কালভার্টের নীচে যুবতীর পোড়া দেহ হাতের উল্কিতে অনার কিলিংয়ের পর্দাফাঁস! উত্তরপ্রদেশ থেকে এনে জামালপুরে খুন
  • ১ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: বর্ধমানে দামোদর নদে, মাঠে-ঘাটে কিংবা জঙ্গলে ‘অজ্ঞাত পরিচিত’ যত লাশ উদ্ধার হচ্ছে, তার বেশিরভাগই যুবতী। সবারই আনুমানিক বয়স কুড়ি থেকে আঠাশ-তিরিশের মধ্যে। কিন্তু, প্রশ্ন হল কাদের শিকার অথবা ‘সফট টার্গেট’ হচ্ছেন এই অভাগী যুবতী বা তরুণীরা? অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু হয়। কিন্তু, কিনারা আর হয় না! অথচ, বছর কয়েক আগে এমনই এক রোমহর্ষক ঘটনার রহস্য ফিল্মি কায়দায় উন্মোচিত করেছিল পুলিশ। 

Advertisement

দিনটা ছিল ২০১৯ সালের ২৮ নভেম্বর। হেমন্তের শেষ, শীতের শুরু। শিশির ভেজা স্নিগ্ধ সকাল। আচমকা সকালের নরম রোদ্দুরটা বিমর্ষ হয়ে ওঠে  জামালপুরের আঝাপুরের জোতশ্রী এলাকার বাসিন্দাদের কাছে। কালভার্টের নিচে তাঁরা পড়ে থাকতে দেখেন এক যুবতীর দেহ। বডি দেখে শিউরে উঠেছিলেন সকলেই। শরীরে অর্ধেক পোড়া। শরীরের ঊর্ধ্বাংশ থেকে মুখাবয়ব—চেনার উপায় ছিল না। খবর যায় জামালপুর থানায়। পুলিশ তদন্তে নেমে মৃতার পরিচয় জানার চেষ্টা করে। কিন্তু কাজটা খুব সহজ ছিল না।  রাজ্যের প্রতিটি থানায় ডেডবডির ছবি পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। লাভ হয়নি। পরে পুলিশ মোটামুটি নিশ্চিত হয়, বাইরে থেকে যুবতীকে এখানে এনে খুন করা হয়েছে। 
কিন্তু, কে বা কারা খুন করল? খুনের মোটিভই বা কি ছিল? তা জানতে কোমর বেঁধে নামে পুলিশ। কিন্তু প্রথম ধাক্কাতেই থমকে যেতে হয়। স্থানীয়রা বিশেষ কোনো তথ্য দিয়ে পুলিশকে সহযোগিতা করতে পারেনি। টেকনিক্যাল সাপোর্ট নিতে টাওয়ার ডাম্প করল পুলিশ।  জাতীয় সড়কের পাশে খুনিদের মোবাইল নাম্বার চিহ্নিত করা খড়ের গাদায় সুচ খোঁজার সামিল হয়ে গেল। কারণ ওই রাস্তার ধারে সবসময়ই বহু গাড়ি যাতায়াত করে। প্রায় সবাই মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। তাই টাওয়ার ডাম্প করে তেমন লাভ হল না।  অবশেষে একটি উলকি এই খুনের কিনারায় জট খুলে দিয়েছিল।  যুবতীর পায়ের উপর অংশে মেহেন্দি জাতীয় কোন কিছু দিয়ে দুটি মোবাইল নাম্বার লেখা ছিল। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর তা তদন্তকারীদের চোখে পড়ে। সেই মোবাইল নাম্বারের সূত্র ধরেই পুলিশ পৌঁছে যায় খুনিদের কাছে।
 পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, নাম্বার দু’টি ছিল তাঁর প্রেমিকের। তিনি তখন মুম্বইয়ে ছিলেন। তদন্তকারীরা সময় নষ্ট না করে তড়িঘড়ি তাঁর কাছে পৌঁছে যায়।  সেই সময় তাদের ধারণা ছিল প্রেমিকই হয়তো প্রেমে ধাক্কা খেয়ে এই অপরাধ করতে পারেন। কিন্তু তাঁকে দীর্ঘ জেরা করার পর পুলিশ নিশ্চিত হয় খুনি তিনি নন। অন্য কেউ। ওই যুবক তদন্তকারীদের জানান, তাঁর বাড়ির লোকজন দু’জনের সম্পর্ক মেনে নিতে পারেননি। তাঁরাই তাঁকে গুম করে দিতে পারেন। ওই যুবতীর বাড়ির উত্তরপ্রদেশের ফতেহপুরে। তদন্তকারীরা পৌঁছে যান মৃতার পরিবারে। টেকনিক্যাল সাপোর্ট নিয়ে তাঁরা জানতে পারেন মৃতার পরিবারের কয়েকজন জাতীয় সড়ক ধরে কলকাতায় এসেছিলেন। মোবাইলে টাওয়ার লোকেশনে এমনই তথ্য উঠে আসে। শুরু হয় দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ। এক সময় মৃতার এক আত্মীয় ভেঙে পড়ে। সে জানিয়ে দেয় পরিবারের সম্মান রক্ষার্থে খুন করা হয়েছে। তাদের বাড়ির মেয়ে ভিনধর্মের এক যুবকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে ছিল। সেটা পরিবারের লোকজন মানতে পারেনি। চমকে ওঠেন তদন্তকারীরা।
কিভাবে খুন করা হয়? মেয়েটিকে এক আত্মীয়ের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অছিলায় গাড়িতে তোলা হয়। আসানসোলের কাছে গাড়ির মধ্যে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। তারপর জামালপুরে দেহটি ঝোপের মধ্যে ফেলে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পুলিশ যুবতীর ভাই, কাকা এবং এক আত্মীয়কে গ্রেপ্তার করে।