


প্রীতম দাশগুপ্ত: আমাদের ছোটোবেলায় একটা গল্প পড়েছিলাম। ঈশপের গল্প। আপনারাও অনেকে পড়েছেন। আবার কেউ কেউ হয়তো পড়েননি। যাঁরা পড়েছেন তাঁদের আবার মনে করিয়ে দিলাম। আর যাঁরা পড়েননি, তাঁদের কাছে তো নতুন হবেই। দুই বন্ধু গল্প গল্প করতে করতে বনের পথে হাঁটছিল। হঠাৎ তাদের রাস্তায় একটি বড়ো ভল্লুক চলে আসে। এক বন্ধু গাছে চড়তে জানত। সে সঙ্গে সঙ্গে অন্য বন্ধুকে ছেড়ে গাছে উঠে পড়ে। অন্যজন আর কী করে? অগত্যা সে মাটিতে শুয়ে পড়ে মৃতের ভান করে পড়ে থাকে। ভল্লুকটা তাকে শুঁকে দেখে মৃত মনে করে চলে যায়। তখন ওই ব্যক্তি গাছ থেকে নীচে নেমে এসে বন্ধুকে জিজ্ঞেস করে ভল্লুকটা তোমাকে কী বলে গেল? উত্তরে সে বলে, বলে গেল বিপদে যে সরে যায়, তাকে কেউ বন্ধু বলে না। এটাই ছিল গল্পের নীতি কথা। আসল বন্ধু কে, তা চেনা যায় বিপদের সময়েই। দুঃসময়ে। সুসময়ে আপনার আশপাশে অনেককেই দেখতে পাবেন। সবাইকেই বন্ধু মনে হবে। কিন্তু যখন খারাপ সময় আসবে, দেখবেন এদের বেশিরভাগই আপনার সঙ্গ ছেড়ে চলে গিয়েছে। যাঁরা সেই সময় আপনার হাত ছাড়বেন না, প্রতি মুহূর্তে পাশে থাকার বার্তা দেবেন, জানবেন তাঁরাই প্রকৃত বন্ধু। আপনি নিজেই বুঝে যাবেন, কে বন্ধু আর কে মেকি। এত কথা কেন বললাম?
৪ মে চার রাজ্য ও এক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের ভোটের ফল বেরিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফল হয়েছে তামিলনাড়ু ও আমাদের বঙ্গে। তামিলনাড়ুতে হ্যাং অ্যাসেম্বলি আর বঙ্গে ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের পতন। তামিলনাড়ুতে কোনো দলই একক গরিষ্ঠতা পায়নি। একক বৃহত্তম দল হয়েছিল তামিল সুপারস্টার বিজয়ের টিভিকে। ভোটের সময় কংগ্রেস তাদের সঙ্গে ছিল না। ছিল ডিএমকে জোটে। তামিলনাড়ুতে একা লড়ে একটাও আসন পাওয়ার ক্ষমতা রাহুল গান্ধীর দলের ছিল কি না সন্দেহ। কিন্তু ভোটের ফল বেরতেই দ্রুত জোট ভেঙে বিজয়ের দলকে সমর্থন দিয়ে দিল কংগ্রেস। একবারও ডিএমকের সঙ্গে কথা বলার সৌজন্যও দেখাল না। স্ট্যালিনের দলের সঙ্গে জোটে থাকা বামেরাও সমর্থন দিয়েছে। তবে ডিএমকের সঙ্গে কথা বলার পর। কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে এতটাই আহত হয়েছে ডিএমকে যে, তারা বলেই দিয়েছে বিরোধী ইন্ডিয়া জোট শেষ। লোকসভায় কংগ্রেসের পাশে তাদের এমপিদের আসন বরাদ্দ ছিল। সেই স্থানও বদল চেয়েছে তারা। কংগ্রেসের এই আচরণকে সরাসরি গদ্দারি বলেছেন অখিলেশ যাদব। কটাক্ষ করে বলেছেন, আমরা বিপদের সময়ে বন্ধুকে ছেড়ে যাই না। এমনকি মোদিও এই আচরণের জন্য কংগ্রেসকে দুষেছেন। তিনি তো বলবেনই। কারণ বলার সুযোগটা তো দিয়েছেন রাহুল গান্ধীই।
