Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬

আতঙ্ক-বিভাজনের ক্ষত এখনও টাটকা, ভরসা ফেরানোর কঠিন লড়াই কাশ্মীরে

আতঙ্ক-বিভাজনের ক্ষত এখনও টাটকা, ভরসা ফেরানোর কঠিন লড়াই কাশ্মীরে
  • ২৪ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শুভজিৎ অধিকারী, শ্রীনগর: ‘যেথা গৃহের প্রাচীর/ আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী/ বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,’—ভূস্বর্গ এখন সেই পৃথিবীকে কাছে টানতে প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে। এমন চেষ্টার কী কোনও প্রয়োজন ছিল? যদি না নারকীয় জঙ্গি হামলার সাক্ষী থাকত পহেলগাঁও? পর্যটকদের ধর্ম বেছে গুলি করেছিল সন্ত্রাসবাদীরা। সেই বিভাজনের চেষ্টা, সেই আতঙ্ক কাশ্মীরকে টুকরো টুকরো করে না দিলেও তার বুকে বড়সড় ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। সেই ক্ষত মেরামতের কঠিন লড়াই চালাচ্ছেন কাশ্মীরিরা।

Advertisement

ঠিক ত্রিশ দিন আগে ২৬ জন নিরীহ পর্যটকের তাজা রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছিল পহেলগাঁওয়ের বৈসরণ উপত্যকার সবুজ ঘাস। এভাবে ধর্মপরিচয় জেনে জঙ্গিদের গুলি চালানোর ঘটনা ভারতে এই প্রথম। কাশ্মীরিদের সবার বুকে কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছে পহেলগাঁওয়ের বর্বর হত্যাকাণ্ড। এই একমাসে বদলে গিয়েছে অনেক কিছুই। তাঁরা শোকাতুর হয়েছেন। তেরঙ্গা হাতে প্রতিবাদে ফেটে পড়েছেন। জঙ্গিদের তৈরি বিভাজনের চওড়া ফাটল মেরামতে চেষ্টার কোনও কসুর করছেন না। শুক্রবার, ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের বিশেষ প্রার্থনার দিন। সামান্য দোকানি থেকে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত লোকজন, সকলেই জুম্মার নামাজ সেরে এসে ফাঁকা দোকানে কিংবা শিকারায় বসে। বলছেন, ‘আজ আমাদের প্রার্থনা একটাই—এই অখণ্ড অবসরের দ্রুত অবসান হোক। পর্যটকদের ভরসা ফিরুক কাশ্মীরিদের উপর!’
আস্থা ফেরাতে চেষ্টাও কম করছেন না হোটেল, হোম স্টে, রেস্তরাঁ, ঐতিহ্যবাহী পোশাক আশাকের দোকান মালিক থেকে শুরু করে ট্যাক্সি-অটোচালক কিংবা শিকারার মাঝিরা। দু’-একজন পর্যটক এলেই বুকে আঁকড়ে সেলফি তুলছেন। সেসব পোস্টও করছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়। শুধু এইটুকু জানাতে...আম কাশ্মীরিরা কর্ম বোঝে, ধর্ম নয়!
শ্রীনগরের ‘নবান্ন’ বা মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয়ে কাজকর্ম স্বাভাবিক গতিতে চলছে। ভরা অফিস টাইমে শুধু রাস্তা নয়, বাজারহাটেও ভালো ভিড়। কিন্তু পাশেই জাফরান ও ড্রাই ফ্রুটের দোকানদার সইদ নাজির মাছি তাড়াচ্ছেন। কাঁদো কাঁদো গলায় বলছিলেন, ‘গত বছর ঠিক এই দিনে জিনিস বিক্রি করতে হাঁফিয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু এবার দোকানের তিনজন কর্মীকে ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়েছি। আমার একার হাতেই কোনও কাজ নেই। ছ’টা হাতের কিই বা প্রয়োজন! বিশ্বাস করুন, কাশ্মীরিরা কোনওদিন পহেলগাঁও গণহত্যাকে সমর্থন করে না। তাই প্রথম দিন থেকেই ধর্ম, দল নির্বিশেষে প্রতিবাদ মিছিলে হেঁটেছি...।’
কিছুদূর গেলেই রাস্তার উপর সাইনবোর্ড, ‘কাশ্মীর আর্ট’। কাশ্মীরি হস্তশিল্পের সেই দোকানেও একটা লোক নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মালিক বলছিলেন, ‘নিরস্ত্র নিরপরাধ পর্যটকদের যারা হত্যা করেছে, তারা কাপুরুষ। ওদের এমন শাস্তি দেওয়া হোক যাতে জঙ্গিরা আর কোনওদিনমাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে।’
ঝকঝকে ৪৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে গাড়ি ছুটছে সোনমার্গের দিকে। গুন্দ বাজারে চেকপোস্টে দাঁড়াতে হল। ইনসাসধারী সেনাদের মাঝে স্বতঃস্ফূর্ত ভিড় বাজারে। একটু দূরে কুলান বয়েজ’ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল। সামনের মাঠে একদল পড়ুয়া খেলছে। বাকিরা বাড়ির পথে। সব স্বাভাবিক। কিন্তু দিল্লি ধাবার সামনের পার্কিং প্লেস শুনসান।এই একমাসে বদল এটাই... কাশ্মীরের ভিতর আর এক কাশ্মীর! তবে, টুকরো টুকরো হয়ে যায়নি।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