Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

আপনারাই সব জানেন, আমরা কিছু জানি না?

কোন ইতিহাস ভালো, কোন ইতিহাস খারাপ সেটা আপনারা ঠিক করে দিচ্ছেন। কোন প্রধানমন্ত্রী ভিলেন আর কোন প্রধানমন্ত্রী নায়ক, সেটাও আপনারাই স্থির করবেন

আপনারাই সব জানেন, আমরা কিছু জানি না?
  • ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

সমৃদ্ধ দত্ত: কোন ইতিহাস ভালো, কোন ইতিহাস খারাপ সেটা আপনারা ঠিক করে দিচ্ছেন। কোন প্রধানমন্ত্রী ভিলেন আর কোন প্রধানমন্ত্রী নায়ক, সেটাও আপনারাই স্থির করবেন। ইংরেজ আমলের শিক্ষা ভুল ছিল অথবা ঠিক ছিল, সেটা আপনারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। কোন খাবার খাওয়া উচিত, কোন খাদ্য পরিত্যাজ্য, সেটাও আপনাদের নির্দেশ অনুযায়ী মানতে বাধ্য নাগরিকরা। কোন ভাষা রাষ্ট্রভাষা হওয়া দরকার সেই ফতোয়া আপনারা দেবেন। কোন ধর্ম কে গ্রহণ করবে, কোন ধর্ম পালনের নিয়মকানুন কী, কোন ধর্মে কী কী আচার বিচার ভালো, কোনটা খারাপ, কোন ধর্মকে দেশছাড়া করতে হবে, কোন ধর্মাবলম্বীদের অন্য ধর্মে দীক্ষিত করা আশু প্রয়োজন, এসবও আপনারা স্থির করে দিচ্ছেন। ইংরাজি ভাষা হল ঔপনিবেশিক একটি দাসত্ব, তাই ওই ভাষাকে বর্জন করতে হবে। এই উপদেশ আপনারা অনায়াসে দিয়ে চলেছেন। ১৯৪৭ সালের পর থেকে যে শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়াশোনা করে হাজার হাজার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, গবেষক, আমলা, বিজ্ঞানী, সরকারি বেসরকারি সংস্থা অথবা বহুজাতিক সংস্থার কর্তা হয়ে ভারতের নাম উজ্জ্বল করেছেন, করছেন, সেই শিক্ষাব্যবস্থাকে ভ্রান্ত তকমা দিয়ে আপনারা সব বদলে দিয়ে বোঝাতে চাইছেন আপনাদের শিক্ষাক্রম সর্বশ্রেষ্ঠ। আগের সব ভুল ছিল। অথচ ওই আগের শিক্ষাতে আপনারাও স্কুল কলেজ পাশ করেছেন। আর নিজেদের সবজান্তা হিসেবে প্রতিপন্ন করছেন সেই শিক্ষার জোরেই। 

