কোনও কোনও সময় সরাসরি বলা কথার চেয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা অনেক বেশি তাৎপর্য বহন করে। ভদ্রতার খাতিরে মুখের উপর সত্যি কথাটা না বলে আকারে ইঙ্গিতে তা বুঝিয়ে দেওয়া অনেক ক্ষেত্রেই সৌজন্যের পরিচায়ক। আপনার ৭৫ বছর বয়স হলে মানে মানে পদ ছেড়ে দিয়ে অবসর গ্রহণ করুন। না, বিজেপি বা আরএসএস-এর কোনও শীর্ষকর্তা সরাসরি এমন পরামর্শ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে দিয়েছেন বলে শোনা যায়নি। কিন্তু গত বুধবার নাগপুরে এক অনুষ্ঠানের মঞ্চে দাঁড়িয়ে আরএসএস-প্রধান মোহন ভাগবত ইঙ্গিতে যা বলেছেন, ধারে ও ভারে তার ওজন কম নয়। উপলক্ষ ছিল মোরোপান্ত পিংলের জীবনের উপর লেখা একটি ইংরেজি বই প্রকাশের অনুষ্ঠান। তাঁর স্মৃতিচারণ করে ভাগবত বলেন, মোরোপান্ত একবার বলেছিলেন, ৭৫ বছর বয়সে শাল দেওয়ার অর্থ আমি জানি। এই বয়সে যে সরে যেতে হবে সেই শিক্ষা তিনি দিয়েছিলেন। সরসঙ্ঘ প্রধানও মনে করেন, ৭৫ বছরের পর নিজে থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত। অন্যদের অর্থাৎ নতুনদের কাজ করতে দেওয়া উচিত। এই তাৎপর্যপূর্ণ বার্তায় কোথাও মোদির নাম করেননি সঙ্ঘপ্রধান। কিন্তু তাঁর ‘ইশারা’ বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর ৭৫ পূর্ণ করছেন মোদি। ১১ সেপ্টেম্বর ভাগবত নিজেও ৭৫-এর শরিক হচ্ছেন। আবার সেপ্টেম্বরেই সঙ্ঘের একশো বছর হচ্ছে। শোনা যাচ্ছে, মোহন ভাগবত আর পদে থাকবেন না। তাঁর উত্তরসূরিও ঠিক হয়ে গিয়েছে। এই প্রেক্ষিতে মোদিকে ইঙ্গিতে ধর্মপালনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে চাপ বাড়ালেন বিজেপির চালিকাশক্তি আরএসএস-এর প্রধান।
চর্চা অবশ্য গত একবছর ধরেই চলছে। সেইসঙ্গে সমালোচনাও। ঘটনা হল, লালকৃষ্ণ আদবানি, মুরলি মনোহর যোশির মতো শীর্ষস্তরের নেতাদের বয়স ৭৫ বছর হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁদের বাণপ্রস্থে পাঠিয়েছিলেন স্বয়ং মোদি। তাঁর ‘বিধান’ ছিল, ওই বয়সের পর সরে যেতে হবে গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে। প্রশ্ন উঠেছে, তিনি কি নিজের ক্ষেত্রে এই নিয়ম মেনে নেবেন? সুবিচার করবেন নিজের প্রতি? সেই সম্ভাবনা অবশ্য ক্ষীণ। মোহন ভাগবত ইঙ্গিতে যে বার্তাই দিন, আদবানি যোশিদের উদাহরণ টেনে বিরোধীরা যতই খোঁচা দিন, মোদি নিজে প্রধানমন্ত্রীর পদ আঁকড়ে থাকতে কার্যত মরিয়া। এবং এই কারণেই বারো বছর পর নাগপুরে সঙ্ঘের সদর কার্যালয়ে তাঁর দেখা মিলেছে। বিজেপির অন্দরের খবর, দলের সর্বভারতীয় সভাপতির নাম ঠিক করার পাশাপাশি নিজের প্রধানমন্ত্রীর কুর্সি ধরে রাখতেই নাগপুরে গিয়েছিলেন মোদি। তাঁর মন্ত্রিসভার সেকেন্ড ইন কমান্ড অমিত শাহ একধাপ এগিয়ে আগেই জানিয়ে দিয়েছেন, এর পরের অর্থাৎ ২০২৯-এর লোকসভা ভোটের পর ৭৯ বছরের মোদিই হবেন প্রধানমন্ত্রী! তার মানে, মোদির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম চায় বিজেপি। বিজেপির একটা অংশ যে মোদির অবসর চায় না তা বোঝাতে সেপ্টেম্বরে মোদির ৭৫-এর জন্মদিন ধুমধাম করে পালন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অতএব, সঙ্ঘপ্রধান ভাববাচ্যে যাই বলার চেষ্টা করুন, যতই চাপ বাড়ান, নরেন্দ্র মোদিকে ৭৫-এ দাবায়ে রাখা যাবে বলে মনে হয় না।
এ কথা ঠিক, ২০১৪ এবং ২০১৯-এর লোকসভা ভোটে বিজেপির বিপুল জয়ের পিছনে ‘মোদি-ম্যাজিক’ চুম্বকের মতো কাজ করেছে। কিন্তু ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানো এটাও বুঝিয়ে দিয়েছে, তাঁর ভাবমূর্তি ক্রমশই ফিকে হচ্ছে। বাস্তব সত্য হল, লোকসভা ভোটে খারাপ ফলের পর ২০২৪ এবং ২০২৫-এ বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভা ভোটে বিজেপির ত্রাতা হয়ে আরএসএসকে মাঠে নামতে হয়েছে। এতে কিছুটা হলেও গেরুয়া শিবিরের মানরক্ষা হয়েছে। তাছাড়াও সরকার পরিচালনায় বেকারত্ব, গরিবি, অসাম্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে মোদি সকারের ব্যর্থতার দিকে একাধিকবার আঙুল তুলতে দেখা গিয়েছে নাগপুরকে। অভিযোগ উঠেছে, কার্যত আরএসএসকে বাইপাস করে মোদি সরকার চালাচ্ছেন। বস্তুত মোদি জমানায় আরএসএস-বিজেপি টানাপোড়েন বারবার প্রকাশ্যে এসেছে। সম্ভবত এসব বুঝেই নিজের পদ অটুট রাখতে রফা করতে নাগপুর ছুটে গিয়েছিলেন মোদি। সেখানে আরএসএস সম্পর্কে এমন কিছু ভালো ভালো কথা বলেছিলেন, যা তাঁর এই দীর্ঘ প্রধানমন্ত্রিত্বের কালে আগে শোনা যায়নি। তবে তাতেও যে চিঁড়ে ভেজেনি, আরএসএস প্রধানের ইঙ্গিতে তা পরিষ্কার। কিন্তু মোদি রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে মিশিয়ে প্রচারে দক্ষ হলেও নিজে নীতিধর্মের কথা শোনেন, এমন নজির কম। কাজেই তাঁর অবসর নিয়ে আরএসএস যাই চাক, তিনি শুনলে তো!