আমাদের রাজ্যের দিকে দেখুন। যতদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় ছিলেন, চারদিক তাকালে শুধুই তৃণমূল। আপনি টোটো চড়ছেন, অটো চড়ছেন। ইউনিয়ন তৃণমূলের। বাজার করতে যাচ্ছেন । রাস্তার দোকানের দিকে দেখুন বা ফুটপাতে বসে থাকা হকার। কথা বলুন। এত বড়ো তৃণমূলী কেউ আছে বলে আপনি ভাবতে পারবেন না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভা। লোক ভরানো নিয়ে কোনো চিন্তা নেই। বাস, টোটো, অটো ইউনিয়ন রয়েছে না। এই সব অসংগঠিত শ্রমিকরা ভিড় করবেন সভায়। দেদার হাততালি। সভা সফল। দিন পালটালো। রাতারাতি সব বদল। এখন রাস্তায় বেরলে দেখবেন শুধুই পতাকা পরিবর্তন। রাতারাতি তৃণমূলের ইউনিয়ন হয়ে গিয়েছে বিজেপির। ফুটপাতের দোকানদার দেখা হলে আর প্রথমে কেমন আছেন বলছেন না। বলছেন, জয় শ্রীরাম।
এ তো গেল যাকে বলে একেবারে আম আদমির কথা। আমরা যাঁদের একটু বিদ্বজ্জন বলে ভাবি বা পর্দায় দেখি, আর ভাবি এরা কি সত্যিই মানব? তাঁদের পরিবর্তন তো আলোর গতিবেগকেও হার মানায়। যখন মমতা ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তাঁর বৃত্তে ভিড় করে থাকতেন এইসব ‘ঝিঙ্কু-মামনি’রা। দিন দুই আগেই রবীন্দ্র জয়ন্তীর অনুষ্ঠান করলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁদের অনেকেই নেই পাশে। নেই সেই তারকাদের ভিড়। একটা সময় ছিল যখন কে কত বড়ো তৃণমূলী সেটা প্রমাণে মরিয়া ছিলেন। আর আজ? কার সঙ্গে তৃণমূলের কত কম যোগ সেটা প্রমাণে ব্যস্ত। প্রত্যেকেই সমাজমাধ্যমে পোস্ট করছেন। সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আর বলছেন, তাঁরা মন থেকে কত তৃণমূল বিরোধী ছিলেন। কিন্তু ঠেকায় পড়ে তৃণমূলকে সমর্থন করতে বা তাদের হয়ে প্রচারে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। আবার এক নামী গায়কের মতো কেউ কেউ বলেই দিয়েছেন, আমি তো তৃণমূল করতামই না। বোঝো ঠ্যালা। অনেকেই প্রমাণ করতে চাইছেন, তাঁরা এখন গেরুয়া অনুগামী।
প্রশ্ন জাগছে, এরা কি সত্যিই বন্ধু ছিল ঘাসফুলের। উত্তরটা এককথায় না। আনুগত্য থাকলে ঘাসফুল ছেড়ে পদ্মফুল হাতে নিতে একটু হলেও সময় লাগত। হাত কাঁপত। এত অনায়াস হত না। তবে কি এরা পদ্মের বন্ধু? এ ভুল যদি বিজেপি করে তাহলে ঠকতে হবে। বামেরাও একসময় এই ভুল করেছিল। ভেবেছিল, সবাই বোধহয় লাল। সবাই বাম সমর্থক। তারপর দেখা গেল জমানা বদলাতেই সবাই হয়ে গেল সাদা-নীল। মমতার অন্ধ ভক্ত। আবার জমানা পালটাতেই আনুগত্যে বদল। তাই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকারকে সচেতন হতে হবে। তোষামোদকারী আর পদলেহনকারী বুদ্ধিজীবীকে সময় থাকতে দূরে সরান। কারণ এরা শুধু ক্ষমতা ভোগ করতে চায়। নীতি বা আর্দশ—এসব এদের অভিধানে নেই। এদের নির্লজ্জ চাটুকারিতা তৃণমূল পতনের অন্যতম কারণ। ভোটের ফলের দিনই যাঁরা ঘাসফুল ছেড়ে গেরুয়া ঝান্ডা হাতে নিয়েছেন, তাঁরা আর যাই হোক গেরুয়া-বন্ধু হতে পারেন না। সমাজের নানাবিধ প্রভাবশালী মানুষ এখন নিজেরাই ‘রং দে মোহে গেরুয়া’য় আচ্ছন্ন। তাই তাঁদের বিশ্বাস করলে সমূহ বিপদ। ইতিমধ্যে শোনা যাচ্ছে বিভিন্ন ভবনের নীল-সাদা রং বদল হয়ে গেরুয়া হচ্ছে। এই নাম বদল বা রং বদল কিন্তু আসল পরিবর্তন নয়। নীল-সাদা রং করতে গিয়ে কোটি কোটি টাকার অপচয় হয়েছে। দুর্নীতি-স্বজন পোষণের অভিযোগ উঠেছে। তাই ওই পথে আবার হাঁটলে কিন্তু মানুষের প্রত্যাশাই ধাক্কা খাবে।
