Bartaman Logo
২ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ইউরি গ্যাগারিনের অভিযান

সালের ১২ এপ্রিল। সাতসকালে  উত্তেজনার প্রহর গুনছে বাইকোনুর কসমোড্রোম। সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে পিন পতনের নীরবতা। স্তব্ধতার চাদর হঠাৎই ছিঁড়ে গেল...

ইউরি গ্যাগারিনের অভিযান
  • ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০

স্বরূপ কুলভী: ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল। সাতসকালে  উত্তেজনার প্রহর গুনছে বাইকোনুর কসমোড্রোম। সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে পিন পতনের নীরবতা। 

Advertisement

স্তব্ধতার চাদর হঠাৎই ছিঁড়ে গেল...
‘স্টার্ট’। 
‘চললাম’। শোনা গেল ইউরি গ্যাগারিনের গমগমে গলা। 
প্রচণ্ড একটা গর্জন, আগুন, ধোঁয়া। তারপরই আরও একরাশ আগুনের হল্কা বয়ে গেল স্তেপের উপর দিয়ে। অত্যন্ত ধীরে ধীরে স্টার্ট কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হল রুপোলি রকেটটা। তারপর গতি বাড়তে লাগল। যেন গতির বিস্ফোরণ। দেখতে না দেখতেই জ্বলন্ত ধূমকেতুর মতো উড়ে চলল। নিমেষে মিলিয়ে গেল আকাশে। 
এ যাত্রা অজানার। এ যাত্রায় ছিল না ফেরার নিশ্চিত আশ্বাস। শুধু অজানার সন্ধানে জীবনের পরোয়া না করে পাড়ি।  ভস্তক-১ নামে একটি মহাকাশযানে চেপে রওনা দিয়েছিলেন ইউরি গ্যাগারিন। বিশ্বের প্রথম মহাকাশ বিজয়ের কাব্য লেখা হয়েছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ২৬ বছরের এই তরতাজা যুবকের হাত ধরে। যাত্রার আগে কীরকম অনুভূতি ছিল ইউরির। নিজেই এক বিবৃতিতে সেকথা জানিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, ‘মহাকাশে পাড়ি দিচ্ছি বলে খুবই খুশি। সর্বকালে সর্বযুগেই নতুন আবিষ্কারের অংশ হওয়া সবচেয়ে বড় সুখের কথা। এর আগে তো অভিকর্ষ পেরিয়ে পৃথিবীর কোল ছেড়ে কেউ মহাকাশে যায়নি।’
স্টার্টের আগে ভস্তক-১-এর কেবিনে বসে কী ভাবছিলেন ইউরি? চারদিকে অসংখ্য যন্ত্রপাতি। কৃত্রিম আলোয় আলোকিত কেবিন। চেয়ারে বসে ইউরি। একা। বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ শুধুমাত্র রেডিও মারফত। এমন একটা যুগসন্ধিক্ষণে কার না বুক দুরুদুরু করবে? ইউরিরও তাই। তবে যাত্রা সফল হবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তাঁর। রকেট, মহাকাশের পোশাক, যন্ত্রপাতি, পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ— সবকিছু ঠিকঠাক রয়েছে বলেই মনে হচ্ছিল তাঁর। স্টার্টের আগে রেডিও যোগাযোগের ব্যবস্থাটা আগেই পরীক্ষা করে দেখে নিয়েছিলেন। গান চলছিল। তবে সেদিকে কান ছিল কি? সকাল ৯টা ৭ মিনিট। চালু হল রকেটের ইঞ্জিন। তারপর? পরবর্তী কালে ‘পৃথিবী দেখেছি’ বইতে ইউরি জানিয়েছেন, রকেট ওড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে চাপ। চেয়ারে যেন পিষে গেলাম। বায়ুমণ্ডলের ঘনস্তরটা পেরিয়ে আসতেই অপরূপ দৃশ্য। ভস্তক তখন সাইবেরিয়ার একটি নদীর উপর দিয়ে উড়ছিল। ঝলমলে রোদে দেখা যাচ্ছিল ঘন বনে ঢাকা নদীর দুই তীর। কখনও আকাশ, কখনও পৃথিবীর দিকে নজর রাখছিলাম। পৃথিবীর পর্বতমালা, মাঠ-প্রান্তরও চোখে পড়ছিল। সবচেয়ে