Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ঘরে ঘরে ‘সিক্রেট সুপারস্টার’ এমন রাজ্য পাবেন না ভূভারতে!

হাসপাতালের একটা গন্ধ আছে। এমন গন্ধে বেশিক্ষণ থাকতে ইচ্ছা করে না। আবার প্রাইভেট হাসপাতাল ও সরকারি হাসপাতালের গন্ধ আলাদা

ঘরে ঘরে ‘সিক্রেট সুপারস্টার’ এমন রাজ্য পাবেন না ভূভারতে!
  • ১৩ মে, ২০২৬ ০৯:১৬
Prefer us on Google

বিশ্বজিৎ দাস: হাসপাতালের একটা গন্ধ আছে। এমন গন্ধে বেশিক্ষণ থাকতে ইচ্ছা করে না। আবার প্রাইভেট হাসপাতাল ও সরকারি হাসপাতালের গন্ধ আলাদা। প্রাইভেট হাসপাতালের দরজা-জানলা বন্ধ। সেন্ট্রাল এসি। ফিনাইল, ওষুধ, ইঞ্জেকশনের গন্ধ ইমার্জেন্সি, আউটডোর, ওয়ার্ড কোথাও পিছু ছাড়বে না। আর্থসামাজিক কারণে প্রথমটায় গল্প করার লোক কম। দুঃখ ভাগ করার লোক কম। অধিকাংশ মানুষ আবেগে প্লাস্টিক বিছিয়ে রাখেন। বাবা-মা, এক বা দুই সন্তান, ছোটো পরিবার, কার কষ্ট কে ভাগ করবে! মানুষ ওয়েটিং রুমে নিজের মধ্যেই গুমরাতে থাকে। বারবার চা খেতে, সিগারেট খেতে বেরিয়ে পড়ে। একে ওকে ফোন করার পরও, সুসংবাদ নয়তো দুঃখের খবর পাওয়ার জন্য অনন্ত অপেক্ষা করে। সময় কাটে না।  