Advertisement

নরেন্দ্র মোদি সরকার, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ, বিজেপির কাছে একটি প্রশ্ন হল এই যে, ১৯৪৭ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়সীমার ভারতে সব ভুল হয়েছে, আর গত ১২ বছরে সব ঠিক করছেন আপনারা? এই বুদ্ধিহীন আত্মবিশ্বাসের সোর্স কী? একবার ভেবে দেখুন যে, আপনারা হঠাৎ ১৪৬ কোটি মানুষকে ন্যায় অন্যায়, নীতি, দর্শন, আদর্শ শেখানোর ইজারা নিচ্ছেন কেন? মানে এই দায়িত্বটা ঠিক কে দিয়েছে আপনাদের? 
দক্ষিণ ভারতে আপনারা জিরো। নিজেদের একক শক্তির কোনো সরকার নেই। বাংলা, বিহার, ঝাড়খণ্ডের মতো পূর্ব ভারতে নিজেদের একক শক্তির একটিও সরকার নেই। ২০২৪ সালে আপনাদের ভারতবাসী গরিষ্ঠতাই দেয়নি। মাত্র ২৪০ আসন। বিরোধীরা ২৩৮। তা সত্ত্বেও ‘আমরা সব জানি’, ‘আমরাই ঠিক, অন্যরা ভুল’, ‘আমরা যা বলব সেটাই সকলকে মানতে হবে’, আমরা বেশি বুঝি, অন্যরা কম বোঝে’, ‘আমরা শিক্ষক অন্যরা ছাত্র’ এরকম অহংকারী নির্বুদ্ধিতার রহস্য কী? 
১২ বছর আগে আপনারা কোথায় ছিলেন? স্বাধীনতার পর ভারত নামক দেশ ৮০ বছর ধরে চলেনি? ধ্বংস হয়ে গিয়েছে? কী খারাপ হয়েছে ভারতের? ভারত ৮০ বছর ধরে উন্নতি করেছে? নাকি অবনতি হয়েছে? ইতিহাস- টিতিহাস যে খুব বেশি পড়েননি আপনারা সেটা তো আপনাদের মন্ত্রী সান্ত্রিরা মুখ খুললেই স্পষ্ট হয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনাদের পূর্বসূরিদের কোনো ভূমিকাই নেই, সেটা কি আমাদের দোষ? তাহলে, আমাদের মতো নাগরিককে আপনারা হঠাৎ শিক্ষিত করার ব্রত নিলেন কেন? এরকম কোনো গণভোট হয়েছে যেখানে মানুষ ভোট দিয়ে বলেছে যে, পুরানো ভারতের শিক্ষা, সমাজ খুব খারাপ, আপনারা আসুন আমাদের উদ্ধার করুন? বলেছে কেউ? আপনাদের ভোট দেওয়া হয়েছে যেভাবে ৮০ বছর ধরে বারংবার সরকার পালটিয়েছে সেরকমই আর একটি রাজনৈতিক পালাবদল। অতীতেও সরকার বদলেছে। আগামী দিনেও বদলাবে। আপনারা ২০৪৭ সাল পর্যন্ত থাকবেন নাকি? ২০২৪ সালই তো বুঝিয়ে দিয়েছে যে, আপনাদের বিদায়কাল শুরু হয়েছে। আপনাদের থেকে আরও ভালো সরকার আসতে পারে। আপনাদের থেকে আরও খারাপ সরকার আসতে পারে। এরকমই হয়েছে অতীতে। ৫ হাজার বছরের ভারতবর্ষে হঠাৎ নিজেদের অমর, সর্বশক্তিমান, সর্বনিয়ন্তা মহাকাল বলে ভাবতে শুরু করলেন কেন? সম্রাট অশোক দুর্বল হয়ে গিয়েছিলেন। প্রবল জনপ্রিয় থাকা অবস্থায় অটলবিহারী বাজপেয়ির সরকারও পরাজিত হয়েছে। কতকিছুই দেখেছে এই ভারত। আর আপনারা হঠাৎ নিজেদের ভারতভাগ্যবিধাতা ভাবছেন! এতটা মধ্যমেধার সরকার কি আগে এসেছে? মনে হয় না!  
১৫২৬ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত সময়সীমায় বিস্তৃত যে সাড়ে তিনশো বছরের মোগল ইতিহাস, সেটি মুছে দেওয়া হয়েছে স্কুলের পাঠক্রম থেকে। অর্থাৎ আগামী প্রজন্ম জানবেই না যে,ওই সময়সীমায় আগ্রা, দিল্লিতে কারা ছিল শাসক, কী কী ঘটেছিল, এই যে নানারকম ঐতিহাসিক স্থাপত্য এসব কারা তৈরি করল, কেন করল ইত্যাদি জানার দরকার নেই। আপনারা মনে করছেন সেসব জানার দরকার নেই।  এই যে হঠাৎ অষ্টম শ্রেণির পাঠক্রমে বিচারবিভাগের দুর্নীতি নামক অধ্যায় প্রবেশ করিয়ে ভাবলেন বিরাট এক কাজ করলাম। সুপ্রিম কোর্ট একটি ধমক দিতেই সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখলেন। কোর্টে এসে ক্ষমাও চাইলেন। 
নতুন দিল্লির কারিগরের নাম এডুইন লুটিয়েন্স। রাষ্ট্রপতি ভবনে তাঁর মূর্তি ছিল। তাঁর মূর্তি তো সরানোর দরকার ছিল না।  চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারীর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন খুব ভালো করেছেন। তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদী ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির তীব্র নিন্দা করতেন, সেইসব ইতিহাস তো আর আপনারা জানেন না। স্বাভাবিক। তাই তাঁর মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন খুব খুশি হয়েছে ১৪৬ কোটি মানুষ। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আধুনিক দিল্লির কারিগর লুটিয়েন্সকে ভুলে যেতে হবে! লুটিয়েন্সকে ভুলতে চাওয়া স্বাভাবিক। সুন্দর এক নগরী দিল্লিকে যেভাবে ধ্বংস করেছেন আপনারা পরিকল্পনাহীন সব কাজকর্ম করে, যে চেনাই যায় না আজকাল! 
