রাজা ভট্টাচার্য: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে বছর দু’য়েক হয়ে গেল। তাই সন্ধের ঘণ্টাখানেক পরেই নিভিয়ে দেওয়া হয় সেলের সমস্ত আলো। করিডোরের আলোগুলো অবশ্য জ্বলে। কিন্তু জেনানা ওয়ার্ডের দিকটা সন্ধ্যা নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই ডুবে যায় অন্ধকারে।
রাজা ভট্টাচার্য: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছে বছর দু’য়েক হয়ে গেল। তাই সন্ধের ঘণ্টাখানেক পরেই নিভিয়ে দেওয়া হয় সেলের সমস্ত আলো। করিডোরের আলোগুলো অবশ্য জ্বলে। কিন্তু জেনানা ওয়ার্ডের দিকটা সন্ধ্যা নামার কিছুক্ষণের মধ্যেই ডুবে যায় অন্ধকারে।
সবে কালকেই জেলে এসেছে তরঙ্গিণী। ওর অবশ্য জেলে যাতায়াতের অভ্যাস আছে। চোদ্দো বছর বয়সে ওর বাপ ওকে বেচে দিয়েছিল গরানহাটায়। সেই থেকে বহু কৌশল অবলম্বন করে বেঁচে থাকতে হয়েছে ওকে। ফলে জেল-খাটা ওর কাছে বাপের বাড়িতে ঘুরতে আসার শামিল। এই সবে মাস ছয়েক আগেই ছাড়া পেয়ে পাড়ায় ফিরেছিল। এক বেহুঁশ বাবুর আঙুল থেকে সোনার আংটি খুলে বেচে দিয়েছিল বলে ওর আবার জেল হয়েছে।
আর আসার পরদিনই এমন একটা দৃশ্য ওর চোখে পড়ল যে, এমন যে ‘সাত ঘাটের জল খাওয়া’ তরঙ্গিণী দাসী— সে পর্যন্ত গালে হাত দিয়ে বলতে বাধ্য হল, ‘মা গো মা! আর কত দেখব দিদি! জেনানা ফাটকে বসে কী যেন লিখছে মেয়েমানুষ কয়েদি! কালে কালে আর কী কী যে দেখতে হবে, তা কে জানে!’
কথাটা যাকে বলা হল, সেই মোক্ষদা অবশ্য ওর কথাটার সঙ্গে মানানসই মুখের ভাব ফোটাল না। উলটে অসম্ভব সম্ভ্রমের সঙ্গে বলল, ‘মাসিমা চিঠি লিখছেন। আর সব সহ্য করতে পারি রে তরঙ্গ, শুধু এই জিনিসটা দেখলে চোখের জল ধরে রাখতে পারি না।’ বলতে বলতে সত্যিই মোক্ষদা চোখে আঁচল চেপে ধরল।
এবার তরঙ্গিণীর মুখটা হাঁ হয়ে গেল। মোক্ষদার বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। বুড়ো বয়সে বর আবার বিয়ে করে এনেছিল। মোক্ষদা রাগের মাথায় সতীনকে বিষ খাইয়ে দিয়েছিল। দশ বছরের জেল। সেই মেয়াদও শেষ হয়ে এল।
আর যে মেয়েমানুষটা সেলের একেবারে সামনের দিকটায় পা ছড়িয়ে বসে কোলের উপর খাতা রেখে চিঠি লিখছে, তার বয়স যে এখনও তিরিশ হয়নি, সে কথা হলফ করে বলা যায়। পরনে অন্য সব কয়েদির মতোই কালো-পাড় সাদা শাড়ি, একঢাল কালো চুল ছড়িয়ে আছে পিঠের উপরে, আবার চোখে সরু ফ্রেমের চশমা। কিন্তু এখান থেকে সবচাইতে বেশি করে চোখে পড়ছে সিঁথির উজ্জ্বল সিঁদুরটা।
মোক্ষদার মতো ডাকসাইটে মেয়েছেলে একে ‘মাসিমা’ বলে ডাকছেই বা কেন, আর ওরকম আপনি-আজ্ঞেই বা করছে
কোন দুঃখে?
আর সহ্য করতে না পেরে তরঙ্গিণী বলেই বসল, ‘হাবভাব তো দেখছি ভদ্দরঘরের মেয়েদের মতো। তাহলে মরতে এই জেনানা সেলে এসেছে কেন? ঠাকুরের নাম করে তো আর কেউ জেলে আসে না! চুরিটুরি কিছু একটা করেছে নিশ্চয়ই। তুমি জানো না কিছু?’
