Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এখনও বলবেন কমিশন বিজেপির কথায় চলে না!

শনিবার বেলা গড়াতেই অপেক্ষার অবসান। মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের আগের ঘণ্টার উৎকণ্ঠার থেকে কম নয়।

এখনও বলবেন কমিশন বিজেপির কথায় চলে না!
  • ১ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: শনিবার বেলা গড়াতেই অপেক্ষার অবসান। মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশের আগের ঘণ্টার উৎকণ্ঠার থেকে কম নয়। পার্থক্য একটাই, পরীক্ষার ফল বেরলেই টানাপোড়েনের অবসান হয়। এক্ষেত্রে দীর্ঘ হেনস্তার পর নির্বাচন কমিশনের সৌজন্যে নাম কা ওয়াস্তে ৭ কোটি ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৮৪ জনের একটা তালিকা বেরিয়েছে বটে, কিন্তু এতে সমাধানের চেয়ে বিভ্রান্তিই যে বাড়বে তা চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়। দুপুর থেকে জেলায় জেলায় ভোটারদের ক্ষোভের চেহারা দেখেই মালুম হচ্ছে, ভোটারের স্বার্থ কতটা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। কতজন রোহিঙ্গা পাওয়া গেল তার হদিশ নেই। অনুপ্রবেশকারী নিয়ে বীরপুঙ্গবদের আস্ফালনও স্তিমিত। ওই একটা পরিসংখ্যানের উপরই ঝুলে আছে বিজেপির বিচার। বাংলাদেশি সংখ্যালঘু তাড়ানোর নাম করে বাস্তবে যাঁরা হিন্দুদেরই মুশকিলে ফেলেছেন তাঁদের ক্ষমা নেই। ৬০ লক্ষ নাম অমীমাংসিত রেখে তালিকা বের করার মানে কী? আদালতের রায়ে কেজরিওয়াল নির্দোষ প্রমাণিত হতেই দিল্লিতে ফেঁসে গিয়েছে কালীরামের থুড়ি সিবিআইয়ের ঢোল। সচেতন বাংলায় নির্বাচন কমিশনের ঢোল ফেঁসেছে ভোটের আগেই। বিজেপির ষড়যন্ত্র বেআব্রু।

Advertisement

সময়মতো শুনানির নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে একটা জোড়াতালি লিস্ট বের করে পিঠ বাঁচাতে মরিয়া কমিশন। কমিশনের কথায় স্পষ্ট, এটাই চূড়ান্ত নয়। শনিবারের তালিকার ভিত্তিতেই যে আগামী এপ্রিলে রাজ্যে ভোট হবে, তাও হলফ করে বলা যায় না। পরবর্তী সাপ্লিমেন্টারি তালিকা কবে বেরবে, ক’দফায় বেরবে সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন? সংযোজন ও বিয়োজন শেষ করতে ভোটপর্বই শেষ হয়ে যাবে না তো? নির্বাচনের দিন ঘোষণার আগেই যাবতীয় নিষ্পত্তি সম্ভব কি না, তাও জোর দিয়ে বলতে পারছে না কমিশন। পদে পদে সংশয়। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, তাহলে চার মাস ধরে হলটা কী? শুধুই রাজনীতি আর শাসকের নির্দেশে ষড়যন্ত্রের গোড়ায় সার-জল দেওয়া! গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে বাংলার রাজনীতিকে এভাবে গুলিয়ে দেওয়ার দায় কার? শুধুই কমিশনের, না কেন্দ্রের শাসক বিজেপি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকেরও সমান দায়িত্ব? এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু মানুষ চাইবেই। আসন্ন ভোটের আগেই চাইবে। এই আদ্যন্ত বিষিয়ে দেওয়া পরিবেশে ঘোলাজলে মাছ ধরার জন্য যাঁরা ভিনরাজ্য থেকে ছিপ কিনে বাংলা দখলের স্বপ্ন দেখছেন তাঁদের সমুচিত জবাব দেবে বাংলার মানুষ।
