সুকান্ত বসু, কলকাতা: কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোর মধ্যে অন্যতম হল পাথুরিয়াঘাটার রাজবাড়ির দুর্গাপুজো। এটি খেলাতচন্দ্র ঘোষের পুজো নামেও খ্যাত। তিনি ছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংসের দেওয়ান রামলোচন ঘোষের নাতি। উত্তর কলকাতার এই রাজবাড়ির প্রবেশপথে রয়েছে দু’টি বিশাল মাপের সিংহ। নানা স্থাপত্যে মোড়া এই বাড়ির খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে রয়েছে অজস্র ইতিহাস। বিশাল বিশাল ঝাড়বাতি এই বাড়িকে দিয়েছে অন্য মাত্রা। বাড়িতে কাচের ভিতর শোভা পাচ্ছে খেলাতচন্দ্র ঘোষের আবক্ষ মূর্তি। ১৮৮৪ সালে এই বাড়ির নির্মাণকাজ শুরু হয়। মূল গেটের বাইরে লাগানো রয়েছে ‘হেরিটেজ’বোর্ড।
এখানকার দুর্গাপ্রতিমা একচালার ডাকের সাজের। প্রতিমা আসে কুমোরটুলি থেকে। অবশ্য প্রতিমার সাজগোজ হয় বাড়ির ঠাকুর দালানে। মাকে পরানো হয় বিভিন্ন অলঙ্কার। এখানে দেবীর বাহন ঘোড়ামুখী সিংহ। রথযাত্রার দিন কাঠামো পুজোর মধ্যে দিয়ে দেবীর আবাহনের দিন গোনা শুরু। দশমী বাদ দিয়ে প্রতিদিনই হয় কুমারি পুজো। পাঁচ থেকে ন’বছরের বালিকাদের বেছে নেওয়া হয় এই পুজোর জন্য। পশুবলি বা ফল বলির পরিবর্তে ঘোষবাড়ির পুজোয় চিনির মণ্ডকে বলি দেওয়া হয়। পুজো হয় শাক্ত মতে। মূল আকর্ষণ দশমীর দিন। সেদিন হয় ‘কনকাঞ্জলি’। দেবীকে বিদায় জানানোর আগে এই প্রথা পালন করা হয়। একটা সময় ছিল, যখন এই প্রতিমা কপিকলের মাধ্যমে বিসর্জন দেওয়া হত। দেবীকে কাঁধে চাপিয়ে বাড়ি থেকে গঙ্গার ঘাট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। পুজোয় মাকে অন্নভোগ দেওয়া হয় না। পরিবর্তে দেওয়া হয় বিশাল নৈবেদ্য। থাকে নানা ফল, নাড়ু। এছাড়াও থাকে লুচি, বিভিন্ন ধরনের ভাজা, আলুর দম, ছোলার ডাল, পনির, ও নানা রকমের মিষ্টি। সন্ধ্যায় ধুনুচি নাচ উল্লেখযোগ্য। অতীতে দশমীর দিন প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় উড়িয়ে দেওয়া হত নীলকণ্ঠ পাখি। এখন সেই পাখি মেলে না। তাই প্রতীকী হিসাবে মাটির নীলকণ্ঠ পাখি মায়ের সঙ্গে বিসর্জন দেওয়া হয় গঙ্গায়। এই পুজো দেখতে বহু মানুষ আসেন রাজবাড়িতে।
পাথুরিয়াঘাটা রাজবাড়িকে ঘিরে রয়েছে নানা ইতিহাস। জানা যায়, এই বাড়িতে এক সময় এসেছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস ও তাঁর স্ত্রী। পাশাপাশি রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, মহাত্মা গান্ধী, ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদের মতো মানুষের পা পড়েছে এই ভূমিতে। হুতোম প্যাঁচার নকশায় আছে তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী খেলাতচন্দ্র ঘোষকে ঘিরে নানা কথা। সংগীত জগতেও এই পরিবারের বিশেষ অবদান ছিল। একটা সময় সারা বাংলা সংগীত সম্মেলন শুরু হয়েছিল এই পরিবারের উদ্যোগে। সেখানে বিখ্যাত সেতার শিল্পী রবিশঙ্কর ও তাঁর গুরু আলাউদ্দিন খানের মতো ব্যক্তিত্ব অংশ নিয়েছিলেন সেই সম্মেলনে।