আমাদের দেশ। তার ইতিহাস আমি জানব নাকি জানব না সেটা তো আমরা ঠিক করব? আপনাদের কে দায়িত্ব দিয়েছে আমাদের হয়ে আমাদের শিক্ষাচেতনা নিয়ন্ত্রণ করার? আমরা বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দেব সেইসব হিন্দু রাজাদের যারা বহিরাগত মুসলিম শাসক মহম্মদ ঘোরীকে এদেশে পৃথ্বীরাজ চৌহানকে হারিয়ে দিল্লি দখল করতে সাহায্য করেছে। আমরা ঔরঙ্গজেবকে ভিলেন বলে মনে করব তার হিন্দুবিরোধী তাবৎ কার্যকলাপের জন্য। মারাঠা হিন্দু ভাস্কর পণ্ডিত বাংলাকে ছারখার করে দিয়েছিল, এটা আমরা ইতিহাস পড়ে জানব। সিরাজদ্দৌলা যে একজন দুর্বিনীত, অত্যাচারী যুবক সেটাও আমরা ইতিহাস পড়ে জানি। ডেভিড হেয়ার আর রবার্ট ক্লাইভ দুজনেই বিদেশি। তাই বলে তো তাঁরা দুজনে আমাদের কাছে একই নয়? এসব আমরা বুঝব। আমরা যারা ট্যাক্স দিই, ভোট দিই, সরকার নির্বাচন করি সেই আমরা দেশ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেব। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ এসব নিয়ে আপনারা যা বলবেন সেটাই ঠিক, আমাদের শিক্ষার দাম নেই, এটা কে বলল? কেমন যেন নাগরিকদের অভিভাবক হয়ে যাচ্ছেন আপনারা! 
আপনাদের বুদ্ধি, শিক্ষা, চেতনা, ইতিহাসজ্ঞান, নীতি, নৈতিকতা ১৪৬ কোটি নাগরিকের থেকে উন্নত, এটা কবে থেকে ঠিক হল? কে ঠিক করে দিয়েছে? কীভাবে প্রমাণ হল? আপনারা দেশের কোটি কোটি শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী, সাধারণ মানুষ, খেটে খাওয়া কর্মীর দলের থেকে সব বিষয়েই বেশি বেশি জ্ঞানী এই সার্টিফিকেট কোথা থেকে ইস্যু হয়েছে? আপনাদের কে বলেছে যে, নীতি আয়োগ ভালো, যোজনা কমিশন খারাপ ছিল? আপনাদের কে বলল, পুরানো পার্লামেন্ট ভবন বদলাতে চাইছে ভারতবাসী? কেউ কি বলেছে? 
ভারতবাসী ইংরাজি ভাষা শিক্ষা, বিশ্ব ইতিহাস, বিশ্ব সাহিত্য পড়তে চাইছে না, এরকম কোনো দাবি কেউ করেছে আপনাদের কাছে? তাহলে হঠাৎ সভা সমাবেশে ইংরেজিয়ানাকে দাস মনোবৃত্তি বলতে শুরু করেছেন কেন? আধুনিক শিক্ষিত প্রজন্মকে প্রশ্ন করেছেন যে, তারা কী চায়? বেশ কয়েক সপ্তাহ তো হয়ে গেল, বন্দেমাতরম পূর্ণাঙ্গ গান মুখস্থ করতে পেরেছেন? খাতা না দেখে গাইতে পারবেন তো? এক বছর পরও যদি আপনারা এবং আপনাদের অনুগামীরা সেটা না পারেন, তাহলে ভারতবাসী প্রশ্ন করবে যে, হঠাৎ ওই পরিবর্তন করতে গেলেন কেন? কেন মনে হল যে, বন্দেমাতরম বেশি গুরুত্বপূর্ণ? জনগণমন কম গুরুত্বপূর্ণ? আপনারা হঠাৎ কয়েকজন মিলে ঠিক করছেন কেন যে নাগরিকত্ব প্রমাণ চাওয়া হবে বারংবার? আমাদের বেনাগরিক করার অধিকারটা কে দিল?
জনতার কীসে ভালো হবে সেটা বুঝলে তো 
১২ বছর ধরে ইচ্ছাকৃতভাবে জনতাকে লাইনে 
দাঁড় করাতেন না! নোট বদলের লাইন। গ্যাসে 
আধার লিংকের লাইন। কেওয়াইসির লাইন। এসআইআরের লাইন। 
জনতা চাইছে আয় বাড়াতে। জনতা চায় সঞ্চয় হোক। জনতা চায় চাকরি পাই যেন। জনতা চায় ব্যবসার সুযোগ বাড়ুক। শিক্ষার খরচ কমুক। চিকিৎসার খরচ কমুক। ওষুধের খরচ কমুক। 
১২ বছর ধরে স্লোগান, ক্যাচলাইন, নীতিবাক্য, জ্ঞান বিতরণ শুনে শুনে ক্লান্ত মানুষ। আমাদের দেশে ‘জাতীয় শিক্ষক’ অনেক আছেন। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা নীতিবাক্য জেনে নেব। আপনারা সরকারটা ঠিক করে চালান! জাতির গার্জিয়ান হয়ে যাচ্ছেন কেন?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