নজরকাড়া দৃশ্য ছিল দিগন্তে। ঘোর কৃষ্ণবর্ণ আকাশ আর রোদ ঝলমলে পৃথিবীর মাঝে  রামধনুর সাত রঙের মেখলা। পৃথিবীর গোলাকার পৃষ্ঠদেশও চোখে পড়ল। মনে হল তা যেন মৃদু নীলের আভায় মোড়া। নীলচে-সবুজ, নীল-বেগুনির বলয় পেরিয়ে তা মিশে গিয়েছে নীলাভ কালোয়। অনেক আগেই  চাপ কেটে গিয়েছে। ওজনহীন অবস্থার সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিই। কিন্তু ওই অবস্থায় সবকিছু সামলাতে একটু সমস্যা হয়। লগ বুকে প্রথমবার লিখে পেন্সিলটা ছেড়ে দিয়েছিলাম। আর তা ম্যাপ রাখা ব্যাগটার সঙ্গে দিব্যি ঘুরে বেড়াতে লাগল। পেন্সিলটা একটা সুতো দিয়ে বাঁধা ছিল। কিন্তু গিঁটটা হঠাৎ খুলে চেয়ারে নীচে কোথায় যে ঢুকে গেল! আর পাওয়াই গেল না। তাই আর লেখা নয়। পরের সমস্ত পর্যবেক্ষণ রেডিও মারফত পাঠাতে হল। আর কিছুটা টেপে রেকর্ড করে রাখি। এই সামান্য ঘটনা ছাড়া পুরো পর্বটাই সম্পন্ন হল নির্বিঘ্নে। 
এবার অবতরণ। ১০টা ২৫ মিনিটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হল গতিরোধক যন্ত্র। বায়ুমণ্ডলের ঘনস্তরে ঢুকল ভস্তক। মহাকাশযানের অবতরণের সময় তাপ উৎপন্ন হয় মূলত বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে ঘর্ষণের কারণে। এজন্য থাকে বিশেষ প্রতিরোধক ব্যবস্থা। প্রথম কোনও মহাকাশচারী হিসেবে অবতরণের ওই সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তের কথাও জানিয়েছেন ইউরি। তাঁর কথায়, পর্দা ঢাকা জানলা দিয়ে চোখে পড়ল রক্তিম একটা ঝলক। ভস্তক ঘিরে তখন ফুঁসছে আগুনের শিখা। তারপরই ধীরে ধীরে কমতে থাকল ওজনহীনতা। তা ক্রমশ বাড়তে থাকল। ওঠার থেকেও তা যেন আরও বেশি। সেই চাপ যেন আমাকে ঠেসে ধরল চেয়ারে। ১০টা ৫৫ মিনিটে সফলভাবে পৃথিবীর বুকে নামলেন ইউরি। 
ইউরি একবার পৃথিবীকে সম্পূর্ণ প্রদক্ষিণ করেন মাত্র ৮৯ মিনিটে। গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২৭ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। যার সর্বনিম্ন উচ্চতা ছিল ১৬৯ কিমি ও সর্বোচ্চ ৩২৭ কিমি।
এই দুঃসাহসিক অভিযানের বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা হয়েছিল— মহাকাশে কি মানুষ বেঁচে থাকতে পারে? কোনও মহাকাশযানের পক্ষে সেখানে পৌঁছনো কি সম্ভব? এবং কোনও মহাকাশযান মহাকাশে পৌঁছলে পৃথিবীর সঙ্গে কি যোগাযোগ রক্ষা সম্ভব? সেখান থেকে কি আবার ফিরে আসা যায়? ইউরির ঐতিহাসিক যাত্রায় এই দীর্ঘদিনের প্রশ্নের জবাব মিলল। খুলে দিল মানুষের মহাকাশ যাত্রার পথ। তারপর কেটে গিয়েছে ৬৪ বছর। এতদিনে মহাকাশ গবেষণা অনেকটাই এগিয়েছে। তবে আরও অনেক কিছু অজানা। তার অনুসন্ধানে  দিনরাত কাজ চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর বাইরে কি কখনও বসতি গড়তে পারবে মানুষ? উত্তর এখনও ভবিষ্যতের গর্ভে। নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা, পরীক্ষানিরীক্ষা, প্রযুক্তির হাত ধরেই এসেছিল এই সাফল্য। আর বিজ্ঞান গবেষণার সেই ধারা আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন বিজ্ঞানীরা। আর এক্ষেত্রে ইউরির কৃতিত্ব মহাকাশ গবেষণার এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

সম্পর্কিত সংবাদ