কড়া রোদ্দুরে নাজেহাল দিন। হঠাৎ কোথাও থেকে ভেসে আসে মেঠো সুরের গান। মনে যেন বাতাস লাগে। একনিমেষে শান্ত হয়ে যায় চারপাশ। দেশের মাটির গন্ধ মাখা সবকিছুই আমাদের বড় কাছের, বড় আপন। ফেলে আসা শিকড়ের ঘ্রাণ নিতে শহুরে নাগরিক দিন দুয়েকের জন্য মাটির ঘরে থাকতে
কড়া রোদ্দুরে নাজেহাল দিন। হঠাৎ কোথাও থেকে ভেসে আসে মেঠো সুরের গান। মনে যেন বাতাস লাগে। একনিমেষে শান্ত হয়ে যায় চারপাশ। দেশের মাটির গন্ধ মাখা সবকিছুই আমাদের বড় কাছের, বড় আপন। ফেলে আসা শিকড়ের ঘ্রাণ নিতে শহুরে নাগরিক দিন দুয়েকের জন্য মাটির ঘরে থাকতে
যায়। ব্যস্ত সময়ে আধুনিকাদের সঙ্গী হয় মাটির পরশ দেওয়া নরম শাড়ি। রোদের জ্বালা জুড়োয় মাড প্রিন্ট শাড়িতে।
কটন হোক, জুট কিংবা লিনেন, কোটা— গরমে এই সব ফ্যাব্রিকই দারুণ চলনসই। আর এই সব প্রাকৃতিক ফ্যাব্রিক মাড প্রিন্ট-এর ‘বেস’ হিসেবে খুব ভালো। তাই গরমে এই ধরনের প্রিন্টের শাড়ি আপনার পছন্দের তালিকায় যোগ করতেই পারেন। মাড প্রিন্ট পরিচিত ‘ডাবু’ প্রিন্ট হিসেবেও। মূলত রাজস্থানে কারিগরদের হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয় ব্লক। ডাই করা শাড়িতে ব্লকের নকশার ছাপ দেন কারিগর। এরপরে শাড়িতে দেওয়া হয় কাদামাটির প্রলেপ। ব্লকের সূক্ষ্ম নকশা যাতে ডাই হওয়ার পরেও অটুট থাকে, তার জন্যই দরকার মাটির প্রলেপ। অর্থাৎ মাটি আটকে রাখে ব্লকের নকশা, ডাই করতে গিয়ে যা কখনও ধেবড়ে বা উঠে যায় না।
মাটির এই প্রলেপ বলতে কিন্তু শুধু কাদা ভাববেন না। এর সঙ্গে থাকে আরও অনেক উপকরণ। যে ফ্যাব্রিকে মাড প্রিন্ট করা হবে, তা গোটা একটা দিন আগে থেকে ভিজিয়ে রাখা হয়। ফ্যাব্রিক থেকে সবরকম ধুলো ময়লা, তেল ইত্যাদি ধুয়ে ফেলা হয় তার আগে। এরপরে কারিগররা সাধারণভাবে মাটি, চুনাপাথর, আটার গুঁড়ো এবং জল মিশিয়ে তৈরি করেন একটি মিশ্রণ। কাঠের নকশা কাটা ব্লক সেই মিশ্রণে ডুবিয়ে তারপর চেপে ধরা হয় শাড়িতে। এই ব্লক বসানোর সময় যাতে চারদিকে মিশ্রণ ছড়িয়ে না যায় তার জন্য শাড়ির উপরে ছড়ানো হয় কাঠের গুঁড়ো। রোদে শুকিয়ে এরপর সে ফ্যাব্রিক ডাই করা হয়। ভালোভাবে ডাই করার পরে শাড়ি মেলে দেওয়া হয় রোদ্দুরে। একটি শাড়িতে অনেক রকম ব্লক থাকতে পারে নকশার দাবি মেনে। শাড়ি পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়ার পরে আবার ভালো করে ধুয়ে নেওয়া হয়। আবার শুকোতে হয়। মাড বা ডাবু প্রিন্ট শাড়ি তৈরি হয় এইভাবেই। তবে যতটা সহজে বলে দেওয়া গেল, প্রক্রিয়াটি একেবারেই তত সহজ নয়।
ডাবুর নকশা এত জনপ্রিয় তার ব্যতিক্রমী নকশার জন্য। ষোড়শ শতাব্দী থেকে ভারতে এই হ্যান্ড ব্লক প্রিন্টিং শুরু হয়েছিল। রাজস্থান ছাড়া গুজরাতেও এই শাড়ি তৈরি করেন কারিগররা। আমাদের এখানে মোম দিয়ে বাটিক যেমন, মাড বা ডাবু প্রিন্ট তৈরির প্রক্রিয়া তারই কাছাকাছি। কিন্তু এই প্রক্রিয়া আরও অনেক বেশি কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ। মাটির যে প্রলেপ বা মিশ্রণের কথা বলা হচ্ছে, এই মিশ্রণ তৈরির মধ্যে খানিকটা ‘রহস্য’ মিশে থাকে। এক একটি কারিগরের পরিবার এক একভাবে এই মিশ্রণ তৈরি করে। এটা বেশ গোপন ব্যাপার আর কি! ডাবু প্রিন্টের নানা নকশার জন্য থাকে নানা মিশ্রণ। নদী থেকে কালো মাটি তুলে আনা হয়। চুনাপাথর, পোকায় খাওয়া আটার গুঁড়ো আর গাছের আঠা একসঙ্গে মেশানো হয়। এইভাবে তৈরি হয় এক ধরনের মিশ্রণ যার মধ্যে আঠালো ভাবটা কম।
