কলম্বাস যখন একটি অজানা ভূখণ্ডে পদার্পণ করেছিলেন, সেই ১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে বৃহৎ অনাবিষ্কৃত রাষ্ট্রটিতে আদিবাসী বাসিন্দা ছিল দেড় কোটির বেশি। ইতিহাসে যাদের বলা হয়েছে ইন্ডিয়ানস। মাত্র ৪০০ বছর পর, উনবিংশ শতকের শেষভাগে তাদের সংখ্যা এসে দাঁড়ায় ২ লক্ষ ৩৮ হাজারে। ততদিনে আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের সঙ্গে সাদা চামড়ার শাসকদের যুদ্ধের গুনতি ১৫০০ ছাপিয়ে গিয়েছে। আমেরিকায় পা রাখা ইউরোপীয়রা প্রথম থেকেই দাবি করেছে, তারা যখন আবিষ্কার করেছে, সেদিন থেকেই এই ভূখণ্ডের জন্ম। অর্থাৎ ইন্ডিয়ান জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব নিছক পশুপাখির মতোই। মানুষ এসেছে ১৪৯২’এর পর।
আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লু বুশ (জুনিয়র) বলেছিলেন, যারা আমেরিকার শত্রু, তারা স্বাধীনতার শত্রু। কিন্তু এহেন আমেরিকা কেন বারবার ঠিক সেইসব দেশকেই আধুনিক, স্বাধীন, করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছে, যারা পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতা? কোনও না কোনও অজুহাতকে সামনে রেখে তাদের হয় আক্রমণ করে, অথবা নিজেদের পুতুল সরকার অথবা বিদ্রোহীদের দিয়ে ধ্বংসের পথেও নিয়ে গিয়েছে। এই রহস্যটা কী?
সিন্ধু, মেসোপটেমিয়া, মিশর—প্রতিটি সভ্যতাই খ্রিস্টপূর্ব সময়কালের। হাজার হাজার বছরের পুরনো। এটা কি নিছকই কাকতালীয় যে এইসব সভ্যতা যেখানে গড়ে উঠেছিল, সেই আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, মিশরকে কোনও কারণ ছাড়াই বারবার আক্রমণ করেছিল আমেরিকা? বিগত শতকের নয়ের দশকে একটি গ্রন্থ বিশাল আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল দুনিয়াজুড়ে। স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’। সেখানে লেখক বলেছিলেন, ভবিষ্যৎ সংঘাত হতে চলেছে সংস্কৃতি এবং সভ্যতার ভিন্নতার মধ্যে। অর্থাৎ পশ্চিমি সভ্যতা চাইবে এশিয়া ও আফ্রিকায় নিজেদের সংস্কৃতি, অভ্যাস, বাণিজ্য এবং কালচারাল রুচি অনুসরণ করা হোক। আর এশিয়ার শক্তিশালী প্রাচীন সভ্যতাগুলি সেই আধিপত্যকে প্রতিরোধ করবে। ধর্ম ও সংস্কৃতি হবে সংঘাতের বীজ। সেটা ইসলামিক দুনিয়া হতে পারে, কিংবা হিন্দু সভ্যতার পুনর্জাগরণ, বা সাব সাহারান আফ্রিকার নিজস্ব সংস্কৃতি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরও অসংখ্য যুদ্ধ করেছে আমেরিকা। কোরিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়ায়। লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ১৯৮২ সালে ইজরায়েলকে সামনে রেখে আমেরিকা আক্রমণ করে লেবাননে। ১৮ হাজারের বেশি লেবাননবাসীর মৃত্যু হয়। আমেরিকার ‘অপারেশন ডেজার্ট স্টর্মে’ আড়াই লক্ষ মানুষ প্রাণ হারান ইরাকে। মিশরকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে ১৯৬৭ সালে ৬ দিন ধরে যুদ্ধ করেছিল ইজরায়েল। সমর্থক ছিল আমেরিকা। আবার তারাই মধ্যস্থতা করে। সিন্ধু সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র আফগানিস্তানও বারংবার আমেরিকার টার্গেট। তাকে চিরকালের মতো অনগ্রসর একটি রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে। যুগোস্লোভিয়া, সোমালিয়া, হাইতি, চিলি, নিকারাগুয়া, এল সালভাদর, পানামা ইত্যাদি প্রাচীন ভূখণ্ডগুলি আমেরিকার সমর্থন পাওয়া স্বৈরতন্ত্রী শাসক অথবা সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর হাতে বিধ্বস্ত। সিন্ধু সভ্যতার আরেকটি অংশ জন্মমুহূর্ত থেকে আমেরিকার বন্ধু। নামেই বন্ধু, আসলে ক্রীতদাস। তার নাম পাকিস্তান। কিন্তু সেই দেশের হাল আমেরিকা কী করেছে? ৭৮ বছরেই ধ্বংসের দোরগোড়ায়।
পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলিকেই বারবার আমেরিকা টার্গেট করছে কেন? লক্ষ্য কী? ভারতের প্রতিও আমেরিকার মনোভাব কখনওই খুব মধুর নয়! বাধ্য হয়ে সুসম্পর্ক রাখে। ভারতের এই অর্থনৈতিক বাড়বাড়ন্ত আমেরিকার কাছে সুখকর হওয়ার কথা নয়। সুতরাং, সাধু সাবধান! পশ্চিমের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংঘাতও কি ভারতের উপরেও কালো ছায়া ফেলবে ভবিষ্যতে?