


সোমবার নবান্নে অনুষ্ঠিত হল পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিজেপি সরকারের প্রথম বৈঠক। আর সেখানেই শুরু হল কথা রাখার পালা। নব নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এদিন যে-কটি সিদ্ধান্ত নেন তার মধ্যে দুটি অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য—অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার এবং মহিলাদের বাসভ্রমণ সংক্রান্ত। আগামী ১ জুন থেকেই মহিলাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের’ টাকা ক্রেডিট হতে শুরু করবে। রাজ্যের মহিলারা ওইদিন থেকেই বিনাভাড়ায় সরকারি বাসে চড়তে পারবেন। এবারের নির্বাচনে মহিলা ভোটাররাই ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। দেশে বিগত একাধিক নির্বাচনে মহিলা ভোটাররাই নির্ণায়ক শক্তিরূপে চিহ্নিত হয়েছেন। তাঁদের অধিক সমর্থনই জয় সুনিশ্চিত করেছিল সংশ্লিষ্ট দল বা জোটের। এই প্রশ্নে বলে বলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল তৃণমূল কংগ্রেস। শিক্ষার্থী মেয়েদের জন্য ‘কন্যাশ্রী’ প্রকল্প চালু করা থেকেই শুরু হয় মমতার জয়যাত্রা। ওই সাফল্য তাঁকে ‘রূপশ্রী’, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রভৃতি সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলি গ্রহণে প্রাণিত করে। বলা বাহুল্য, একাধিক বিধানসভা এবং লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বাংলায় যে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিল তার নেপথ্যে ছিল পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মাতৃশক্তির অকুণ্ঠ সমর্থন। নির্বাচনি রাজনীতির এই ‘ম্যাজিক’ অনুকরণে দ্বিধা ছিল না দেশের বাকি রাজ্যগুলির। দল নির্বিশেষে। এমনকি, কেন্দ্রের মোদি সরকারও এর দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিল। অনুকরণকারীর পঙ্ক্তিতে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, দিল্লি, বিহার প্রভৃতি রাজ্য ছিল অগ্রণী। মোদি সরকারের ‘বেটি বাঁচাও বেটি পড়াও’ প্রকল্পটি মমতার ‘কন্যাশ্রী’ দেখেই রচিত বলে প্রচার রয়েছে। বেশি সংখ্যায় মহিলা জনপ্রতিনিধি তুলে আনার ব্যাপারে মমতার পার্টি সবসময় প্রশংসিত হয়েছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পাঁচ স্থানের বিধানসভা নির্বাচনের মুখে মোদি-শাহের পার্টি সংসদে মহিলা সংরক্ষণ (নেপথ্যে লক্ষ্য ছিল যদিও আসন পুনর্বিন্যাস) বিল পাস করাতে মরিয়া ছিল। বিজেপি তাতে ব্যর্থ হয়েই কংগ্রেস, তৃণমূল প্রভৃতি বিরোধী দলকে একহাত নেয়।
এই দফার নির্বাচনে বিজেপির প্রধান লক্ষ্য ছিল পশ্চিমবঙ্গ দখল করা। তাই রাজ্যের তৎকালীন শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনি ইস্তাহারের বিষয়বস্তুর দিকে তাদের বিশেষ নজর ছিল। মমতার ইস্তাহারে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ই যে তুরুপের তাস হবে তাতে কারো সন্দেহ ছিল না। ওইসঙ্গে মমতা ‘যুবসাথী’ নামে আরো একটি উল্লেখযোগ্য প্রকল্প যোগ করেন বেকার যুবদের সমর্থন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে। তৃণমূল ইস্তাহার প্রকাশের অব্যবহিত পরেই অমিত শাহের নেতৃত্বে বিজেপি সামনে আনে তাদের ‘সংকল্পপত্র’। সেখানে পাওয়া গেল তৃণমূলের সবগুলি জনপ্রিয় প্রকল্পের ‘বর্ধিত সংস্করণ’ চালু করার প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনি সভাগুলি থেকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও সেগুলি বিশদে জানিয়ে দেন। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাগ কাটে ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ প্রকল্প মারফত প্রত্যেক মহিলাকে প্রতিমাসে তিন হাজার টাকা অনুদান প্রদান। এছাড়া বেকার ও যুব শ্রেণির কল্যাণেও একাধিক ঘোষণা আলোচনার কেন্দ্রে স্থান পায়। অমনি চেপে ধরল তৃণমূল কংগ্রেস। কংগ্রেস, সিপিএম প্রভৃতি বিরোধীরাও তাতে গলা মেলাল ভিন্নভাবে। খেলাপের পূর্ব পূর্ব একাধিক দৃষ্টান্তের উল্লেখসহ প্রত্যেকের বক্তব্যের সারকথা ছিল, মোদির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। তারা শতমুখে এই দাবিও করেছিল যে, এই সংকল্পও একদিন ‘জুমলা’ হিসাবে নিন্দিত হবে।
শুভেন্দু মন্ত্রিসভা বড়ো বড়ো কথা বলার পরিবর্তে, শুরুতেই কথা রাখতে যত্নবান হল। এছাড়া এরাজ্যে চালু সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির কোনোটি বন্ধ হচ্ছে না বলেও আশ্বস্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এমনকি ‘আয়ুষ্মান ভারত’, ‘উজ্জ্বলা যোজনা’ এবং ‘বিশ্বকর্মা’-সহ জনমুখী কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির সুবিধাও এই সরকার রাজ্যবাসীকে দ্রুত দেবে বলে ঘোষণা করেছে। এতে বিরোধীদের আশঙ্কা, প্রচার প্রভৃতি প্রথমেই নস্যাৎ হচ্ছে। রাজ্য মন্ত্রিসভার পরবর্তী বৈঠক রয়েছে আগামী সোমবার। সেখানেও জনস্বার্থে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে অনুমান করা হচ্ছে। সোজা কথায়, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ডবল ইঞ্জিন সরকার ‘ফর দ্য পিপল, অব দ্য পিপল, বাই দ্য পিপল’ নীতিকে সামনে রেখেই এগিয়ে যেতে চেষ্টা করবে। আমরা আশা রাখব, এইভাবেই নতুন সরকার পরিণত এবং সবার হয়ে উঠবে। শাসক দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য যেমন বলেছেন, ‘এটা বিজেপি সরকার নয়, পশ্চিমবঙ্গ সরকার’।