তারক চক্রবর্তী, জলপাইগুড়ি: রাজশাহীর তাহিরপুর থেকে শুরু। হুসেন শাহের আক্রমণ থেকে পরবর্তীতে ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল পরে সাঁকরাইল হয়ে জলপাইগুড়ির পান্ডাপাড়া কালীবাড়ি রোডে। প্রায় ৪৪৪ বছর ধরে পুজো পাচ্ছেন মা দুর্গা। পারিবারিক রীতিনীতি মেনে আজও পুজোর সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন তাহিরপুরের রাজা তথা পরবর্তীতে গৌড়ের সম্রাট কংসনারায়ণ রায়ের বংশধরেরা। আজও এই পুজোতে বাইরের কোনো পুরোহিত ডাকা হয় না। পরিবারের সদস্যরাই পুজো করেন। অষ্টধাতুর নয় ইঞ্চির উচ্চমা মা দুর্গার সঙ্গে পুজো পান গণেশ ও কার্তিক। এখানে নেই সরস্বতী ও লক্ষ্মী। দুর্গাপুজোর তিথিতে অষ্টধাতুর মূর্তির সঙ্গে পুজো হয় মৃণ্ময়ী মায়ের। সেই পুজোরই এখন চলছে প্রস্তুতি। তবে এখানে নিত্যদিন অন্নভোগ দিয়ে পুজো দেন বাড়ির সদস্যরা। করা হয় চণ্ডীপাঠও।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, তাহিরপুরের রাজা থাকা অবস্থায় মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে সম্ভবত ১৫৮২ সালে এই পুজো শুরু করেছিলেন কংসনারায়ণ রায়। সেই সময়ে প্রায় ন’লক্ষ টাকা ব্যয় করে পুজো করা হয়েছিল। ইতিহাসবিদদের দাবি, ওই পুজোতে রাজার প্রত্যেক প্রজার নেমন্তন্ন থাকত। হুসেন শাহের আমলে রাজা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে যাওয়ার পরে বিগ্রহ নিয়ে শ্রীহট্ট সেনের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেই সময় বিগ্রহ সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে রাজ চক্রবর্তী উপাধি নিয়ে প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়িয়ে যুদ্ধে জয়ী হয়ে ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল ও পরে এদেশের সাঁকরাইলে পূজিতা হতেন মা দুর্গা। বহুযুগ পরে ওই পরিবার জলপাইগুড়ির ডাঙাপাড়া পান্ডাপাড়া কালীবাড়ি রোডে চলে আসার পরে এখনে পুজো শুরু করেন।
যদিও ইতিহাসবিদদের একাংশ মনে করেন, রাজা কংসনারায়ণের এই দুর্গার বিগ্রহ ১২০০ বছর পুরনো হতে পারে। কার্বন টেস্ট করিয়ে আসল সময় জানার চেষ্টা করলে আরও ইতিহাস জানা যাবে বলে মনে করছেন তাঁরা।
মা দুর্গার নিত্যপুজোয় নিয়মিত অন্নভোগের পাশাপাশি নানান রকমের ভাজা দেওয়া হয়। দুর্গাপুজোর সময় অষ্টধাতুর মূর্তির পাশাপাশি মৃন্ময়ী মায়ের প্রতিমাও আনা হয়। দুর্গাপুজোর সপ্তমীতে অন্নভোগ, অষ্টমীতে খিচুড়ি ভোগ, নবমীতে বোয়াল মাছের ভোগ দেওয়া হয় দুর্গাকে। দশমীতে শাপলা ফুল, পান্তাভাত ও কচুশাক দিয়ে ভোগ নিবেদন করে মাকে বিদায় জানান পরিবারের সদস্যরা। প্রত্যেকদিন পরিবারের সদস্যরাই পুজো করেন। ঢাক বাজান বাড়ির সদস্যরাই।
বর্তমানে এই পরিবারের সদস্য অর্ঘ্য চক্রবর্তী বলেন, তাহিরপুর থেকে শুরু হওয়া এই পুজো আমরা এখনও জলপাইগুড়িতে করে চলেছি। বাইরের কোনো পুরোহিতকে না ডেকে আমরা পরিবারের সদস্যরাই পুজো করে থাকি। আমরা সব ভাই পূর্বপুরুষদের শিখিয়ে যাওয়া রীতিনীতি মেনেই পুজো করি। • নিজস্ব চিত্র।