


মৃণালকান্তি দাস: ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়টা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের অর্থনীতির এক উত্তাল সময়। ১৮৩৯-৫৯ সালের দুই দশক ছিল বিদ্রোহের আগুন, অভ্যন্তরীণ জালিয়াতি ও প্রশাসনিক দ্বন্দ্বে পোড়া একটি প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকার লড়াই। আজ আধুনিক ব্যাংকিংয়ের যে স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব আমরা দেখি, তার বীজ বপন হয়েছিল সেই দুই দশকের রোমাঞ্চকর ও সংকটময় অভিজ্ঞতায়। একদিকে ব্রিটিশদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক আধিপত্যের বিস্তার, অন্যদিকে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভিত্তি স্থাপন।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূচনাতেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতাকেন্দ্রিক বাণিজ্য, প্রশাসনিক বিস্তার ও অর্থনৈতিক জটিলতা এড়াতে একটি সুসংহত আর্থিক পরিকাঠামো গড়ে তোলার প্রয়োজন অনুভব করেছিল। ততদিন কলকাতার অর্থনৈতিক কাজকর্ম মূলত কয়েকটি শক্তিশালী এজেন্সি হাউস নির্ভর ছিল। এসব প্রতিষ্ঠান বাণিজ্য পরিচালনার পাশাপাশি ঋণ প্রদান, অর্থ স্থানান্তর ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করত। কিন্তু ব্যক্তিনির্ভর ও অনিয়ন্ত্রিত এই কাঠামো বৃহত্তর প্রয়োজনে অপ্রতুল হয়ে ওঠে। ফলে একটি নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। যদিও ভারতের মাটিতে ব্যাংকের ইতিহাস আরও কয়েক দশক পুরানো।
ভারতে ইউরোপীয় তত্ত্বাবধানে প্রথম ব্যাংক ছিল ‘ব্যাংক অব হিন্দুস্তান’। ১৭৭০ সালের দিকে কলকাতার প্রভাবশালী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান মেসার্স আলেকজান্ডার অ্যান্ড কোংয়ের একটি শাখা হিসেবে এর যাত্রা শুরু। খুব বেশি তথ্য পাওয়া না গেলেও, জানা যায়, ব্যাংকটির নিজস্ব নোট ইস্যুর ব্যবস্থা ছিল। এসব নোটের প্রচলন সীমাবদ্ধ ছিল কলকাতা ও আশপাশের এলাকায়। তৎকালীন সরকার মফস্সলের কোষাগারে তা গ্রহণ করেনি এবং লিগ্যাল টেন্ডার হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়নি। ১৭৯৯ সালের কলকাতা গেজেটে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন থেকে জানা যায়, ব্যাংকটি ‘ক্যালকাটা এক্সচেঞ্জ লটারি’র টিকিট বিক্রির এজেন্ট হিসেবেও কাজ করত। সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও ‘ব্যাংক অব হিন্দুস্তান’ ছিল ভারতীয় ব্যাংকিং ইতিহাসে এক পথিকৃৎ প্রতিষ্ঠান। সবই ছিল কলকাতা কেন্দ্রিক।
১৭৯০ সালের দিকে গড়ে ওঠে ‘ব্যাংক অব বেঙ্গল’। এই প্রতিষ্ঠানের নথিপত্রও খুব সীমিত। সংরক্ষিত একটি নোটে লেখা ছিল: ‘ব্যাংক অব বেঙ্গল, কলকাতা, ১৫ নভেম্বর ১৭৯১। আমি রামকান্ত দত্ত বা এই নোটের বাহককে চাহিবামাত্র একশত সিক্কা রুপি প্রদান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ব্যাংক অব বেঙ্গলের পক্ষে, বেঞ্জামিন মি।’ ধারণা করা হয়, ১৮০০ সালের আগেই ব্যাংকটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। নামের মিল থাকলেও এই ব্যাংক অব বেঙ্গলের সঙ্গে পরবর্তী ব্যাংক অব বেঙ্গলের কোনো প্রশাসনিক সম্পর্ক ছিল না।
‘ব্যাংক অব কলকাতা’র আত্মপ্রকাশ ১৮০৬ সালের ১ মে। পুরোদমে লেনদেন শুরু হয়েছিল সেই বছরের ২ জুন। তার আগে ৯ এপ্রিল প্রথম পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থিত ছিলেন সরকার-মনোনীত পরিচালক রিচার্ড বেচার, আরডব্লিউ কক্স ও এইচএসজি টাকার। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সরকারি কর্মচারীরা এই ব্যাংকের শেয়ার কিনতে পারবেন না। কাগুজে মুদ্রা চালু করতে পুরানো ট্রেজারি বিল ব্যাংক নোটের মাধ্যমে প্রতিস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয় এবং ২৫০ টাকার নীচের নোট সিক্কায় পরিশোধিত হবে। ১০, ৫০, ১০০, ২৫০, ৫০০, ১০০০, ৫০০০ ও ১০,০০০ টাকার নোট ছাপানোরও সিদ্ধান্ত হয়। একই সভায় ঠিক হয় ব্যাংকের যাবতীয় আইনি সহায়তার জন্য কোম্পানির আইনি কর্তাদের শরণাপন্ন হতে পারবে।
