Bartaman Logo
২ আগস্ট, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন বৃদ্ধি!

পাহাড়, নদী, সমুদ্র, জঙ্গল, মরুভূমি। কত কিছুই না রয়েছে আমাদের পৃথিবীতে। সেইসঙ্গে সুরক্ষাবলয়ের মতো রয়েছে বায়ুমণ্ডল।

বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন বৃদ্ধি!
  • ২ আগস্ট, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

স্বরূপ কুলভী: পাহাড়, নদী, সমুদ্র, জঙ্গল, মরুভূমি। কত কিছুই না রয়েছে আমাদের পৃথিবীতে। সেইসঙ্গে সুরক্ষাবলয়ের মতো রয়েছে বায়ুমণ্ডল। কিন্তু এসব কি আগাগোড়াই ছিল না হঠাৎই একদিন গড়ে উঠেছে? এর উত্তর আমরা সবাই জানি। এর নেপথ্যে রয়েছে কয়েকশো কোটি বছরের রূপান্তরের কাহিনি। আজ থেকে সাড়ে চারশো কোটি বছর আগে পৃথিবী তৈরি হয়েছিল। শুরুতে তা ছিল আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলন্ত। গ্যাসীয় পিণ্ড। থিয়া নামে এক গ্রহাণুর সঙ্গে সংঘর্ষে পৃথিবী থেকে একটা অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে চাঁদ তৈরি হয়। তারপর বহু কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়। শুরু হয় টানা বৃষ্টি। নীচু অংশ জল জমে গড়ে ওঠে সাগর। এই রূপান্তরের পথেই মহাসাগরের তলদেশে প্রথম আদি এককোষীয় ব্যাকটিরিয়ার উদ্ভব। এই ঘটনাই রূপান্তরের মোড় ঘুরিয়ে দিল। এখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ ২০.৯৫ শতাংশ। নাইট্রোজেন (প্রায় ৭৮ শতাংশ)-এর পর সবচেয়ে বেশি রয়েছে অক্সিজেন। মানুষ সহ পৃথিবীর প্রাণীজগতের প্রাণ ধারণের জন্য অক্সিজেন একান্তই প্রয়োজনীয়। সালোকসংশ্লেষণকারী জীব দ্বারা উত্পাদিত হয় অক্সিজেন। এই সব জীব জলে, স্থলে ও সমুদ্রে বাস করে। এরমধ্যে রয়েছে ব্যাকটেরিয়া, শৈবাল ও উদ্ভিদ। পৃথিবীর মোট অক্সিজেনের বেশিরভাগই আসে সমুদ্রের ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন নামক অতিক্ষুদ্র সামুদ্রিক উদ্ভিদ ও শৈবাল থেকে। গাছপালা কার্বন-ডাই-অক্সাইড, জল এবং সূর্যালোক ব্যবহার করে শর্করা জাতীয় খাদ্য ও অক্সিজেন তৈরি করে। কোটি কোটি বছর ধরে বায়ুমণ্ডলে রয়েছে অক্সিজেন। কিন্তু প্রথম দিকে এই গ্যাসের পরিমাণ খুব বেশি ছিল না। পরে তা অনেকটাই বেড়ে যায়। কিন্তু কীভাবে বাড়ল অক্সিজেন? এব্যাপারে একটা চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক একটি গবেষণায়। নেচার জিওসায়েন্স নামে পত্রিকায় প্রকাশিত হয় গবেষণার ফলাফল। এই গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের মতে,  পৃথিবীর ঘূর্ণন গতি  কমে যাওয়ার সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন বৃদ্ধির সম্পর্ক থাকতে পারে। অর্থাৎ, পৃথিবীর আবর্তন গতি কমে যাওয়ায় দিনের সময় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের জোগানও বেড়ে গিয়ে থাকতে পারে। দিনের সময় বৃদ্ধি? প্রশ্ন উঠতেই পারে,আমাদের একদিন মানে তো ২৪ ঘণ্টা। এই সময়টা কি আগে কম ছিল? তাহলে সেই সময় বাড়ল কীভাবে? প্রায় সাড়ে চারশো কোটি বছর আগে পৃথিবী তৈরি হয়েছিল। তারপর থেকে ধীরে ধীরে ঘূর্ণন গতি কমেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, আজ থেকে প্রায় ১৪০ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে দিন ছিল ১৮ ঘণ্টার। এখন তা বেড়ে হয়েছে ২৪ ঘণ্টা। এর কারণ হল চাঁদের টান। সৃষ্টির পর থেকেই চাঁদমামা পৃথিবীর এই আবর্তন গতিতে ব্রেক কষে যাচ্ছে। আর এজন্য প্রতি ১০০ বছরে পৃথিবীর দিন ১.৮ মিলিসেকেন্ড (এক সেকেন্ডের ১০০০ ভাগের ১ ভাগ) করে বাড়ছে। এটা এমনিতে নজরে পড়ার বিষয় নয়। কিন্তু কয়েকশো কোটি বছর ধরে এই ছোট্ট পরিবর্তনটাই অনেক বড়ো হয়ে যায়। চাঁদের মহাকর্ষের টানে পৃথিবীর এই গতি হ্রাস পাওয়ার ঘটনা প্রাণের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে সায়ানোব্যাকটেরিয়া নীল সবুজ শৈবালের উপর। এই অণুজীবগুলি সালোকসংশ্লেষের মাধ্যমে অক্সিজেন তৈরি করে। ২৪০ কোটি বছর আগে বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ ব্যাপক হারে বেড়ে গিয়েছিল। এই ঘটনাকে বলা হয় ‘দ্য গ্রেট অক্সিডেশন ইভেন্ট’। এর নেপথ্যে ওই সায়ানোব্যাকটেরিয়ার ভূমিকা ছিল।

Advertisement

গবেষণায় উত্তর আমেরিকার হুরন লেকের গভীরে মাইক্রোবিয়াল ম্যাট পর্যবেক্ষণ করেছেন বিজ্ঞানীরা। সেখানে অক্সিজেন উৎপাদনকারী সায়ানোব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে সালফার-খাদক অণুজীবীদের লড়াই চলে। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, সায়ানোব্যাকটেরিয়া শুধু সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীল নয়। তাদের বিপাকীয় প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। খাবার-দাবার তৈরির জন্য আলসেমি কাটিয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগে। যদি দিনের দৈর্ঘ্য কম হয়, তাহলে তাদের গা-ঝাড়া দিয়ে উঠতেই অনেকটা সময় চলে যায়। ফলে দিনের দৈর্ঘ্য যখন কম ছিল, তখন পর্যাপ্ত অক্সিজেন তৈরির সুযোগ পেত না। কিন্তু দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অক্সিজেন উৎপাদনের সময়সীমাও বেড়ে গিয়েছিল। আর এই ঘটনাই বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন বৃদ্ধির নেপথ্যে থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সমুদ্র বিজ্ঞানী অর্জুন চেন্নু এই গবেষণা সম্পর্কে বলেছেন, ‘পৃথিবীর ঘূর্ণন ও চাঁদের প্রভাব কীভাবে আমাদের বায়ুমণ্ডলকে শ্বাস-প্রশ্বাসের উপযুক্ত করে তুলতে সহায়ক হয়ে উঠেছিল, তা সত্যিই রোমাঞ্চকর।’

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