মোক্ষদা এবার চোখ থেকে আঁচল নামিয়ে ধরা গলায় বলল, ‘জানি বইকি! মাসিমা যে পিস্তল লুকিয়ে রেখেছিলেন রে!’
তরঙ্গর চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেল। মেয়েমানুষের অস্ত্র হল বিষ। গোলাগুলি কামান-বন্দুক নিয়ে হল পুরুষমানুষের কারবার। এই নিতান্ত ভদ্রবাড়ির বউয়ের মতো দেখতে মেয়েমানুষটা বন্দুক লুকিয়ে রেখেছিল কেন?
কোনোমতে তরঙ্গিণী জিজ্ঞাসা করল, ‘বন্দুক লুকিয়ে রেখেছিল? আমি তো দেখে ভেবেছি ভদ্রঘরের বউ বোধহয়! ডাকাতি করে বেড়াত নাকি ব্যাটাছেলেদের সঙ্গে দল বেঁধে?’ মোক্ষদা হাসল। এমন কান্না-ঘেঁষা হাসি যে ওর মুখে ফুটতে পারে, সেটাই তরঙ্গিণী কখনো ভাবেনি। কেমন একটা অন্যরকম গলায় বলল, ‘ডাকাতি করতে যাবেন কেন? আর সত্যিই তো মাসিমা ভদ্রঘরেরই মেয়ে, ভদ্রঘরের বউ। তুই কখনো স্বদেশি বিপ্লবী দেখেছিস?’
‘সে আবার কী?’
‘আমাদের দেশটা যে পরাধীন, ইংরেজরা যে আমাদের দেশ দখল করে রেখেছে, সে খবর রাখিস তুই পোড়ারমুখী?’
এবার তরঙ্গিণী একটু রাগ করল। এটুকুও সে জানবে না যে, ইংরেজরা এদেশের রাজা? গোঁসা করে বলল, ‘তুমি কি আমাকে একেবারে মুখ্যু বলে মনে কর নাকি দিদি? সাহেবরা হল রাজার জাত। তারাই তো দেশটাকে শাসনে রেখেছে!’
এই ছোট্ট সাদামাটা কথাটার মধ্যে কী ছিল, ভগবান জানে! মোক্ষদার মুখ নতুন কয়লা দেওয়া উনুনের মতো গনগন করে উঠল। আগুনে গলায় বলল, ‘কেন? তারা আমাদের শাসনে রাখবে কেন? আমরা নিজেদের ভালো-মন্দ বুঝি না? আমরা কি জঙ্গলে থাকতাম, যে সাহেবরা এসে আমাদের ভদ্রসভ্য করল?’
তরঙ্গিণী ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল মোক্ষদার দিকে। এইভাবে ওকে কথা বলতে কখনো
শোনেনি ও।
‘সেইজন্য আমাদেরই ঘরের সব সোনার টুকরো ছেলেরা বেরিয়ে পড়েছে ইংরেজ তাড়াতে। তা ইংরেজরা তো আর বললেই চলে যাবে না এমন সোনার খনি ছেড়ে! ভয় দেখিয়েই তাড়াতে হবে তাদের। আর তার জন্য বন্দুক-পিস্তল চাই বইকি!’
আস্তে আস্তে এক আশ্চর্য গল্প বলে চলল মোক্ষদা।
নীলমণি চাটুজ্যের মেয়ে এই মাসিমা। গোঁড়া বামুন-বাড়ি বললে যা বোঝায়— তাই। অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল নলহাটির ঝাউপাড়া গ্রামের ফণীভূষণ চক্রবর্তীর সঙ্গে। বাংলা ভাগ হল যখন, তখন থেকেই দেশের কথা মাথায় ঢুকল গেঁয়ো বউটার। কেবলই মনে হয়, এত মানুষ দেশের জন্য এত কিছু করছে। আমি কি কিছুই করতে পারি না? কোনো কাজেই লাগি না?
এমন সময় মাসিমা জানতে পারলেন, সম্পর্কে তাঁর বোনপো নিবারণ ঘটক আসলে একজন বিপ্লবী। সেই যে বছর আড়াই আগে একেবারে দিনে-দুপুরে পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে পঞ্চাশখানা মাউজার বন্দুক ছিনতাই করে পালিয়ে গিয়েছিল বিপ্লবীদের দল, সেই বিপ্লবীদের মধ্যে একজনকে নিবারণ লুকিয়ে রেখেছে কাছেই সিয়ারসোল রাজবাড়িতে।
তাহলে তো হাতের কাছেই সমাধান রয়েছে! মাসিমা গিয়ে ধরলেন বোনপোকে। বললেন— তিনিও দেশের কাজ করতে চান।
বোনপো তাঁকে ঠেকানোর জন্য বললেন, ‘সে যে বড়ো দুঃখের
পথ মাসিমা!’
