Bartaman Logo
৫ জুলাই, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

বিশ্বকাপের জার্সি

বিশ্বকাপে জার্মানির সাদা-কালো জার্সির পেছনের ইতিহাস ও হাইতির বিতর্কিত জার্সি নিয়ে বিশেষ আলোচনা। বিস্তারিত পড়ুন।

বিশ্বকাপের জার্সি
  • ৫ জুলাই, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কোনো দেশের জার্সি মনে করায় হারিয়ে যাওয়া সাম্রাজ্যের ইতিহাস। আবার কোনো জার্সি তুলে ধরে দুই দেশের বন্ধুত্বের গল্প। বিশ্বকাপের এমনই তিনটি দেশের জার্সির নেপথ্য কাহিনি তুলে ধরলেন শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়।

Advertisement

জার্মান জার্সির ইতিহাস

 তোমরা কি জানো জামাল মুসিয়ালা, আন্টোনিও রুডিগার, জশুয়া কিমিচ কিংবা ম্যানুয়েল ন্যুয়াররা আসলে অন্য এক দেশের জার্সি গায়ে দিয়ে জার্মানির প্রতিনিধিত্ব করেন? অবিশ্বাস্য মনে হলেও, এই কথাটা কিছুটা হলেও সত্যি। সাধারণত দেখা যায়, প্রতিটি দেশই তাদের জাতীয় পতাকার রঙের সঙ্গে মিল রেখে হোম জার্সি তৈরি করে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল বহুদিন ধরে জার্সিতে জার্মানির জাতীয় পতাকার কালো, লাল ও হলদে রঙের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। যুগ যুগ ধরে তারা মাঠে নামছে ধবধবে সাদা জার্সি আর কালো শর্টস পরে। এই রহস্য লুকিয়ে আছে এমন এক দেশের ইতিহাসে, মানচিত্রে যার কোনো অস্তিত্বই নেই। সেই দেশটির নাম প্রাশিয়া।
জার্মানির ফুটবল দলের এই লোগো এবং জার্সি, দুটোই আসলে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। মধ্যযুগে জার্মান ভূখণ্ডে টিউটনিক নাইটদের রাজত্ব ছিল, তখন তাদের প্রতীক ছিল সাদা-কালো। দীর্ঘকাল ছোটো ছোটো রাজ্যে বিভক্ত থাকার পর, ১৮৭১ সালে অটো ভন বিসমার্কের নেতৃত্বে জার্মানির সংযুক্তি ঘটে। ১৯০৮ সালে যখন জার্মানি আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ খেলতে শুরু করে, তখন তারা প্রাশিয়ার সেই ঐতিহাসিক পতাকাকে সম্মান জানিয়ে সাদা-কালো জার্সি পরেই মাঠে নামে। কিন্তু পরপর দুটো বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীর কাছে জার্মানির অবস্থানকে ওলটপালট করে দেয়। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অ্যাডলফ হিটলারের স্বৈরাচারী শাসন এবং ইহুদি হত্যার মতো নৃশংস ঘটনা জার্মানির গায়ে এক কলঙ্ক লেপে দেয়। যুদ্ধোত্তর শাস্তিস্বরূপ জার্মান ফুটবল ফেডারেশনকে ভেঙে দেওয়া হয়। নির্বাসন কাটিয়ে ১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানি আবার খেলার সুযোগ পায়। সেই বিশ্বকাপে পশ্চিম জার্মানি ফুটবল দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়ে ট্রফি জিতে নেয়। যা ‘মিরাকেল অব বার্ন’ নামে পরিচিত। হাঙ্গেরির দলে তখন খেলতেন ফেরেঙ্ক পুসকাস, স্যান্ডর কোকসিসের মতো কিংবদন্তিরা। গ্রুপ পর্বের খেলাতেই হাঙ্গেরি পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলের ব্যবধানে হারিয়েছিল। কিন্তু ফাইনালে রূপকথার মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে সেই হাঙ্গেরিকেই ৩-২ গোলে হারিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় পশ্চিম জার্মানি।
পরবর্তীকালে ১৯৭৪ সালে অধিনায়ক বেকেনবাউয়ার ও কিংবদন্তি স্ট্রাইকার গার্ড মুলারের নৈপুণ্যে পশ্চিম জার্মানি তাদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতে। এরপর ১৯৯০ সালে বেকেনবাউয়ারের কোচিংয়ে এবং লোথার ম্যাথাউসের অধিনায়কত্বে জার্মানির ঘরে আসে তৃতীয় বিশ্বকাপ। তবে এর পরও নাৎসিদের অতীত কর্মকাণ্ডের লজ্জায় জার্মানরা দীর্ঘদিন নিজেদের জাতীয় পতাকাকে জনসমক্ষে প্রদর্শন করতে দ্বিধাবোধ করত। তাই জার্মানির জার্সি সাদা-কালোই রাখা হয়েছিল। কিন্তু নয়ের দশকের পর থেকে সেই সাদা-কালো জার্সির বুকে সগৌরবে স্থান করে নেয় জার্মানির পতাকার কালো, লাল আর হলদে রঙের আভা।