Advertisement

দ্বিতীয়টিতে ছেলেমেয়ে আইসিইউতে ভর্তি, তাও কাগজ বা পলিথিন বিছিয়ে অসংখ্য স্বামী-স্ত্রীকে গল্প করতে দেখেছি। একবার পিজি হাসপাতালের ঝিলপারে ছায়ায় বসে ১০-১২ জনকে দেখলাম গল্প করছেন। তাস খেলছেন। টিফিনবাক্স বের করে ভাত-তরকারি মাখছেন। 
জিজ্ঞাসা করতে চমকে দেওয়ার মতো উত্তর পাওয়া গেল। একজনের বাচ্চার বয়স ছয়। পথ দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর চোট পেয়েছে। ঩হাসপাতালের মেইন ব্লকের আইসিইউতে ভর্তি। তাঁর সঙ্গে যিনি গল্প করছিলেন, তাঁর সন্তানের আবার ক্যান্সার! কীভাবে এঁরা গল্প করছেন, কথা বলছেন সুখ-দুঃখের? ছেলেমেয়ের প্রতি মায়া-মমতা নেই? তাঁরা বললেন, ‘কী করব? আমাদের হাতে আর আছেটা কী? সবটুকু ঠাকুরের হাতে। ছেলেমেয়ের জন্য ওদের মা সবসময় প্রার্থনা করছে। আমরা যদি কথা বলাটুকুও বন্ধ করে দিই, মানসিকভাবে লড়াই করার জোরটুকুও পাব না।’ ক’দিন আগে কলকাতা মেডিকেল কলেজে এক আশ্চর্য মায়ের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত এলাকায় বাড়ি তাঁর। বয়স ৩৫। তিন সন্তান। বড়োটা ছেলে। ছোটো আর মেজোটা মেয়ে। 
ক্লাশ টেন পাশ করা সাধারণ বিড়িশ্রমিক সেই মায়ের লড়াই শুরু মেজো মেয়ের বয়স যখন তিনদিন—তখন থেকে। মেজোর আজ বয়স ১৬। এই ষোলো বছরে সেই মেয়ে পার করেছে ১৬টা অপারেশন! বছরে গড়ে একটা! সবসময় মা ছিল পাশে। এবারে মাধ্যমিক দিল মেয়ে। অসমসাহসী মা বলছিলেন, ‘তখন আমার বয়স ১৯। মেয়েকে নিয়ে তখন থেকে ছোটাছুটি শুরু। ‘কী হয়েছিল মেয়ের?’ ‘কী হয়নি বলুন? ছোটোবয়সে ওর পায়খানার রাস্তাই তৈরি হয়নি। একাধিক অপারেশনে সেটা তৈরি করলেন ডাক্তাররা। তারপর এল পিরিয়ডের মারাত্মক সমস্যা। সেজন্য অপারেশন। তারপর কিডনি স্টোন, সেজন্য অপারেশন। তারপর অ্যাপেনডিক্সের প্রবলেম—ফের অপারেশন। আরও কত! এই তো ক’দিন পর ফের চেক আপে যাব।’ 
‘কখন বাড়ি থেকে বেরতেন?’ ‘সন্ধ্যাবেলা।’ ‘মানে?’ ‘হ্যাঁ, মুর্শিদাবাদের বাড়ি থেকে সন্ধ্যায় বেরতাম। রাতের ট্রেনে উঠলাম। ভোর ভোর কলকাতায় নামতাম। তারপর মেডিকেল কলেজ।’ ‘ধৈর্য হারাতেন না?’ উত্তর এল, ‘আমি না দেখলে কে দেখবে? ছোটো আর বড়োটাকে মায়ের কাছে রেখে বেরিয়ে পড়তাম। ওপরওয়ালার আশীর্বাদে অসাধারণ ডাক্তারবাবুদের পেয়েছি। ঘরের বোনের মতো লড়াইয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। ও এখন ‘মেডিকেল কলেজের মেয়ে’ হয়ে গিয়েছে!’
আমরা বাঙালিদের বেঁকে যাওয়ার মেরুদণ্ডের গল্প শুনি দিনরাত। ভাবি, এমআরআই স্ক্যান করলে আমাদেরও বোধহয় মেরুদণ্ড ধরা পড়বে না! বাবা-মাকে শহরে রেখে, দুরন্ত কেরিয়ারের আকাঙ্ক্ষায় মধ্যবিত্ত ছেলেমেয়েদের আর পেট চালাতে, সংসারকে টেনে তুলতে ও স্বপ্ন পূরণের লোভে নিম্নবিত্ত-গরিবদের পরিযায়ী হওয়ার গল্প এখন এতটাই পুরানো এবং ক্লিশে, প্রিয়জনের জন্য জানপ্রাণ এক করে দেওয়ার কথা ভাবতেই কেমন একটা লাগে। কিন্তু, এখনও রাস্তায় পথ দুর্ঘটনা হলে রাজধানী শহর দিল্লিতে কেউ ফিরেও তাকাবে না আপনার দিকে। আর বাংলায়? বাড়িফিরতি যুবক লেট হচ্ছে জেনেও, আপনাকে সঙ্গে নিয়ে ছুটবে হাসপাতাল। একদল তথাকথিত পড়াশোনায় খারাপ ‘পাড়ার ছেলে’ চিৎকার-চেঁচামিচি করে ট্যাক্সি দাঁড় করাবে। তুলে দেবে। এমনকি সঙ্গেও কেউ যেতে পারেন। তাই মানুষের জন্য মানুষের পাশে দাঁড়ানোর রিয়েল লাইফ গল্প, প্রিয়জনকে পরিত্যাগ নয়, শেষ নিঃশ্বাস নেওয়া পর্যন্ত লড়াই করবার গল্প এখনও এই বাংলায় হাজার হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ আছে। লক্ষ লক্ষ তৈরি হচ্ছে রোজ। 
শহরে বিরল রোগে ভুগতে থাকা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষণজন্মা শিশুদের বাবা-মায়েদের গল্প বলছিলেন এক নামকরা মনোবিদ। বললেন, ‘মধ্যবিত্ত এক দম্পতির কথা বলছি। স্বামীর বয়স ২৭। স্ত্রীর ২২। ছেলেটি একটি কারখানায় কাজ করেন। মেয়েটি গৃহবধূ। যখন আমি ওঁদের কাউন্সেলিং করতে যাই, ওঁদের দ্বিতীয় সন্তান মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। এইচএলএইচ নামে এক বিরল এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক রোগে আক্রান্ত ছিল একরত্তিটি। এই রোগে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিসক্রিয় হয়ে ওঠে। বেশিদিন বাঁচে না বাচ্চারা। 