গর্জে উঠলেন মাসিমা, ‘তোমরা যদি পার, তাহলে তোমাদের মায়েরাও পারে। দুঃখের পথ কি তোমাদের একলার?’
এমনই কপাল, সেই বন্দুকগুলোর মধ্যেই সাতখানা লুকিয়ে রাখার দায়িত্ব এসে পড়ল নিবারণের উপরে। বিখ্যাত বিপ্লবী অনুকূলচন্দ্রের বাড়ি থেকে সেগুলোকে লুকিয়ে নিয়ে আসেন নিবারণ।
এই সময় এগিয়ে এলেন মাসিমা। নিজেই বললেন, ‘আমাকে দাও। এসব পিস্তল-কার্তুজ আমি লুকিয়ে রাখছি আমার কাছে।’
যথারীতি গন্ধ শুঁকে শুঁকে পুলিশ একদিন পৌঁছে গেল মাসিমার বাড়িতে। উদ্ধার হল বন্দুক। আর সে-সব লুকিয়ে রাখার অপরাধে দু’বছরের সাজা হল মাসিমার। সেই থেকেই তিনি জেলে।
শুনতে শুনতে বুকের ভেতরটা কাঁপছিল তরঙ্গিণীর। ছেলেবেলা থেকে জেলে আসছে ও। কত রকম অপরাধী দেখেছে! চোর-ডাকাত-খুনে— কিছু দেখতে বাকি নেই ওর। কিন্তু আজ এতদিনে এমন একজনকে ও নিজের চোখে দেখল, দেশকে ভালোবাসার অপরাধে যিনি জেলে এসেছেন। নিজের লাভের জন্য নয়, নিজের রাগ
মেটাতে নয়।
‘হ্যাঁ গো দিদি, মাসিমার ঘরে ছেলেপুলে নেই?’ কখন যে নিজের অজান্তেই প্রায় সমবয়সি মেয়েটাকে মাসিমা বলতে শুরু করেছে, তরঙ্গিণী খেয়ালই করেনি!
মোক্ষদা বলল, ‘সেটা ভেবেই তো চোখে জল আসে রে! কোলের ছেলেকে রেখে জেলে আসতে হয়েছে মাসিমাকে। এক-এক দিনে আধমন ডাল ভাঙতে হয়। হাত দুটো দেখলে বুঝবি। ছাল-চামড়া সব উঠে গেছে, দগদগে ঘা। সেদিকে ফিরেও তাকান না। কেবল ওই ছেলেপুলের জন্য মনটা কাঁদে। তাও কাঁদতে চান না সবার সামনে। উলটে আমাদের মতো যারা সাধারণ কয়েদি, তাদের শেখান দেশকে ভালোবাসতে। বলেন—‘একদিন তো ছুটি হবেই আমাদের! যে যেখানে যাবে, মনে রেখ— আমরা পরাধীন দেশের মানুষ। এ বড়ো লজ্জার কথা। যেভাবে পারবে, দেশের
কাজ করবে।’
তরঙ্গিণী বুঝতে পারছিল, জীবনে প্রথম ওর সর্বাঙ্গে কাঁটা দিচ্ছে। চোখে জল এসে যাচ্ছে অকারণেই। ধরা গলায় বলল, ‘মাসিমার মনে হয় চিঠি লেখা হয়ে গিয়েছে।’
মোক্ষদা চোখ তুলে তাকাল সেইদিকে। যেখানে বসে চিঠি লিখছিলেন ভদ্রমহিলা, এখন সেখানে ঘনিয়ে এসেছে অন্ধকার। পা ছড়িয়ে উদাস হয়ে বসে আছেন তিনি। চোখে শূন্য দৃষ্টি।
‘আমাকে একবার আলাপ করিয়ে দেবে ওঁর সঙ্গে? কিছু বলব না। একটিবার শুধু প্রণাম করেই চলে আসব।’ বলল তরঙ্গিণী।
এক মুহূর্তের দ্বিধার পর উঠে দাঁড়াল মোক্ষদা। বলল, ‘আয় আমার সঙ্গে। আসলে এই সময়টা মাসিমার মন ভালো থাকে না। ছেলেপুলের কথা বেশি করে মনে পড়ে বোধহয়। সারাদিন তো অকথ্য পরিশ্রম যায়, অসহ্য যন্ত্রণা সহ্য করেন। সন্ধ্যার পর থেকেই...