১৮০৬ সালের ৭ মে সভায় ব্যাংকটি কলকাতা টাউন হলে লটারির টিকিট বিক্রি ও পুরস্কার বিতরণের দায়িত্ব নেয়। একই দিনে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষণা করা হয়, ২ জুন ব্যাংকটি পুরোদমে কাজকর্ম শুরু করবে। প্রতি বুধবার ম্যানেজমেন্ট ঋণ আবেদন গ্রহণ করবেন। ট্রেজারি বিলের বিপরীতে ব্যাংক নোট ইস্যু ও বিনিময় চলবে। প্রাদেশিক ট্রেজারির বিলও পাওয়া যাবে। ১৮০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘গভর্নর জেনারেল ইন কাউন্সিল’-এর অনুমোদনে ঋণের মেয়াদ দুই মাস থেকে বাড়িয়ে তিন মাস করা হয়। একই সময় ঘোষণা করা হয় ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে সব নোট নগদ অর্থে পরিশোধযোগ্য হবে। ২ মার্চ থেকে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট খোলা যাবে। এভাবেই ধাপে ধাপে ব্যাংক অব কলকাতা একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয় এবং ১৮০৯ সালে পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী ব্যাংক হিসেবে নাম পরিবর্তন করে ‘ব্যাংক অব বেঙ্গল’ আত্মপ্রকাশ করে। যা ছিল ভারতের প্রথম স্থায়ী আধুনিক জয়েন্ট-স্টক ব্যাংক।
ব্যাংক অব বেঙ্গলের প্রথম বড়ো পদক্ষেপ ছিল মফস্সলে ব্যবসা বিস্তারের উদ্যোগ নেওয়া। কলকাতার নিরাপদ সীমানা ছাড়িয়ে বাণিজ্যের গভীরে যাওয়ার প্রথম রোমাঞ্চকর পরীক্ষাটি শুরু হয় ১৮৩৯ সালে। উত্তর ভারতের তুলো ও শস্য বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র মির্জাপুরে ব্যাংক অব বেঙ্গল তাদের প্রথম শাখা বা ‘এজেন্সি’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। ক্লড হ্যামিলটনকে এই শাখার প্রথম এজেন্ট হিসেবে নিয়োগ করা হয়। কলকাতার বড়বাজার থেকে শুরু করে আগ্রা, এলাহাবাদ, বেনারস, কানপুর, ঢাকা, দিল্লি, লাহোর, লখনউ, এমনকি বার্মার রেঙ্গুন ও মৌলমেন পর্যন্ত ব্যাংকের শাখা স্থাপিত হয়।
তখন কলকাতা থেকে মির্জাপুরে নৌকাযোগে অর্থ পৌঁছাতে সময় লাগত প্রায় পাঁচ-ছয় সপ্তাহ। অন্যদিকে নদীপথে ডাকাত আর ঝড়-বৃষ্টির আতঙ্ক ছিল নিত্যসঙ্গী। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রথম ছয় মাসে প্রায় ১৩ হাজার ৭৯১ টাকা মুনাফা করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল ব্যাংকটি। সেই সময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা আর নিরাপত্তার অভাব ব্যাংকটিকে বারবার ভাবিয়ে তুলছিল। ব্যবসায়িক দিক থেকে শাখাটি লাভের মুখ দেখলেও অপারেশনাল জটিলতা ও দূরবর্তী নিয়ন্ত্রণের সীমাবদ্ধতার কারণে শেষ পর্যন্ত ১৮৪৮ সালের জানুয়ারিতে মির্জাপুর এজেন্সি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে ভারতীয় ব্যাংকিং ইতিহাসে এটা ছিল ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। মির্জাপুর এজেন্সির বন্ধ হওয়াটা ব্যাংকের ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার পথে কোনো চিরস্থায়ী অন্তরায় বা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বরং তা ছিল প্রতিষ্ঠানটির একটি কৌশলগত বিরতি।
ব্যাংকটির পরিসর যখন আরও বিস্তৃত হচ্ছে, তখন তার প্রশাসনিক নেতৃত্ব নিয়েও শুরু হয় টানাপড়েন। তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী, ব্যাংকের সচিব হতেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ সরকারি আমলারা। ১৮৩৯ সালে সচিব জর্জ উদনির পদত্যাগের পর আমানতকারীরা দাবি তোলেন, ব্যাংক পরিচালনার ভার সরকারি আমলার বদলে কোনো পেশাদার বাণিজ্যিক ব্যাংকারকে দিতে হবে। অংশীদারদের চাপে ১৮৪০ সালে টমাস ব্র্যাকেনকে নিয়োগ করা হয়। ব্রিটিশ সরকার এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে সচিবের বেতন বন্ধ করে দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, আমলাদের বদলে ব্যবসায়িক লোক বসালে সরকারি আস্থায় ফাটল ধরতে পারে। এমনকি কাগজের নোটের লেনদেনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কিন্তু