৫৮ লক্ষ নাম বাদ দিয়ে খসড়া তালিকায় যে যাঁদেরই নাম ছিল তাঁরা সবাই আজকের লিস্টে স্থান পেয়েছেন। সেই ভোটারদের তিনভাগে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। যাঁদের শুনানির নিষ্পত্তি হয়নি তাঁদের নামের পাশে অ্যাডজুডিকেশন, আর যাঁরা বাদ তাঁদের পাশে ডিলিটেড লেখা। বাকিরা স্বাভাবিকভাবেই থাকছেন। অর্থাৎ এই তালিকা নতুন করে শুধু বিভ্রান্তিই ছড়াবে না, বিভেদ আর অশান্তিও ডেকে আনবে। সেই আশঙ্কার কথা আন্দাজ করেই তালিকা প্রকাশের আগেই জেলা ধরে ধরে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের প্রস্তুতি চূড়ান্ত। যদি তাই হয় তাহলে ১৬ ডিসেম্বরের খসড়া তালিকা প্রকাশ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি, প্রায় আড়াই মাসে কমিশন করলটা কী? সুপ্রিম কোর্ট যদি শেষপর্বে জেলা জজ থেকে শুরু করে কলকাতা হাইকোর্টকে যুক্ত না করত তাহলে শনিবারের তালিকা প্রকাশও পিছিয়ে যেত। 
শুরু থেকেই বিজেপি চায় সওয়া এক কোটি ভোটারের নাম বাদ দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসনে বাংলায় ভোট করতে। কারণ, গেরুয়া নেতৃত্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে নরেন্দ্র মোদির ডেলি প্যাসেঞ্জারি, কেন্দ্রীয় এজেন্সির দৌরাত্ম্য, নিঃশ্বাস নিতে না পারা দলবদলুদের ক্রমাগত বিষ নিক্ষেপকে অস্ত্র করে বেশি দূর এগনো সম্ভব নয়। সংগঠন তলানিতে। সিবিআই পদে পদে যে ব্যর্থ আবার তা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে মাদক মামলায় কেজরিওয়াল বেকসুর হয়ে যাওয়ায়। দলবদলুদের দৌরাত্ম্যও যে ডাহা ফ্লপ, তা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে বিগত একুশ ও চব্বিশ সালের নির্বাচনে। সেই কারণেই এবার সরাসরি পছন্দের লিস্ট তৈরিতে মনোযোগ। সেই টার্গেট পূরণের দিকে এগিয়েও গিয়েছে কমিশন। কিন্তু সেই নির্লজ্জ ব্যবহারও ব্যুমেরাং হতে বাধ্য।
আজকের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা নিয়ে বিভ্রান্তি কাটার বদলে তা বাড়ছে। ৭ কোটি ৪ লক্ষ ৫৯ হাজারের তালিকায় যাঁদের ঠাঁই হল না কিংবা যাঁদের নামের পাশে ডিলিটেড লেখা, তাঁরা কী করবেন? এটাই কি চূড়ান্ত, এই তালিকার ভিত্তিতেই ভোট হবে? নাকি এই তালিকা একটা দায়সারা স্টেটাস রিপোর্ট মাত্র! তারপর আর একদফা শুনানির হেনস্তা পেরিয়ে পরবর্তী লিস্টের অপেক্ষা। সাপ্লিমেন্টারি তালিকা কবে, ক’দফায় বেরবে, সবকিছু নিয়েই ধোঁয়াশা তীব্র। এখানেই শেষ নয়, কটা সাপ্লিমেন্টারি লিস্ট বেরবে। মনোনয়ন পেশের শেষদিনের মধ্যে পরবর্তী তালিকা না বেরলে আসন্ন বিধানসভা ভোটে তাঁরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না। এটাই নিয়ম। সেক্ষেত্রে একজন যোগ্য নাগরিক ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, ৬০ লক্ষ ভোটারের লজিকাল ডিসক্রিপেন্সির সমাধান হওয়া বাকি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে জেলায় জেলায় বিচারকরা বকেয়া সব সমস্যার নিষ্পত্তি করবেন। কিন্তু কতদিনে সেই কাজ শেষ হবে? তার কোনো সময়সীমা শীর্ষ আদালত বেঁধে দেয়নি। দেওয়া সম্ভবও নয়। সমস্যাটা এখানেই। সুপ্রিম কোর্ট জানে, বঙ্গে দুয়ারে কড়া নাড়ছে ভোট। তবু নিষ্পত্তির সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। প্রমাণ হচ্ছে, সব কাজ সময়ে শেষ করা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের আস্ফালন স্রেফ জুমলা ছিল। 
