংগ্রাম-নীতি। কৌটিল্য-অনুসারে সাম, দান, ভেদ, দণ্ড— এই চার উপায়ে রাজার রাজ্যশাসন। সাধুজনের প্রতি সাম, সকলের প্রতি সপৌরুষে দান, পরস্পর ভীত ও সংহতের প্রতি ভেদ এবং উক্ত উপায়ত্রয়ে অদম্যকে দণ্ড প্রয়োগ। বহিঃশত্রুকে শাসন করতেও উপায় এই চারটিই। যোগেশচন্দ্র জানাচ্ছেন, আর সেই কূটনীতির শেষ উপায় যুদ্ধরূপ দণ্ড। পরে অবশ্য ‘মায়া’, ‘উপেক্ষা’ ও ‘ইন্দ্রজাল’— অন্য তিন উপায় এসেছিল। কৌটিল্য ও কামন্দক এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত উপদেশ দিয়েছেন। অগ্নিপুরাণেও তা আছে। মায়া উপায় ভারি আকর্ষণীয়—‘বিপুল উল্কা করিয়া স্থূল পক্ষীর পুচ্ছে বাঁধিয়া রাত্রি-কালে শত্রু শিবিরে ছাড়িয়া দিবে। এইরূপে উল্কাপাত দেখাইবে। বিবিধ কুহক (ইন্দ্রজাল) দ্বারা শত্রুর উদ্বেজন করিবে। রাজা ইন্দ্রজাল দ্বারা দেখাইবেন যে, তাঁহার সাহায্যার্থ দেবতারা চতুরঙ্গ বলে আসিয়াছেন। প্রদর্শনান্তে রিপুর মস্তকে রক্ত-বৃষ্টি এবং প্রাসাদের অগ্রে রিপুর ছিন্ন মস্তক প্রদর্শন করিবেন।’ কামন্দক আবার বলছেন, ‘সুষির দেবতা-প্রতিমা ও স্তম্ভ মধ্যে নর লুক্কায়িত হইয়া এবং রাত্রিকালে পুরুষ স্ত্রী-বস্ত্র পরিয়া অদ্ভুত দর্শন করাইবে। বেতাল, পিশাচ ও দেবতার রূপ ধারণ ইত্যাদি মানুষী মায়া; ইচ্ছানুসারে নানারূপ-ধারণ, অস্ত্র-শস্ত্র-পাষাণ-মেঘ-অন্ধকার-বৃষ্টি-অগ্নি-প্রদর্শন, ছিন্ন-পাটিত-ভিন্ন-সৈন্য-প্রদর্শন ইত্যাদি ইন্দ্রজাল দ্বারা শত্রুর ভয়ের নিমিত্ত উপকল্পনা করিবে।’
যুদ্ধ নিয়ে প্রাচীন ভারত কী বিপুল ভাবনাচিন্তা করেছিল প্রাচীন ধনুর্বেদের নানা পুঁথি তার আশ্চর্য পরিচয় বহন করে চলেছে। এবং বিষয়টা যে একেবারেই দীক্ষিতদের জন্য, সেটাও বারবার বলা হয়েছে। তখন অবশ্য আজকের ফেসবুকীয় বোদ্ধাদের যুগ নয়। কিন্তু তখনও যা ছিল, আজও তাই আছে ভারতীয় আদর্শে— সমস্ত পথ ব্যর্থ হলে শেষ উপায়, যুদ্ধ!  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