আয় তুই। আমরা দুটো কথা
বললে হয়তো...।’
সেল অন্ধকার বলে অনেকেই শুয়ে পড়েছে। সাবধানে তাদের পার হয়ে গরাদের সামনে বসা ভদ্রমহিলার কাছে এসে দাঁড়াল ওরা দু’জন। তরঙ্গিণী স্পষ্ট বুঝতে পারল, ওর পা দুটো অল্প অল্প কাঁপছে। করিডোরের মৃদু আলো এসে পড়েছে এই জায়গাটায়। মাসিমার চোখ দুটো চিকচিক
করছে যেন।
‘ও মাসিমা! আজ আবার চিঠি লিখলেন বুঝি বাড়িতে?’
তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে বসলেন ভদ্রমহিলা। তারপর মোক্ষদার দিকে তাকিয়ে হাসলেন একটু, ‘বাবা অপেক্ষায় থাকেন। তাই লিখে দিই দু’কলম। লিখি, আমি ভালো আছি। আমার জন্য যেন চিন্তা না করে বাড়ির কেউ। শুধু আমার বাচ্চাগুলোকে যেন দেখে। তারা যেন না কাঁদে।’
এই শেষ কথাটা বলতে গিয়ে যেন গলাটা একবার
কেঁপে গেল।
আর তরঙ্গিণীর আজ হলটা কী? ভেবেছিল— জীবন বোধহয় ওকে একেবারে ভিতর থেকে শুকিয়ে ফেলেছে। আজ যে এই গেঁয়ো বউটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে, তার কথা শুনতে শুনতে বারবার চোখে জল এসে পড়ছে!
‘মাসিমা! আমি তরঙ্গিণী। মন্দ লোক।’ কথা বলতে গিয়ে গলা ভেঙে গেল তরঙ্গিণীর, ‘আপনার পায়ে একবার হাত দিলে কি আপনি রাগ করবেন গো?’
‘শোনো কথা!’ অবাক হয়ে তাকালেন মাসিমা, ‘বলে কি না মন্দ লোক! পেন্নাম করবে কেন গো? তোমার বয়স তো দেখছি আমারই মতো হবে। বসো এখানে। কোথায় মন্দ লোক— দেখি তো!’
‘না মাসিমা... আমি মন্দ পাড়ায় থাকি...।’—বেধে যাচ্ছে আজ তরঙ্গিণীর কথা।
হেসে ফেললেন মাসিমা। তারপর ফিসফিস করে বললেন, ‘শোনো মেয়ে। আমি আমার বাড়িতে সত্যিই সাতখানা পিস্তল লুকিয়ে রেখেছিলুম। তারপর যখন খবর পেলুম পুলিশ আসছে, খানাতল্লাশি হবে, তখন বুদ্ধি করে পাশের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে সেগুলো লুকিয়ে ফেললাম। তা সেটাও আবার পাড়ারই একজন লোক দেখতে পেয়ে পুলিশকে বলে দিল। ব্যস। কোলের খোকাটিকে স্বামীর হাতে তুলে দিয়ে, ঘরের বউ, সব্বার সামনে পুলিশের গাড়িতে উঠতে হল। সমস্ত গ্রামের লোক হাঁ করে তাকিয়ে দেখল— চক্কোত্তিদের বাড়ির বউকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেল।’
‘এইবার বল দেখি মেয়ে,’ একটু পরে বললেন মাসিমা, ‘তাদেরই দেশের জন্য লড়াই করবে বলে পিস্তলগুলো জোগাড় করা হল কত কষ্ট করে। কত ঝুঁকি নিয়ে আমি তা লুকিয়ে রাখলুম। আর এই সবকিছু জানার পরেও আমারই পাড়ার যে লোকগুলো চুপিচুপি পুলিশে খবর দিয়ে দিল— তুমি কি তাদের চাইতেও মন্দ লোক? বল দেখি ভেবে!’ এই বলে চশমার আড়াল থেকে উজ্জ্বল চোখে তরঙ্গিণীর মেছেতার দাগ ধরা ক্লান্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন দুকড়িবালা দেবী। ভারতের প্রথম অস্ত্র আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার হওয়া মহিলা।