হাইতির জার্সি বিতর্ক 

 এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগেই হাইতির জার্সি নিয়ে শোরগোল পড়ে যায়। সবাই বলছিল, হাইতির ফুটবলাররা নিজেদের জার্সিতে পোল্যান্ডের পতাকা নিয়ে খেলছে! কিন্তু এর পেছনে আছে ২২০ বছর আগের ইতিহাস!
১৮০২ সালে হাইতি ফ্রান্সের উপনিবেশ ছিল। ফরাসিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছিল হাইতির শোষিত দাসেরা। বিদ্রোহ দমন করার জন্য ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বিশাল সেনাবাহিনী পাঠান। আর সেই বাহিনীতে ছিল প্রায় পাঁচ হাজার পোলিশ সৈন্য। পরে পোলিশ সৈন্যদের ভুল ভাঙে। সাম্রাজ্যবাদী ফরাসিদের নির্দেশ অমান্য করে শত শত পোলিশ সৈন্যরা যোগ দেয় হাইতির বিপ্লবীদের দলে! তারাই হয়ে ওঠে হাইতির স্বাধীনতার সহযোদ্ধা। ১৮০৪ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর হাইতি বিশ্বের প্রথম স্বাধীন কৃষ্ণাঙ্গ সাধারণতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এবারের বিশ্বকাপে যখন হাইতি দীর্ঘ ৫২ বছর পর আবার খেলার যোগ্যতা অর্জন করল, তখন এই ইতিহাসকে সম্মান জানিয়ে জার্সিতে ফুটিয়ে তোলা হয় একটি ছবি, যেখানে বিপ্লবীদের হাতে ছিল হাইতির প্রথম জাতীয় পতাকা।
এই নিয়েই তৈরি হয় বিভ্রান্তি! বিপ্লবী পতাকাটিতে কোনো প্রতীক ছিল না। ছিল শুধু ওপরে হালকা নীল আর নীচে লাল রং। কিন্তু হাইতির হোম জার্সিটি গাঢ় নীল রঙের হওয়ায়, জার্সির ডিজাইনাররা পতাকার ওপরের নীল অংশটিকে ফুটিয়ে তোলার জন্য খুবই হালকা রং ব্যবহার করেন। ফলে সেই হালকা নীল আর নীচের লাল অংশটিকে হুবহু পোল্যান্ডের সাদা লাল পতাকার মতো দেখতে লাগছিল! মুহূর্তে রটে যায় যে হাইতি তাদের জার্সিতে পোল্যান্ডের পতাকা রেখেছে। ফিফা এই নকশাকে ‘রাজনৈতিক প্রতীক’ আখ্যা দিয়ে জার্সিটি পরিবর্তন করতে বাধ্য করে।

স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে ফরাসিদের ট্রিবিউট

  এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক আমেরিকা, আর কাকতালীয়ভাবে এ বছরই আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্ণ হল। আর তাই ফ্রান্সের অ্যাওয়ে জার্সিটি ডিজাইন করা হয়েছে আমেরিকার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ফরাসি বন্ধুত্বের প্রতীক স্ট্যাচু অব লিবার্টিকে ট্রিবিউট দিয়ে! আমেরিকার স্বাধীনতা লাভের লড়াইয়ে ফ্রান্স অন্যতম সহযোগী ছিল। সেই বন্ধুত্বের শতবর্ষ পূর্তিতে ১৮৮৬ সালে ফ্রান্সের জনগণ আমেরিকাকে এই বিশাল মূর্তিটি উপহার দেয়। তবে হালকা সবুজ রঙের স্ট্যাচু অব লিবার্টির রং কিন্তু প্রথমে এমন ছিল না! যখন মূর্তিটা তৈরি হয় তখন এর রং ছিল চকচকে তামাটে বা সোনালি বাদামি। মূর্তিটি তৈরি করতে ফ্রেমের ওপর খাঁটি তামার পাত ব্যবহার করা হয়। 
কিন্তু সমুদ্রের আর্দ্রতা ও বৃষ্টির সংস্পর্শে এসে তামার পাতগুলোতে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটেছে, যাকে অক্সিডেশন বলা হয়। এর ফলেই মূর্তির সেই চকচকে তামাটে রং বদলে নীলচে সবুজে পরিণত হয়েছে।
ফ্রান্সের অ্যাওয়ে জার্সিতে ঠিক এই বিবর্তনটাকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। জার্সির মূল রং হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে স্ট্যাচু অব লিবার্টির নীলচে সবুজকে। আর তার ওপর সূক্ষ্ম তামাটে রঙের ছোঁয়া রাখা হয়েছে, যা মূর্তির আদি রঙের কথা ভেবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