আছে ডোলিদার ডাবু— এতেও পোকায় খাওয়া আটা থাকে, আর লেবুর রস এবং সাধারণ আঠা জলের সঙ্গে মিশিয়ে নেওয়া হয়। তৈরি হয় একটা আধা থকথকে মিশ্রণ। এই মিশ্রণে আঠালো ভাব বেশি থাকে। গুয়ার গাম গুঁড়ো (কৃষিতে ব্যবহার্য দ্রব্য), চুনাপাথর, গুড়, তিলের তেল আর কালো মাটি মিশিয়ে তৈরি হয় এটি। এটায় আঠালো ভাব সবচেয়ে বেশি থাকে।
এরপর তিন থেকে ছ’মিটার লম্বা একটি প্রিন্টিং টেবিলে শাড়ি পেতে ব্লকের নকশা বসানোর কাজটি হয়। যে হাতে এই ব্লক নাড়াচাড়া হবে, সে হাত হতে হবে অত্যন্ত অভিজ্ঞ। ব্লক বসানো হয়ে গেলে রোদ্দুরে শুকোতে প্রিন্টিং টেবিল থেকে শাড়ি তুলে বাইরে নিয়ে যাওয়াটাও বেশ চ্যালেঞ্জিং। প্রিন্টের নকশায় যাতে এতটুকু ক্ষতি না হয়, সেটা খেয়াল রাখতে হবে।
ডাই করার জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বেছে নেওয়া হয় ইন্ডিগো বা নীল রং। এক্ষেত্রেও কাজের অভিজ্ঞতা থাকা খুব জরুরি। পাকা হাতে করতে হয় ডাই। প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর। আগে তৈরি করে নেওয়া হয় রঙের একটা গভীর গর্ত। নীল রং যাতে ঠিকঠাক থাকে তার জন্য সেই নীল রঙের মধ্যে নিয়ত আরও নীল, লেবুর রস ও গুড় যোগ করে যেতে হয়। কোন উপকরণ কত পরিমাণে দিতে হবে, তাও নির্দিষ্ট। শাড়ি প্লিট দিয়ে ভাঁজ করে ওই ইন্ডিগোর মিশ্রণে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। লাঠির সাহায্য নিয়ে ভালো করে ভেজানো হয় কাপড়। সমানভাবে যাতে নীল রং কাপড়ে ছড়ায় সেদিকে নজর রাখতে হয়। শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে বাতাস ঢুকলে ঠিকমতো ডাই হবে না।
ডাই হয়ে যাওয়ার পরে নীলের গর্ত বা ভ্যাট থেকে কাপড় তুলে বাইরে রাখা হয়। অক্সিজেনের প্রভাবে রংটা একটু অন্যরকম হয় এবার, যাকে বলে অক্সিডাইজড ইন্ডিগো। এরপর রোদে শুকিয়ে আরও গাঢ় রং করার জন্য ফের কাপড় একবার ডুবিয়ে দেওয়া হয় ইন্ডিগো মিশ্রণে। দ্বিতীয়বারও তুলে মাটিতে পেতে শুকোনো হয়। এইভাবে যতক্ষণ না নীলের সঠিক গাঢ়ত্ব আসে, প্রক্রিয়াটি চলতেই থাকে। ডাই করা ও শুকোনোর প্রক্রিয়ায় ডাবুর নকশার যাতে এদিক ওদিক না হয়, সে ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতে হয়। অর্থাৎ নকশার কোনওটার মাঝখানে যদি ফেটে যায়
বা ভেঙে যায়, তাহলে হবে না। শুকনো করার চূড়ান্ত পর্যায়ের পরে কাপড় আবার ধোওয়া হয়। কাপড়ে লেগে থাকা মাটি ইত্যাদি ধুয়ে ফেলা হয়। তিন-চার ঘণ্টা সময় আরও কোনও বড় ট্যাঙ্কের উপরে বিছিয়ে দেওয়া হয় কাপড়। অতিরিক্ত ডাই আর মাটি পিটিয়ে পিটিয়ে ফেলে দেওয়া হয়। ফের একবার ধোয়া হয়। এইভাবে বার দুই-তিন চলে। শেষে মাটিতে ফেলে শুকানো হয়। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পরেই তৈরি হয় আরামদায়ক মাড প্রিন্ট শাড়ি।
অন্বেষা দত্ত