Bartaman Logo
২৪ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাহুমুক্তি আর কবে?

তিন দশক পেরিয়েছে ব্যাপম কেলেঙ্কারির (মধ্যপ্রদেশ প্রফেশনাল এগজাম বোর্ড বা হিন্দিতে ব্যবসায়িক পরীক্ষা মণ্ডল স্ক্যাম) বয়স

রাহুমুক্তি আর কবে?
  • ১৪ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

তিন দশক পেরিয়েছে ব্যাপম কেলেঙ্কারির (মধ্যপ্রদেশ প্রফেশনাল এগজাম বোর্ড বা হিন্দিতে ব্যবসায়িক পরীক্ষা মণ্ডল স্ক্যাম) বয়স। এটি ছিল একটি প্রবেশিকা পরীক্ষা কেন্দ্রিক বেনজির দুর্নীতি। তবে রহস্যটি ফাঁস হয় ২০১৩ সালে। এই ঘটনা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক ও নিন্দার ঝড় বয়ে গিয়েছে। আজ তা থামেনি। উত্তরকালে সরকারি ক্ষেত্রে সংঘটিত যেকোনো দুর্নীতির দৃষ্টান্তকে ব্যাপমের পাশে বসিয়ে তুলনা টানা হয়েছে। কারণ ব্যাপম ছিল একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির দৃষ্টান্ত। তদন্তে এই বিস্ময়কর সত্য বেরিয়ে আসে যে, কেলেঙ্কারিটি কোনো একটিমাত্র ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের তরফে হয়নি। তাতে প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল রাজনীতি, পুলিশ, সাধারণ প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট বোর্ডের রকমারি রাঘব বোয়ালরা। জড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল শিক্ষক, ছাত্র, অভিভাবকসহ সমাজের বহু শ্রেণির মানুষকে। বস্তুত দুর্নীতির ‘সাম্যবাদ’ প্রতিষ্ঠা করেছিল ব্যাপম!

Advertisement

শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন রাহুর গ্রাস থেকে মুক্তির জন্য আকুল প্রার্থনা করে চলেছে সারা দেশ। তৎসত্ত্বেও সেই প্রার্থনা যে আজও মঞ্জুর হয়নি, তার প্রমাণ মেলে রাজ্যে রাজ্যে, প্রায় সারা দেশে এবং ভূরি ভূরি! বিভিন্ন পাবলিক এগজামে প্রশ্ন ফাঁস হয়েই চলেছে। আর চাকরির পরীক্ষায় চুরি, জালিয়াতি, ঘুষের কারবার তো লাগাম ছাড়িয়েছে। এই অনুমান অসত্য নয় যে, বোর্ড এগজাম, উচ্চশিক্ষার জন্য প্রবেশিকা পরীক্ষা এবং চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় দুর্নীতির ঝোঁক একটি সমান্তরাল ব্যবস্থা হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেতে মরিয়া। এর পিছনে সক্রিয় শত শত কোটি টাকার বেআইনি লেনদেন। নোট বাতিল থেকে ডিজিটাল লেনদেন, কেউই এই অনাচারের পায়ে বেড়ি পরাতে পারেনি। একটা জিনিস কিছুতেই বোঝানো যাচ্ছে না, শিল্প-ব্যবসা-সহ কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতি আর শিক্ষাক্ষেত্রে দুর্নীতির মধ্যে পার্থক্যটি গুণগত। বিভিন্ন কোর্সে ভরতি এবং শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি ঘটলে তা হয় শিক্ষাব্যবস্থার মূলে কুড়ুল মারার শামিল। অযোগ্য শিক্ষকরা যেমন উপযুক্ত শিক্ষা দিতে অপারগ, তেমনি অযোগ্য ছাত্ররাও প্রয়োজনীয় শিক্ষালাভে সমর্থ হবে না। আর সেই কোর্স যদি ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, হিসাবরক্ষক প্রভৃতি পেশাদার তৈরির জন্য হয়ে থাকে তো সাড়ে সর্বনাশ! পদে পদে অবমন ঘটতে থাকবে সমাজের, এমনকি গণহারে মৃত্যুও রোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। আরো একটি বাস্তব ভেবে দেখার যে, এই সর্বনাশ একবার বা দুবারে থামবে না, তা চলতেই থাকবে! কেননা, এ তো কোনো একবেলার জনসভার লোকসমাগম নয়, এই অযোগ্য এবং দুর্নীতিবাজদের ভিড় জাঁকিয়ে থাকবে টানা কয়েক দশক। 
তাই চলতি বছরে ডাক্তারির সর্বভারতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষায় (নিট-ইউজি) প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সকলকে ভীষণই বিচলিত করে তুলেছে। কেলেঙ্কারিটি ছোটোখাটো যে নয়, তার প্রমাণ এই ইস্যুতে আচমকাই ওই পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র। সারা দেশে নিট-ইউজি পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল ৩ মে। নয়দিন পর, মঙ্গলবার সকালে সেই পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করল আয়োজক সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ)। স্বভাবতই আতান্তরে পড়ে গেলেন প্রায় ২২ লক্ষাধিক পরীক্ষার্থী। তাঁরা জানেন না, এর দরুন তাঁদের জন্য কী লিখতে চলেছে ভবিষ্যৎ। প্রবল চাপের মুখে এনটিএ কর্তা অবশ্য জানিয়েছেন, রি-এগজামিনেশনের দিনক্ষণ শীঘ্রই জানিয়ে দেওয়া হবে। কোনো পরীক্ষার্থীকে এজন্য অতিরিক্ত ফি দিতে হবে না। নতুন করে রেজিস্ট্রেশনও করতে হবে না তাঁদের। এতে কর্তৃপক্ষ বা সরকারের মুখরক্ষা হল কি না তা তাঁরাই বুঝবেন। কিন্তু পরীক্ষার্থীদের স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ যে এতে কোনোভাবেই সুরক্ষিত হল না, হলফ করেই বলা যায়। তাই পরীক্ষার্থী, তাঁদের অভিভাবক এবং শিক্ষানুরাগী মহলের অসন্তোষকে সংগত বলেই মানতে হবে। দেশে উচ্চশিক্ষার প্রবেশ দ্বার আর কবে সুরক্ষিত হবে? কবে শায়েস্তা হবে শিক্ষা-মাফিয়ারা? পূর্ববর্তী কেলেঙ্কারি সামনে এসেছে মাত্র ২০২৪ সালেই। তারপর ফের এবার! দুর্বৃত্ত চক্রের হাত কত দূর বিস্তৃত এবং কতটা শক্ত, দুরাচারের ঘন ঘন পুনরাবৃত্তি সেটাই বুঝিয়ে দিচ্ছে নাকি? বিশেষ করে নিট-ইউজি সামলাতে এনটিএ অপারগ হলে এই প্রবেশিকা ফের রাজ্যগুলিকেই ফিরিয়ে দেওয়া হোক। তাতে মহাভারত কোনোভাবেই অশুদ্ধ হবে না। বিশেষ করে তামিলনাড়ু, কেরলম, কর্ণাটক, অন্ধপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ প্রভৃতি অগ্রণী রাজ্যগুলি থেকে এতকাল হাজার হাজার যোগ্য চিকিৎসক তৈরি হয়েছেন এই ব্যবস্থার মাধ্যমেই। সেটি হঠাৎ করে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে ভাবা ঠিক নয়। তাই শিক্ষানুরাগী মহলের সংগত দাবি, হয় সর্বভারতীয় প্রবেশিকা সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করা হোক অথবা ছাত্র ভরতির দায়িত্ব ফিরিয়ে হোক সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলিকেই।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