আপনারা আপনাদের সংকল্প পত্রে যে বার্তা দিয়েছেন, সেই কাজটাই মন দিয়ে করুন। ‘ভয় নয় ভরসা’ যেন শুধু স্লোগানই না হয়। কাজটা কিন্তু সহজ নয় পুলিশ-প্রশাসনকে রাজনীতি মুক্ত রাখা। নারী সুরক্ষা দেওয়া। কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। যুব সমাজকে বাংলার বাইরে গিয়ে যেন পরিযায়ী শ্রমিক হতে না হয়। এখন ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার। তাই অজুহাতও চলবে না। আশার কথা স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সংকল্প রক্ষার আশ্বাস দিয়েছেন। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, পিপলস ভোটেড লেস ফর মি। অ্যান্ড মোর এগেইনস্ট দ্য প্রিভিয়াস গভর্নমেন্ট। মমতার শাসনে কোনো কাজ হয়নি, একথা বললে মিথ্যা বলা হবে। তাঁর আমলে এমন কিছু কাজ হয়েছে যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কন্যাশ্রী প্রকল্প লক্ষ লক্ষ মেয়ের স্কুলছুট আটকেছে। স্বাস্থ্যসাথী কার্ড বহু পরিবারের চিকিৎসার ভার বহন করেছে। তাঁর লক্ষ্মীর ভাণ্ডারকে তো আজ কপি করছে বিভিন্ন রাজ্যের সরকার। তা সে মোদি যতই রেউরি নিয়ে সমালোচনা করুন, তাঁর বিজেপি সরকারই লক্ষ্মীর ভাণ্ডার অনুকরণ করেছেন। কিন্তু ঘটনা হল, কল্যাণমুখী প্রকল্প নিলেই সেই সরকার দারুণ গণতন্ত্র মেনে কাজ করছে, সেটা বলা যায় না। এটাই হয়েছিল রাজ্যে। মানুষের ভোটাধিকারে বাধা। সামান্য বিরোধিতাতেও চোখ রাঙানি, এসব সহ্য করতে করতে মানুষ পালটানোর কথা ভাবতে বাধ্য হয়েছিল। একটা সময় বাম আমলেও এই ভয়ের বাতাবরণ কাজ করেছিল। কোনো শাসকের শাসনব্যবস্থার ভিত্তি যদি হয় ভয়, তবে তা কখনোই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। এটাই ইতিহাসের শিক্ষা। তাই কংগ্রেসের সরকার গিয়েছে। বাম শাসনের অবসান হয়েছে। তৃণমূলেরও পতন হয়েছে।
মসনদের অবসান হয়েছে। কুর্সি থেকে মমতা গিয়েছেন। এসেছেন শুভেন্দু। একটা শাসনের পর আর একটা শাসন। এটাই ইতিহাসের নিয়ম। ২০১১ সালে মানুষ যে স্বপ্ন দেখেছিল, তা আস্তে আস্তে কোথাও কোথাও দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছিল। এবারও যেন তা নয়। নতুন সরকার যে সকলের, মানে সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগুরু প্রত্যেকেরই, সেটা প্রমাণ করার দায়িত্বও তাদের। বিজেপির সরকার মানেই ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়া কিংবা ‘গোরুর দুধে সোনা’ নয়। প্রকৃত বিজ্ঞান চেতনার বিকাশ সেটা বোঝানোর দায়িত্ব আপনাদেরই। মনে রাখবেন বাংলার ধৈর্যও এখন কমছে। স্বাধীনতার পর থেকে মাঝের কয়েকটা বছর বাদ দিলে ছিল কংগ্রেসের সরকার। তারপর বামেদের ৩৪ বছর। এবার কিন্তু ১৫ বছরেই বিদায় নিল তৃণমূল সরকার। মানে অর্ধেকেরও কম সময় লাগল। তাই ফের বেচাল দেখলে বা সরকার ঠিক পথে চলছে না দেখলে আরও কম সময়ে বদল আনতে দেরি করবে না বঙ্গবাসী। ইতিহাস কিন্তু বড়োই নির্মম।