তৎকালীন ছ’জন মার্চেন্ট ডিরেক্টর তাদের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। তাঁদের এই অনড় অবস্থান স্পষ্ট করে দেয়— ব্যাংক অব বেঙ্গল কেবল ব্রিটিশ শাসনের আজ্ঞাবহ কোনো সরকারি দপ্তর বা ফাইলবন্দি কার্যালয় নয়। বরং এটা একটি স্বাধীন বাণিজ্যিক সত্তা, যা আমলাতন্ত্রের খোলস ছেড়ে পেশাদারিত্বের শক্তিতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখেছে। তাদের এই জেদই ব্যাংকটিকে ভবিষ্যতে একটি আধুনিক স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের বীজ বুনে দিয়েছিল।
কিন্তু ১৮৪০ সালের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা চরমে ওঠে। প্রায় ৩৪ হাজার টাকার মতো বড়ো অংকের অর্থ লোপাট হওয়ার ঘটনায় জনগণের আস্থায় জোর ধাক্কা লাগে।
এই ধাক্কা সামলাতে ১৮৫৫-৫৬ সালে ব্যাংকটি এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেয়। বেঙ্গল চেম্বার অব কমার্সের অনুরোধে তারা প্রতি সপ্তাহে ব্যাংকের সোনা ও রুপোর রিজার্ভ এবং প্রচলিত নোটের পরিমাণ সংবাদপত্রে প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেয়। যদিও সরকার তখন তাদের নিজস্ব ট্রেজারি রিপোর্ট দিতে রাজি ছিল না। কিন্তু ব্যাংক অব বেঙ্গল স্বচ্ছতার নতুন এই মানদণ্ড তৈরি করে দেয়। ১৮৫৬ সালের জানুয়ারিতে এই সাপ্তাহিক স্টেটমেন্ট প্রকাশ করা শুরু হয়। ১৮৫৭ সাল থেকে নিয়মিত অর্ধবার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ শুরু হয়। আজকের আধুনিক ব্যাংকিংয়ে আমরা যে জবাবদিহির কথা বলি, তার ভিত্তি ছিল এই সাপ্তাহিক ও ষাণ্মাসিক হিসাব প্রকাশের রীতি।
অন্যদিকে, ব্যাংক অব বেঙ্গলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়ো অগ্নিপরীক্ষা শুরু হয় ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময়। গোটা ভারত যখন উত্তাল, তখন কলকাতার আমানতকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কাগজের নোটের উপর মানুষের
বিশ্বাস এমনভাবে উবে যায় যে, তারা দলে দলে ব্যাংকে ভিড় করে কাগজের নোটের বদলে রৌপ্য মুদ্রা দাবি করতে থাকেন। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল, ৪ শতাংশ সুদের সরকারি বন্ডের দামও তখন ২৫ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৮৫৭ সালের জুনে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ৫৩তম রেজিমেন্টের সশস্ত্র প্রহরীদের মোতায়েন করা হয়। সেই সময় ভল্টের প্রবেশপথে রাত-দিন চলত সেনাদের বুটের শব্দ। উত্তাল সেই সময়েও ব্যাংক তার দরজা খোলা রেখেছিল।
বিদ্রোহের ডামাডোলে ব্যাংকের ভিতরেও অপরাধ ডানা মেলেছিল। ১৮৫৮ সালে দেখা যায় নোট বিনিময় বিভাগের কয়েকজন কর্মচারী সুকৌশলে বাতিল করা নোটের বান্ডিল থেকে ভালো নোট সরিয়ে নিয়ে জালিয়াতি করছেন। এই জালিয়াতিতে প্রায় ২০ হাজার ১০০ টাকা হারিয়ে যায়। অঙ্কের বিচার, সেইসময় সেই টাকার মান বিপুল। এই ঘটনায় ব্যাংক দ্রুত প্রশাসনিক সংস্কার আনে। এর পরই নোটে স্বাক্ষর করার পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করা হয় আগের চেয়েও কঠোর। সেক্রেটারি, ডেপুটি সেক্রেটারি ও অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছাড়া ডিরেক্টরদের স্বাক্ষরের নিয়ম বাতিল করা হয়।
১৮৩৯-৫৯ সাল পর্যন্ত দুই দশকের বন্ধুর পথচলা শুধু একটি ব্যাংকের টিকে থাকার লড়াই ছিল না, বরং তা ছিল উপমহাদেশের গোটা ব্যাংকিং ব্যবস্থার এক অগ্নিপরীক্ষা। মির্জাপুর এজেন্সির প্রথম নৌকাযাত্রা থেকে শুরু করে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় ভল্টে সশস্ত্র প্রহরার সেই রুদ্ধশ্বাস দিনগুলি— প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল আধুনিক অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের একেকটি শক্ত ভিত। যে পথ ধরে আজ দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম ব্যাংকিং মহীরুহ ‘স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে।