নিজস্ব প্রতিনিধি, পিড়াকাটা: সকালে যে মানুষটি রাস্তায় দাঁড়িয়ে যান নিয়ন্ত্রণ করছেন তাঁকেই যদি রাতে দেখেন মা দুর্গারূপে তবে অবাক হবেন না। আবার কেউ হয়তো সকাল থেকে ব্যাঙ্কের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করতে ব্যস্ত, তিনিই রাতে ধরা দিলেন অসুররূপে। এঁরা সবাই দিনে সিভিক ভলান্টিয়ারের কাজ করে সন্ধ্যায় ছৌ নাচের চর্চা করেন। শালবনী ব্লকের পিড়াকাটার এই বাসিন্দারা বংশ পরম্পরায় তাঁরা এই নাচ চর্চা করে আসছেন।
দিনে কঠোর পরিশ্রমের পর রাতে ছৌ নাচের মাধ্যমেই তাঁরা বাল্যবিবাহ, ‘সেফ ড্রাইভ সেভ লাইফ’ সহ নানা জনসচেতনতা প্রচার করে থাকেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, এই এলাকার সিভিক ভলান্টিয়ারদের ছৌ নাচের দলের যথেষ্ট নামডাক আছে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বটেই, ভিন রাজ্য থেকেও তাঁদের ডাক আসে। শালবনী ব্লকের পিড়াকাটা এলাকার একটি ব্যাঙ্কের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন পার্থসারথি মাহাত। তিনিও ছৌ শিল্পী। বললেন, ছোট থেকেই ছৌ নাচের প্রতি আগ্রহ ছিল। চর্চা করে এখন আমি পুরোদস্তুর নৃত্যশিল্পী। আমাদের নাচ দেখতে বহু মানুষ আসেন। সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরি পেয়ে খুবই উপকার হয়েছে। সিভিকের ডিউটি শেষ করেই আমরা ছৌ নাচের অনুষ্ঠানে যোগ দিই। প্রসঙ্গত, এক সময় পিড়াকাটা মাওবাদী প্রভাবিত এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। এই অঞ্চলকে মাওবাদীরা নিজেদের সেফ করিডর হিসেবে ব্যবহার করত। তখন পিড়াকাটা ছিল সমস্ত সুযোগ সুবিধে থেকে বঞ্চিত। ২০১১ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। এলাকায় শান্তি ফিরে আসে। জানা গিয়েছে, এক সময় পিড়াকাটা এলাকার হাতিলোট, রামেশ্বরপুর, খাদারানি সহ বেশকিছু গ্রামের যুবকরা বিভিন্ন পেশা ছেড়ে ছৌ নাচের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করেন। সেই পরিকল্পনা মাফিক তাঁরা একটি গ্রুপ তৈরি করেন। শুরু হয় ছৌ নাচের তালিম নেওয়ার কাজ। সেই সময় ‘বর্তমান’ কাগজে খবর দেখে তাঁরা শিল্পী ভাতার আবেদন করেন। সেই ভাতা পেতে শুরু করায় তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। এক ছৌশিল্পী বলেন, শুধু রাজ্যস্তরের পুরস্কার নয়। জঙ্গলমহল কাপে পরপর তিন বছর ভালো ফলাফল হয়েছিল। সেই সময়ে ছৌ নাচ দেখে খুশি হন পুলিস ও প্রশাসনের আধিকারিকরা। তখনই সিভিক ভলান্টিয়ারের চাকরি দেওয়া হয় আমাদের। এলাকার ২৭ জন যুবক এই চাকরি পেয়েছেন।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, প্রাচীন এই নৃত্যকলা যখন হারিয়ে যেতে বসেছে। ঠিক সেই সময়ে এই নৃত্যকলাকে বাঁচিয়ে রেখেছে এই সিভিক ভলান্টিয়াররাই। দিনে ৮ ঘণ্টা ডিউটি করার পর, তাঁরা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। তাঁদের আর্থিক পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো হয়েছে। স্থানীয় ছৌ শিল্পী বুবাই মাহাত, রাজেশ মাহাত, সুব্রত কুমার মাহাত বলেন, ছৌ নাচকে বিশ্বের দরবারে নিয়ে যাওয়া আমাদের প্রধান লক্ষ্য। সকলের সহযোগিতা ছাড়া এই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের নাচ দেখে মানুষ খুশি হলে ভালো লাগে। এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।