শুরু থেকেই এই বাংলায় কেউ এসআইআরের বিরোধী নন। কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ঠিক ভোটের আগে এত বড়ো রাজ্যে এই জটিল প্রক্রিয়াকে চাপিয়ে দেওয়া নিয়েই প্রশ্ন উঠছে বারবার। প্রশ্ন উঠেছে তামিলনাড়ু, কেরলেও। কারণ বিজেপির (পড়ুন মোদিজির) সর্বগ্রাসী দখলের খিদে এখনও থমকে রয়েছে এই তিন রাজ্যেই। সেই প্রশ্ন ওঠা যে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে বিগত ১৫ দিনে। যে রাজ্যে আর দেড় মাসও বাকি নেই নির্বাচনের, সেখানে তালিকাই চূড়ান্ত হচ্ছে ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে। তাও সাপ্লিমেন্টারি লিস্টের খাঁড়া মাথায় নিয়ে। নির্বাচন কমিশনের এই ব্যর্থতা মেনে নেওয়া কি সম্ভব? পাঁচ বছর আগে একুশ সালের বিধানসভা ভোটের দিনক্ষণ ঘোষণা হয়েছিল ২৬ ফেব্রুয়ারি। ভোট হয়েছিল আট দফায়। আর এবার যা পরিস্থিতি তাতে মার্চ মাসের অর্ধেক কেটে যাবে। তারপরও সব অভিযোগের নিষ্পত্তি হবে কি না নিশ্চিত নয়। চূড়ান্ত তালিকার পর অন্তত দশদিন অভাব-অভিযোগ জানানোর সময় দিতেই হবে নাম বাদ যাওয়া ভোটারদের। প্রথম পাঁচ দিন ডিইও এবং তারপর সিইওকে অভিযোগ জানানোর রীতি। এরই মধ্যে কমিশনের ফুল বেঞ্চ রাজ্য ঘুরে প্রস্তুতি খতিয়ে দেখবে। এবার আবার বাড়তি আশঙ্কা, নাম বাদের অঙ্ক বাড়লে জেলায় জেলায় অশান্তি শুরু হতে পারে। তা আন্দাজ করেই দু’দফায় আগাম প্রায় ৪৮০ কোম্পানি আধাসেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাহিনী আসতেও শুরু করেছে। ভোটের প্রচার সপ্তমে পৌঁছলে সংখ্যাটা দ্বিগুণ, আড়াইগুণও হতে পারে। চব্বিশের লোকসভা ভোটে ৯২০ কোম্পানি দিয়ে ৭ দফায় মতদান সম্পূর্ণ হয়েছিল। এবার সময় কম। মধ্য মার্চ কিংবা তৃতীয় সপ্তাহে নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা হলে দুই কি তিন দফায় ভোট শেষ করতে হবে। কারণ বর্তমান সরকারের মেয়াদ মে মাসের প্রথম সপ্তাহেই শেষ। তার মধ্যে ফল প্রকাশ করে নতুন সরকারের শপথগ্রহণই দস্তুর।
সব পক্ষই বলছে, খেলা হবে। ভয়ঙ্কর খেলা। কিন্তু ভুললে চলবে না, বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়েই খেলতে হবে, তাকে জখম করে নয়।  নির্বাচন আসবে যাবে। জয় পরাজয়ও যথারীতি থাকবে। কিন্তু সেই শক্তিকেই জয়ী করতে হবে যারা বাংলাকে চেনে, বাংলার মাটির ঘ্রাণ যাদের শিরায় উপশিরায়। বহিরাগতদের ঢং আর ভড়ং-এ ভুললে চলবে না। এই ক্ষমতা দখলের খেলা যেন চিরস্থায়ী অভিশাপ হয়ে না দাঁড়ায়। ১৬০০ কিলোমিটার দূরে দিল্লিতে বসে কেউ রিমোটে বাংলাকে পরিচালনা করবে, এই ব্যবস্থা বাঙালির বুকে কুঠারাঘাতের চেয়েও বিষময় হবে। কোনোভাবেই অবাঙালি দৌরাত্ম্য মানতে পারব না। পানের পিকের দুঃসহ ঘিনঘিনে সংস্কৃতি আমদানি করা চলবে না। এই বঙ্গের মূল্যবোধকে সম্মান দিয়ে এবং অন্তরাত্মাকে অক্ষত রেখেই নির্বাচনের মাঠে খেলতে হবে। বিগত দু’বছরের যাবতীয় বিরোধী ইস্যু ধুয়ে গিয়ে মুখ্য হয়েছে এসআইআরের হেনস্তা। কাজের চাপে মৃত ৬১ জন বিএলওকে চাকরি দেওয়ার ঘোষণা করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। যেসব পরিবার নাম বাদ যাওয়ার চোরাগলিতে প্রিয়জনকে হারিয়েছেন তাঁদের পাশেও রাজ্য সরকার দাঁড়িয়েছে। আর গেরুয়া দল শুধু রথ চালাচ্ছে। এরমধ্যেই প্রচ্ছন্ন  ইঙ্গিত ক্ষমতা পেলে বুলডোজার চলবে। 
এখন নির্বাচন কমিশনই ঠিক করুক ওরা নির্যাতন কমিশন হবে, ক্রীতদাস কমিশন হবে নাকি বিজেপি কমিশন হবে। ‘জো হুজুর’ সাংবিধানিক সংস্থা কিন্তু গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