Bartaman Logo
১ অক্টোবর, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

তিলাসন: কার্ডে জমিদারবাড়ির পুজোর নিমন্ত্রণের অপেক্ষায় থাকে গোটা তল্লাট, গুলির শব্দে শুরু হয় আরাধনা

গুলির শব্দে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। আজও কার্ডে তিলাসন সিংহাবাদ জমিদারবাড়ির পুজোর নিমন্ত্রণের অপেক্ষায় থাকে গোটা তল্লাট।

তিলাসন: কার্ডে জমিদারবাড়ির পুজোর নিমন্ত্রণের অপেক্ষায় থাকে গোটা তল্লাট, গুলির শব্দে শুরু হয় আরাধনা
  • ১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

ব্রতীন দাস, হবিবপুর (মালদহ): গুলির শব্দে শুরু হয় দেবীর আরাধনা। আজও কার্ডে তিলাসন সিংহাবাদ জমিদারবাড়ির পুজোর নিমন্ত্রণের অপেক্ষায় থাকে গোটা তল্লাট। প্রায় আড়াইশো বছর আগের কথা। উত্তরপ্রদেশের গাজিপুর জেলা থেকে ডালের ব্যবসা করতে এসেছিলেন অবোধনারায়ণ রায়। পুনর্ভবা নদীর তীরে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় সন্ন্যাসী বিদ্রোহের তিন ‘পলাতক’ সন্ন্যাসীর। তাঁদের পরামর্শে জঙ্গলের মধ্যে কিছুটা জায়গা সাফ করে বসতি স্থাপন করেন অবোধনারায়ণ। সেই শুরু।

Advertisement

পরবর্তীতে দিনাজপুর রাজ পরিবারের কাছ থেকে জমি কেনেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে সম্পত্তি। ৫২টি মৌজার মালিক হয়ে প্রতিষ্ঠা পান জমিদার হিসাবে। জমিদারি পত্তনের পর সন্ন্যাসীর পরামর্শে দুর্গাপুজো শুরু করেন অবোধনারায়ণ। সালটা ১২১২ বঙ্গাব্দ। পরে তাঁর ছেলে শিবপ্রসাদ রায়ের হাত ধরে নির্মাণ হয় দুর্গামন্দির।
জমিদারি নেই। ফলে জৌলুস হারিয়েছে পুজো। কিন্তু আজও তিলাসন জমিদারবাড়ির পুজোয় অটুট ঐতিহ্য। সময় পাল্টালেও বদলায়নি পুজোর নিয়ম। দেবী দুর্গার নামে সম্পত্তি রয়েছে। তা পুজোয় খরচ হয়। কর্মসূত্রে জমিদার বংশের ছেলেমেয়েরা দেশ-বিদেশে। কিন্তু যিনি যেখানেই থাকুন না কেন, পুজোর সময় সবার বাড়িতে আসা একপ্রকার বাধ্যতামূলক। 
বর্তমানে পরিবারের নবম বংশধর রাকেশনারায়ণ রায়ের হাতে পুজোর ভার। তিনি বলেন, জমিদারি না থাকলেও আমাদের পুজোর রীতিনীতি এতটুকু বদলায়নি। সপ্তমীতে পুনর্ভবা নদীতে কলা বউ স্নান করাতে নিয়ে যাওয়ার সময় শূন্যে পাঁচ রাউন্ড গুলি চালানোর রেওয়াজ আজও রয়েছে। কিন্তু এখন বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার ভিতরে নদীর ঘাট। ফলে বিএসএফ সেখানে বন্দুক নিয়ে সেখানে যেতে দেয় না। বাধ্য হয়ে নদীতে ঘট ভরে বাড়িতে ঢোকার মুখে গুলি ছোড়া হয়। ওই গুলির শব্দেই শুরু হয় দেবীর আরাধনা। 
রাকেশবাবুর স্ত্রী হীরাকুমারী রায় বলেন, পূর্বপুরুষের আমলে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে আশপাশের সব গ্রামের বাসিন্দাদের জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজোয় নিমন্ত্রণ করা হত। আমরা সেই রেওয়াজ বজায় রেখেছি। তবে এখন আর ঢ্যাঁড়া পেটানো হয় না। কার্ড দিয়ে সবাইকে নিমন্ত্রণ করা হয়। এবারও পাঁচশোর বেশি কার্ড ছাপানো হয়েছে। তল্লাটের প্রতিটি গ্রামে সেই কার্ড বিলি হবে। অষ্টমী ও নবমীতে জমিদারবাড়িতে মায়ের ভোগ খাওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হবে। শুরুর দিকে শাক্ত মতে পুজো হত। শিবপ্রসাদ রায়ের আমল থেকে বৈষ্ণব মতে পুজো শুরু হয়। প্রতিদিন মায়ের ভোগে পায়েস, মিষ্টি, দই নিবেদন করা হয়। একসময় বোঁদে-জাতীয় দই বা ‘ছনৌরি’ নামক মিষ্টি ভোগের তালিকায় থাকত। কারিগরের অভাবে এখন আর তা হয় না। দশমী পুজো শেষে প্রথা মেনে বাড়ির সদস্যদের হাতে ‘অপরাজিত বলয়’ বেঁধে দেন পুরোহিত। বাড়ির মহিলারা মাকে সিঁদুর পরিয়ে বিদায় জানান। একে বলা হয় ‘পরছন’। দশমীর দিন আশেপাশের সাঁওতালরা জমিদারবাড়িতে জড়ো হন। ধামসা-মাদল সহযোগে রায়বাড়ির নিজস্ব পুকুর ঘাটে চলে বিসর্জনের পালা।
তিলাসন জমিদারবাড়িতে দেবী দুর্গাকে ১৩ রকম পদ দিয়ে রোজ নিরামিষ অন্নভোগ দেওয়া হয়। সেই ভোগই পাত পেড়ে খান আমন্ত্রিতরা। ভোগ রান্না করেন মৈথিলী ব্রাহ্মণ। পুজোয় আদিবাসী, ভুঁইমালি ও তুড়ি সম্প্রদায়ের ঢাকি থাকেন। রথের দিন কাঠামো পুজোর মধ্যে দিয়ে জমিদারবাড়ির দুর্গামণ্ডপেই শুরু হয় প্রতিমা গড়ার কাজ। মহালয়ার ভোরে হয় মায়ের চক্ষুদান। অষ্টমীতে বিজোড় সংখ্যায় হয় কুমারীপুজো।  নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