প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্রাম: দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন হয়ে যায়। কিন্তু পুজো শেষ হয় না। ঠাকুরদালানে চলে অপরাজিতার পুজো। বনেদি পরিবারের স্বগোত্রীয় বংশধরদের হাতে অপরাজিতার লতা পরিয়ে দেওয়ার রীতি আজও অটুট। প্রাচীন রীতি ও পরম্পরা আঁকড়ে ১৬৪ বছরে পা দিল গোপীবল্লভপুরের জানাঘাটির বক্সিবাড়ির দুর্গাপুজো।
ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশার সীমানায় ছোট্ট গ্ৰাম জানালাটি । পাশ দিয়ে বয়ে চলছে সুবর্ণরেখা রেখা। সুদূর অতীতে বালি যাত্রার উদ্দেশ্য বণিকদের পণ্যবাহী জাহাজ ভীড় তো নদী ঘাটে । বালি যাত্রার উৎসব আজও বহন করে চলেছে এই গ্ৰাম । জানাঘাটি ছিল মুয়ুরভঞ্জ রাজাদের অধীন এলাকা। বক্সিবাড়ির পূর্বপুরুষেরা দানশীল বলে খ্যাতি ছিল রাজপরিবার থেকে তাঁদের‘বক্সি’উপাধি দেওয়া হয়েছিল। সেই থেকে বক্সী পরিবারের পরিচিতি। বাড়ির পুজোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য, দশমীর রাতে প্রতিমা বিসর্জনের পরেও অপরাজিতার পুজো হয়।
পরিবারের সদস্যদের সুস্থতা ও মঙ্গল কামনায় দশমীর রাতে ঠাকুর দালানে অপরাজিতার পুজো হয়। পুজোর পর রীতি মেনে অপরাজিতার লতা বালা বাড়ির সদস্যদের হাতে পরিয়ে দেওয়া হয়। দেবী প্রতিমার সাথেই থাকে জয়া ও বিজয়ার প্রতিমা। ষষ্ঠীর দিন সকালেবেলগাছ বরণ করে শুরু হয় পুজো। সপ্তমীর সকালে সুবর্ণরেখা নদী থেকে জল এনে বাড়ির মূল উঠানে ঘট স্থাপন করা হয়। মানকচুর পাতাকে কলাবধূর আদলে সাজিয়ে দেবীর প্রতীক হিসেবে পুজো করা হয়। পরে সেই ঘট নিয়ে যাওয়া হয় মূল পুজোমণ্ডপে। সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত মন্দিরের যজ্ঞকুণ্ডের আগুন জ্বালিয়ে রাখা হয়। প্রতিমা বিসর্জন পর্যন্ত সেই আগুন নেভানো হয় না। পরিবারের সদস্যরা জানান ,পূর্বঘটে দেবীর আরাধনা করা হতো । পূর্বপুরুষ শ্রীহরি বক্সি দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়ে বাড়িতে প্রতিমা পুজোর সূচনা করেন। কালিকাপুরাণ অনুযায়ী পুজো হলেও পশুবলির পরিবর্তে চালকুমড়ো বা আখ বলি দেওয়া হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুজোর রীতিতে বদল আসেনি। একসময় এই পুজোকে ঘিরে বসত যাত্রাপালার আসর। সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে খিচুড়ি ভোগের আয়োজন করা হতো। সীমানা লাগোয়া ঝাড়খণ্ড ওড়িশা রাজ্য থেকে বহু মানুষ পুজো দেখতে আসতেন। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক নানা অস্থির তা পেরিয়ে বক্সি বাড়ির পুজো আজও হয়ে চলেছে।
ঠাকুর দালানে দাঁড়িয়ে পরিবারের সদস্য তন্ময় বক্সি বলেন, প্রাচীন কাল থেকেই এলাকায় ওপর দিয়ে নানা রাজনৈতিক ঝড় বয়ে গিয়েছে।সুবর্ণরেখা নদীর ধারে রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়েছে। বর্গীরা এসে বারবার হানা দিয়েছে । পূর্বপুরুষরা নিজেদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় দেবীর ওপর আস্থা রেখেছে। আমাদের বাড়ির পুজো সেই অতীত ঐতিহ্যের ধারা আজও বহন করে চলেছে। নিজস্ব চিত্র