দুর্ভাগ্যের বিষয় হল, দম্পতির প্রথম সন্তান অজানা কারণে মারা যায়। দ্বিতীয় সন্তান নিকুতে লড়াই করছে। এদিকে তৃতীয় সন্তানও ভূমিষ্ঠ হয়েছে। আরও দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হল, তৃতীয়টিও একই রোগে আক্রান্ত। মানে একজন মারা গিয়েছে। একজন মারা যেতে চলেছে। একজন মারা যাবে। বাবা-মাকে বলছিলাম, ‘দেখুন, আমি তো আগে জানতাম না। যখন দায়িত্ব পেলাম, আপনাদের সন্তানের ঠিক কী হয়েছে, কেন হয়েছে জানার চেষ্টা করলাম। সন্দেহ হওয়ায় তৃতীয় সন্তানটিরও পরীক্ষা করিয়েছি। ওর রিপোর্টও পজিটিভ এল। কিছুই করতে পারলাম না।’ 
তখন চুপ করে থাকলেও, কয়েক মাস পরে ওই হতভাগ্য বাচ্চাগুলির সেই অল্পবয়সি বাবা আমাকে এক আশ্চর্য কথা বলেছিলেন। বললেন, ‘ম্যাডাম, যখন রোগটির কথা জানলাম, বুঝেছিলাম, আমাদের দ্বিতীয় সন্তান মারা যাবে। এমনকি তৃতীয়টিরও যে বেশিদিন আয়ু নেই, সেটাও বুঝেছিলাম। কী করব বলুন! দু’জনে মিলে চিন্তা করে নিই। বউকে বলি, দেখো, আমাদের তৃতীয় বেবিও যখন মারাই যাবে, চল, আমরা ওর সঙ্গে নিজেদের সেরা সময়গুলি ভাগ করে নিই। ও পাঁচ মাস বেঁচেছিল। ওই পাঁচ মাস ছিল আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ পাঁচ মাস। নিজেদের উজাড় করে ওকে ভালোবেসেছি। বাবা-মা হিসেবে ওই পাঁচ মাস ওর সঙ্গে কী দুর্দান্ত কাটালাম! জানতাম ও চলে যাবে। আপশোস না করে ওই সময়টাই বুকে নিয়ে বাঁচব আমরা।’ ওই মনোবিদ বললেন, ‘প্রথাগত উচ্চশিক্ষা ছিল না ওই দম্পতির। বড়ো কোনো পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ডও নেই। কিন্তু ওরা যে আশ্চর্য জীবনবোধের কথা শোনালেন, আচ্ছা, আচ্ছা শিক্ষিত মানুষকেও এইভাবে জীবনের সারসত্য বুঝতে দেখিনি।’
সত্যিই ডাউন সিনড্রম সহ নানা ধরনের বিরল রোগে আক্রান্ত বাচ্চাদের বাবা-মায়ের লড়াই কতজন জানেন? কী হয় তাঁদের জীবনের, কেউ খেয়াল রাখেন? কাছের মানুষজন শুধু জানেন, কৃতি ছাত্রী মা তাঁর চাকরি ছেড়ে দিলেন, বাবা তাঁর সমস্ত সম্পত্তি, ব্যবসা বিক্রি করে দিলেন ছেলেমেয়ের চিকিৎসায়। নিজেদের শখ-শৈখিনতা সবটুকু ত্যাগ করে জীবনের ধ্যানজ্ঞান, ধ্রুবতারা একটাই হয়ে উঠল—মানসিক-শারীরিকভাবে অসুস্থ সন্তানকে পালন, বাঁচিয়ে রাখা শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত। অনেকে তাতেই থেমে থাকলেন না। আরও এমন সন্তানদের বাবা-মাকে নিয়ে সাপোর্ট গ্রুপ তৈরি করলেন আরও বড়ো লড়াইয়ের জন্য। 
আমরা অসুস্থ প্রিয়জনদের নিয়ে আকুল হয়ে পড়ি। কিন্তু, আজও বাংলায় এমন হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ বাবা-মা সূর্য ওঠার অনেক আগে ঘুম থেকে ওঠেন। অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে, প্রিয়জনকে নিয়ে রওনা দেন হাসপাতালের উদ্দেশ্যে, তাঁকে আরও কিছুদিন পৃথিবীর শ্বাসটুকু দেওয়ার জন্য। 
শুধু বাবা-মাকে একঘরে করা মানুষরাই নয়, বরং তাঁদের থেকে অনেক বেশি সংখ্যক আপন করা মানুষ আজও আছেন রাজ্যে। তাঁদের ব্যথা দেখা যায় না। তাঁদের ত্যাগ সোচ্চার নয়। চুপচাপ তাঁরা খালি নিকটজনের জন্য করে যান। মেয়ে চলে গিয়েছে, জানার পরও পরম ভালোবাসা দেখেছিলাম স্টিফেন কোর্ট অগ্নিকাণ্ডের ভুক্তভোগী এক বাবার মধ্যে। মেয়েটির জন্য তাঁর বাবা রোজ আসতেন পিজি’র মর্গে। তাঁর দগ্ধ দেহের অবশেষটুকু শনাক্ত করতে। মেয়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন করে তিনি অন্য মানুষ হয়ে যান। মেয়ে চাইত বাবা ধূমপান ছেড়ে দিক। তাই করেছিলেন। শুধু তাই নয়, হয়ে উঠেছিলেন কবি! 
এই রাজ্যে আপনজনকে বাঁচানোর জন্য, যমেমানুষে টানাটানিতে জীবন আর মৃত্যুর মাঝে পাথরের মতো কঠিন ঠাঁই হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ার মতো হাজার হাজার মানুষ আছে। 
সক঩঩লেই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীর জন্য ফেলেন চোখের জল। কিন্তু তাঁর জন্য চুপচাপ যে অসামান্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর বাবা-মা-ভা‌ই-বোন—তাঁদের আর ধর্তব্যেই রাখি না আমরা। শুধু বলি, এ তো কর্তব্য!   
এখানেই বাংলা আলাদা। ভূভারতে মিলবে না এমন রাজ্য। এখানে ঘরে ঘরে আছেন সিক্রেট সুপারস্টাররা। তাঁরা আসল হিরো। তাঁরাই আসল হিরোইন। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